ইসলামী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইসলামী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ঔরঙ্গজেব - কেন হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদীদের কাছে একটি ঘৃণ্য নাম ?

ঔরঙ্গজেব কেন হিন্দুত্ববাদীদের কাছে একটি ঘৃণ্য নাম?


কিছুদিন ধরে কানে আসছিল যে আরএসএস নাকি এখন মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব কে নিয়ে নানা ধরণের প্রচার চালাচ্ছে, যা একপ্রকারে আমরা ছোটবেলার থেকে ভারতের স্কুল শিক্ষা ও হিন্দু পারিবারিক শিক্ষায় যা শিখে এবং শুনে আসছি তারই নামান্তর। ঔরঙ্গজেব নাকি ভীষন অত্যাচারী সম্রাট ছিল এবং হিন্দুদের সে নাকি দু চক্ষে দেখতে পারত না, তাঁর শাসনকালে নাকি লক্ষ লক্ষ হিন্দুদের ধরে ধরে মুসলমান বানানো হয়েছে এবং সে নাকি ভারতের বহু হিন্দু মন্দির ধবংস করেছে। ঔরঙ্গজেব মানেই খুন খারাপ, অত্যাচার, লুন্ঠন ও হিন্দুদের মুসলমানে ধর্মান্তরিত করার অপচেষ্টা। এই শিক্ষাটি আমাদের শিরায় শিরায় আরএসএস এর জন্মদাতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ দুই শত বছর ধরে ঢুকিয়ে আসছে যাতে ভারতীয়রা তাঁদের স্বাধীন মুঘল সাম্রাজ্যকাল থেকে ব্রিটিশদের পদদলিত হয়ে দাসের জীবন বাঁচা কে শ্রেয় মনে করে।  

আবুল মুজ্জাফার মুহিউদ্দিন মুহাম্মদ ঔরঙ্গজেব স্বাধীন ভারতের শেষ শক্তিশালী মুঘল সম্রাট ছিলেন। তাঁর শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্য ভারতের ভূখন্ডে দক্ষিন ও মধ্য পশ্চিম ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যে যুদ্ধ চালায়। তাঁর নেতৃত্বে ভারতের দক্ষিন অঞ্চলের দুই মুসলমান শাসিত রাজ্য, আদিল শাহীর বিজাপুর ও কুতুবশাহীর গোলকন্ডা ভারতের মুঘল সাম্রাজ্য যুদ্ধ করে দখল করে।  বিদারের যুদ্ধে সিরি মারজান কে পরাস্ত করতে ভারতের মুঘল ফৌজ প্রথমবার রকেট ও গ্রেনেড ব্যবহার করে যা আমাদের দেশের সেই সময়ে ভাঙ্গন ধরা সামন্তবাদী ব্যবস্থা ও উদীয়মান দেশী পুঁজিবাদের একটি লক্ষণ ছিল।  ১৬৬৩ তে ঔরঙ্গজেবের নেতৃত্বে ভারতের মুঘল সরকার লেহ ও লাদাখে নিজেদের প্রতিপত্তি কায়েম করে।    


যে কোনও জাতি, ব্যক্তি, ধর্ম, ঘটনার বিশ্লেষণ বা বিচারের আগে আমাদের প্রয়োজন সেই সব ব্যক্তি, জাতি, ধর্ম বা ঘটনার সময়কালের পারিপার্শ্বিক দুনিয়াকে জানা এবং সেই পরিবেশের, চেতনার মানের, পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা। ঔরঙ্গজেব একজন অত্যাচারী সম্রাট ছিলেন, প্রশ্ন হলো সম্রাট মাত্রেই কি অত্যাচারী হতেন না ? কিছু ব্যতিক্রম ছিলেন যাদের নিয়ে আজও বহু আলোচনা হয় আর বাকিদের ব্যাপারে সভা কবিদের বন্দনা ভজনা কে মনে রেখে কেউ কেউ তাঁদের বীরত্বের গাথা আজও গান আর কেউ কেউ কোনও রাজা - বাদশার নাম শুনলেই গালাগাল দেন। ঔরঙ্গজেব অন্যান্য রাজা - বাদশাদের থেকে কোনও ভাবেই আলাদা ছিলেন না। তাঁর লক্ষ্য ছিল মুঘল সাম্রাজ্য কে বাঁচিয়ে রাখা এবং তার পরিধি বৃদ্ধি করা। সেই লক্ষেই ঔরঙ্গজেব তাঁর রাজত্ব চালিয়েছিলেন যা তাঁর পিতা শাহজাহানের থেকে শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।  কিন্তু ষোড়শ শতকে যখন ঔরঙ্গজেব রাজত্ব করছিলেন তখন ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার বলে কিছু হত না, কারণ মানব সভ্যতা তখনও সেই স্তরে উন্নত হয়নি যে গণতন্ত্র - প্রজাতন্ত্র ইত্যাদী মানুষের চেতনায় জায়গা নেবে।  জনগণ সেই সময়ের অর্থনৈতিক অবস্থা, উত্পাদনের প্রক্রিয়া ও সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ থেকে ধীরে ধীরে সামন্তবাদের ধ্বংসের দিকে যাচ্ছিলেন।  যে ব্রাক্ষন্যবাদ শত শত বছর ধরে ভারতের জনগণের উপর জগদ্দলের মতন চেপে বসে ছিল সেই পাথরকে ইসলামে দীক্ষিত মুঘল সম্রাটরাও সরাবার চেষ্টা করেনি তাঁদের রাজত্ব বাঁচাবার ও সাম্রাজ্য বাড়াবার তাগিদে।


ঔরঙ্গজেব ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। ইতিহাসে কোনও রাজা সম্রাট ধর্ম নিরপেক্ষ ছিলেন না কারণ তাঁদের নিজেদের সভার ধর্মগুরুদের মতামত নিয়ে স্বিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হত।  কিন্তু ঔরঙ্গজেব কি অন্য ধর্মের প্রতি অত্যাচার করা কে তাঁর রাজনীতি বানিয়েছিলেন? বা এমন কোনো মুঘল বাদশাহ ছিলেন কি যিনি অন্যধর্মের প্রতি বিদ্বেষ প্রচার করে গেছেন? ঔরঙ্গজেব ইসলামিক শারিয়া আইন চালু করে সেই সময়কার উত্তর ভারতে মদ্যপান, জুয়া ও বৈশ্যাবৃত্তি নিষিদ্ধ করেন।  তাঁর রাজত্ব কালে রাজপুত জয় সিংহ তাঁর সেনাপতি হিসাবে বিখ্যাত হন, রাজপুতদের তিনি মনসাব্দারী দেন এবং মধ্য ও দক্ষিন ভারতে যুদ্ধ চালাবার সময়ে মুঘলদের সৈন্যদের হাতে কোনো মন্দির ভাঙ্গা হয়নি, যদিও সেই সময় তাঁরা ঔরঙ্গজেব এর বিরোধী ব্রাক্ষণ গোষ্টির নেতৃত্বে চলা উত্তর ভারতের বহু মন্দির ভেঙ্গে দেন।  ১৬৬৬ সালে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব ভারতে সতী প্রথা নিষিদ্ধ করেন, যা আকবরের আমলে প্রথম নিষিদ্ধ হওয়ার পর আবার পুরোদমে চালু হয়ে যায়। ঔরঙ্গজেব শাহজাহান বা জাহাঙ্গীরের মতন সরকারী অর্থে মোচ্ছব পালন করা, মহল ও প্রাসাদ তৈরি থেকে দুরে থাকেন ও হিন্দুদের উপর ৫% হারে জিজিয়া কর চাপান ও মুসলমানদের উপর ২.৫% জাকাত কর চাপান।  এর ফলে তিনি ব্রাক্ষণদের বিরাগভাজন হন।


শিখ গুরু গোবিন্দ সিংহের সাথে ঔরঙ্গজেবের লড়াই বহুদিন চলে এবং এই লড়াইতে উস্কানি দেন পাহাড়ি রাজ্যের হিন্দু রাজারা, যারা মুঘল সম্রাটের কাছে শিখ গুরুকে পরাস্ত করার আবেদন জানান। কিন্তু শিখ গুরু গোবিন্দ সিংহের সাথে ছিলেন বহু মুসলমান এবং মুঘল সম্রাটের পক্ষে ছিলেন বহু হিন্দু এবং একজন পৌত্তলিকা পুজারী না হয়ে তিনি অন্য একজন পৌত্তলিকা পূজা বিরোধীকে কেন পৌত্তলিকা পূজারীদের কথা শুনে মারতে চাইছেন - এই প্রশ্ন তুলে গুরু গোবিন্দ সিংহ ঔরঙ্গজেব কে ভর্ত্সনা করেন।  এ ছাড়াও মহারাষ্ট্রে শিবাজীর বিরুদ্ধে মুঘল সম্রাট তাঁর সামরিক অভিযান চালান এবং পরবর্তীকালে শিবাজীর পুত্র কে হত্যা করেন।  হয়তো বা এই সব নিদর্শন তুলে আমাদের দেশের হিন্দু ফ্যাসিবাদী শক্তি ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে চায় তাদের সাধের হিন্দু ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বার্থে ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করতে।  কিন্তু তারা কেউ এ কথা বলে না যে ঔরঙ্গজেবের সমস্ত সামরিক কর্মকান্ড ছিল রাজনৈতিক এবং এর সাথে ধর্মের প্রচারের চেয়ে বেশি জরুরি ছিল তাঁর সাম্রাজ্য বাড়াবার তাগিদ। যে তাগিদ সেই সময়ের সমস্ত রাজার মধ্যেই ছিল কারণ সকলেই তাঁদের সাম্রাজ্য কে বিস্তারিত করতে চাইতেন।


তবে ঔরঙ্গজেব যে কারণে ইতিহাসে ঘৃণিত হয়েছেন তার কারণ এদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ যখন তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করে তখন থেকেই ইতিহাস কে বিকৃত করে পরিবেশন করে সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়ানো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের ঔরসজাত আধুনিক হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের মজ্জাগত হয়ে গেছে।   স্বাধীন মুঘল ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রথম বড়সর ধরনের পরাজয় স্বীকার করতে হয় ১৬৮৬-১৬৯০ অবধি চলা চাইল্ড যুদ্ধে। বোম্বাই ও মাদ্রাসে ব্রিটিশ ফৌজ ঘেরাবন্দী হয়।  সিদ্দী ইয়াকুব এর নেতৃত্বাধীন নৌ বহর এবং তার সাথে হাবিশ ফৌজের আক্রমণে ব্রিটিশ ফৌজরা ধরাশয়ী হয়।  সমঝোতা করতে যখন ব্রিটিশরা মুঘল সাম্রাজ্যের পায়ে পড়ে তখন মুঘল সম্রাটের দরবারে তাদের বিশাল অঙ্কের অর্থ ক্ষতিপূরণ দিতে হয় এবং মুঘল সম্রাটের সামনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের মাথানত করে গড় করতে হয়, যার ফলে তারা ছাড়া পায়। এর পরে হেনরি এভরি নামক জলদস্যু যখন হজযাত্রীদের জাহাজ আক্রমন করে তখন ঔরঙ্গজেব ব্রিটিশদের উপর আবার আক্রমণ নামিয়ে আনেন এবং ব্রিটিশদের সমস্ত কারখানা ও ব্যবসা বন্ধ করিয়ে দেন।  এর ফলে ব্রিটিশরা সেই সময়ে ৬ লক্ষ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দিয়ে শাস্তির হাত থেকে বাঁচে এবং পৃথিবীতে প্রথমবার বিশ্বজুড়ে একজন অপরাধী কে ধরতে অভিযান শুরু হয়।  যদিও সেই সময় হেনরি এভরি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।


ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঔরঙ্গজেবের এই যুদ্ধগুলি, ব্রিটিশদের পরাজয়, এবং মাটিতে নাক খত দেওয়ার কাহিনী আজও আমাদের ঔপনিবেশিক শিক্ষার ঔরসজাত আধা ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা ছাত্র - ছাত্রীদের জানতে দিতে চায় না। কারণ এই যুদ্ধগুলি ছিল স্বাধীন ভারতের দ্বারা তত্কালীন বিশ্বের সর্ব শক্তিমান রাষ্ট্রের বাহিনীকে পরাস্ত করার ঘটনা।  যা হয়তো আমাদের দেশের যুব ছাত্ররা জানলে তাঁদের মধ্যে মুঘল সাম্রাজ্য নিয়ে গর্ব বোধ হবে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি হবে।  


ব্রিটিশরা কোনো কালেই এই অপমান হজম করতে পারেনি এবং এর ফলে তারা মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসকে বিকৃত করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার ঘৃণ্য কৌশল গ্রহণ করে। যার ফলে আজও শৈশব থেকে ইতিহাসের পাতায় ঔরঙ্গজেব সম্পর্কে পক্ষপাতদুষ্ট নেতিবাচক শিক্ষাই দেওয়া হয় এবং কোনও ঐতিহাসিক এই নিয়ে বিশেষ উত্সাহ নিয়ে স্বাধীন গবেষণা করেন না। ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থা তকে পাশ করে এই দেশের ছাত্র -ছাত্রীদের মধ্যে ব্রিটিশ ও মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি এক বিশেষ ধরণের দুর্বলতা জন্মায়। তাঁরা ভাবে যে ব্রিটিশ ও আমেরিকানরা ভারতীয়দের থেকে অনেক শ্রেষ্ঠ এবং আমরা আজও অসভ্য। আমরা ট্রেনে - বাসে -ট্রামে - অফিসে এই আলোচনা অনেক শুনেছি যে ব্রিটিশরা থাকলে নাকি দেশের অনেক উন্নতি হত ! এবং এই কথা বলেন এ দেশের তথা কথিত শিক্ষিত মধ্য বিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষেরা !

ঔরঙ্গজেব সম্রাট ছিলেন স্বাধীন ভারতের, যে ভারতের মানুষ কে বিদেশীদের গোলামী করতে হতো না, যে ভারতে মানুষকে অন্য দেশের পুঁজির স্বার্থে নিজের শ্রম, জল, জঙ্গল, জমি, জীবিকা উত্সর্গ করতে হত না।  তাঁরা বাঁচতেন স্বাধীন ভারতের মাটিতে, যে মাটিতে আমরা প্রায় ৩০০ বছর ধরে বিদেশী পুঁজির গোলামী করছি প্রাণ ও মান খুইয়ে। সত্যিকারের কোনো দেশপ্রেম থাকলে তা অবশ্যই বিদেশী পুঁজির গোলামী কে ঘৃণা করবে এবং দেশের স্বাধীন বিকাশের ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করবে। যারা এর উল্টোটা করে তারা মেকি ও ভন্ড দেশ প্রেমিক এবং এদের অবিলম্বে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হোক।                    
     










বাংলাদেশের ব্লগারদের উপর হামলা - ধর্মীয় মৌলবাদকে রোখার একমাত্র পথ হলো সমাজ বদল

সম্প্রতি বাংলাদেশে নিজের বাড়ির ভিতর ইসলামী ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসবাদীদের হাতে নিহত হলেন প্রগতিশীল ব্লগার নীলাদ্রী চট্টোপাধ্যায়, যিনি  'নীলয় নীল' নামে ব্লগ দুনিয়ায় পরিচিত ছিলেন।  এই বছরের  শুরুর থেকে এই নিয়ে ৪ জন ব্লগার প্রাণ হারালেন ইসলামী ফ্যাসিস্টদের হাতে।সর্বপ্রথম এই বছরের ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ দিকে ঢাকা বই মেলা প্রাঙ্গনের বাইরে ইসলামী সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও যুক্তিবাদী অভিজিত রায়কে, তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর ভাবে আহত হন তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা।এর পরে সমগ্র বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক মহলে বিশাল প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায় মৌলবাদের সাথে আপসকামী আওয়ামি লিগ সরকারের বিরুদ্ধে এবং ক্ষোভ ফেটে পরে মৌলবাদী সন্ত্রাসী ও তাদের পৃষ্টপোষক সৌদি দালাল জামাত বাহিনীর বিরুদ্ধে।

অভিজিতের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই ইসলামী ফ্যাসিস্টরা খুন করে ওয়াশিকুর রহমান 'বাবু' নামক তরুণ ব্লগারকে।  তাঁর পর অনন্ত বিজয় দাস এবং সর্বশেষ সংযোজন হল নীলয় নীল।  এক একটি হত্যা একদিকে যেমন প্রগতিশীল চেতনা সম্পন্ন মানুষকে আঘাত করছে, তাঁদের মধ্যে সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে তেমনি উল্টোদিকে এই সন্ত্রাস ইসলামী মৌলবাদীদের আরও বলিষ্ট করে তুলছে। তারা খোলাখুলি ফেসবুকের মতন সামাজিক মাধ্যমগুলিতে উল্লাস প্রকাশ করছে এবং নাস্তিক, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও বৈজ্ঞানিক চেতনাসম্পন্ন মানুষদের হুমকি দিচ্ছে।  এত সব দেখেও বাংলাদেশের সরকার হাতে হাত দিয়ে বসে আছে, তারা হত্যাকারীদের ওকালতি করছে এই বলে যে মানুষের "ধর্মীয় অনুভূতিতে" আঘাত করা অনুচিত।  কিন্তু মানুষ খুন করা যে অনুচিত সে কথা সরকার বা মোল্লাতন্ত্র কারুর বিবৃতিতে শোনা গেলনা  না।


বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জামাত এ ইসলামী ভারতবর্ষের আরএসএস - বজরং দল ও বিজেপির মতন ফ্যাসিস্ট ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়। এদের মুক্তহস্তে দান ধ্যান করে সাহায্য করছে সৌদি আরব সহ আরব দুনিয়ার চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজতান্ত্রিক মৌলবাদী শক্তিগুলি, যারা মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আরব দুনিয়ায় বৈশ্যাবৃত্তি করে একদিকে নিজেদের শাসন টিকিয়ে রেখেছে, আরবের জনগণের প্রগতিশীল - গণতান্ত্রিক দাবির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলিকে দমন করছে মার্কিণ সাহায্যে বলিয়ান হয়ে, আর ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজেদের ওয়াহাবী - সালাফি প্রভাব পৃথিবীর কোনায় কোনায় ছড়িয়ে দিচ্ছে মুঠো মুঠো অর্থ (পেট্রো ডলার) খরচা করে। সৌদি আরবের হাতে ইসলামের রাশ তুলে দিয়ে মার্কিণ একচেটিয়া লগ্নি পুঁজি ও তার তল্পিবাহকরা পৃথিবীতে দাঙ্গা - হাঙ্গামা - সন্ত্রাসবাদের আগুন জ্বালিয়ে নিজেদের শাসন - শোষণ ও লুণ্ঠনের ব্যবস্থাকে পাকা পোক্ত করছে।  তাই তারা সৃষ্টি করলো এক সময় আল কায়েদা গোষ্ঠিকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়াকে সরিয়ে নিজেদের দাপট প্রতিষ্ঠা করতে।  পরবর্তীতে সেই আল কায়েদা ও তার বিভিন্ন উপদলগুলি মার্কিণ একচেটিয়া পুঁজিকে সাহায্য করলো আফগানিস্তান ও ইরাক দখলের যুদ্ধের জমি প্রস্তুত করিয়ে।  

এই ভাবেই সৃষ্ট হল ইসলামিক স্টেট নামক উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী শক্তির।  যার অধিনায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হল একদা মার্কিণ বন্দী পরবর্তীতে মার্কিণ গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ এর চর - 'আল বাগদাদী' নামক এক দালাল।  এদের মার্কিণ - সৌদি জোট সৃষ্টি করলো সিরিয়া থেকে আসাদের নেতৃত্বাধীন বাথ সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উচ্ছেদ করে নিজেদের পেটোয়া সরকার প্রতিষ্ঠা করতে এবং বিপুল অর্থ, অস্ত্র শস্ত্র ও নিজেদের দালাল প্রচার মাধ্যমগুলি দ্বারা এদের প্রচার চালালো - 'সিরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামী' বলে। কিন্তু সিরিয়ার বিশাল অংশে কোত্কা খেয়ে এই 'স্বাধীনতা সংগ্রামীরা নিজেদের স্বরূপ ধারণ করে  করলো ইরাক জুড়ে তান্ডব। এদের বারবৃদ্ধির পিছনে মার্কিণ ও সৌদি আরবের ইরানের পিছনে কাঠি করার তাগিদ ছিল বেশি।  তাই তো আজও দেখা যাচ্ছে যে মার্কিণ - সৌদি জোট শুধু মাত্র মুখেই আই এস এর সন্ত্রাসের বিরোধিতা করছে এবং একমাত্র কুর্দিশ বাহিনী ওয়াই পি জি, সিরিয়ার জাতীয় সেনা, ইরানের মদতপুষ্ট মিলিশিয়া বাহিনী আই এস এর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।  

আজ বাংলাদেশের আরবিকরণের প্রচেষ্টায় রত সৌদি আরবের পোষা দালাল হাসিনা - খালেদা জুটি। এই উপমহাদেশের মুসলমান সম্প্রদায় যতদিন অবধি ওয়াহাবী - সালাফি মার্কা ইসলামের পাল্লায় পড়েননি ততদিন মুসলমানদের মধ্যে ফার্সি - উর্দু প্রভাবটা তীব্র ছিল, যা একদিক থেকে ছিল আজকের ইসলামের চেয়ে ঢের বেশি উদার, মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকেই বহু বিদ্বান - প্রগতিশীল মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ বেড়িয়ে এসেছেন, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, শিল্পে, রাজনীতিতে  যারা বিরাট অবদান রেখেছিলেন।  কিন্তু ৬০-৭০ এর দশকের তীব্র বামপন্থী আন্দোলনের বৃদ্ধির ফলে আতঙ্কিত মার্কিণ তল্পিবাহক শিবির টেনে আনে তাদের দালাল সৌদি রাজতন্ত্র কে নিজেদের রক্ষা স্বার্থে। যদিও প্রায় দু শতাব্দী ধরে ওয়াহাবী সংস্কৃতি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে, কিন্তু তার তীব্রতা বাড়ে বাংলাদেশ গঠন থেকে শুরু করে আফগান যুদ্ধের সময় থেকে।  

ধীরে ধীরে বাংলাদেশের ও ভারতের মুসলমানদের আরবিকরণ চলতে থাকে, মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়তে থাকে, গরিব নিরীহ মুসলমানদের সেখানে মগজ ধোলাই করে ১৪০০ বছর পুরানো ধর্মীয় চোলাই খাইয়ে মৌলবাদের সমর্থনে এক বিশাল ধর্মীয় মাতাল শ্রেণী গড়ে তোলার কাজ চলতে থাকে।  বাংলাদেশে যখন বেড়ে চলে জামাত - রাজাকার - মৌলবাদী ফ্যাসিস্টদের শক্তি, তখনই ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিন প্রান্তে হিন্দু ফ্যাসিবাদ শক্তিবৃদ্ধি শুরু করে সেই একই মালিকের প্রশ্রয়ে। এই আরবিকরণের ফলে ধীরে ধীরে একটি বিদেশী ভাষা ও সংস্কৃতি বাঙালি জাতির ভাষা ও সংস্কৃতিকে খুবই বিপদজনক ভাবে প্রভাবিত করতে থাকে।  ইংরেজদের শাসনকালেও বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি ও ভাষার এই রূপ ক্ষতি হয়নি যতটা ৩৫ বছরের আরবিকরণের মাধ্যমে আজ হয়েছে।  বাঙালির খোদা হয় গেল আরবীয় আল্লা, মানুষ তাই আর খোদা হাফিজ না বলে বলতে থাকে 'আল্লা হাফিজ', আর নামাজ হলো গিয়ে সালাত। ঘোমটা দিয়ে হিজাব করা বাঙালি মুসলমানের মেয়েরা হঠাত পড়তে শুরু করল আরবীয় বোরখা আর বাঙালি মুসলমান পুরুষদের মধ্যে হঠাত সুন্নত পালন করার ধুম পরে গেল।   

বাঙালি মুসলমানের এই পরিণতির মূল দায় অবশ্যই অর্থনীতির, যা যে কোনও সমাজের মূল ভিত্তি। এক বিকাশহীন পিছিয়ে পড়া আধা সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতি ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের জীবনযাপন করা দিন দিন দু:সাধ্য করে তোলে, এবং এর ফলে অসংখ্য মানুষকে রুটি রুজির খোঁজে বিদেশে পাড়ি দিতে হয়।  এভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশের অসংখ্য মুসলমান মানুষ কাজের খোঁজে পাড়ি দেয় সৌদি আরব সহ মধ্য পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে সস্তায় শ্রম বিক্রি করতে।  এই সব দেশেই এই গরিব মানুষগুলিকে তাঁদের উপর চলতে থাকা শোষণ অত্যাচারের থেকে নজর ঘোরাতে শাসক শ্রেণী শরণ নেয় ধর্মের, এবং ধর্মীয় আচার আচরণ শেখাবার নামে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষদের এরা নিজ সংস্কৃতি ত্যাগ করে 'বিশুদ্ধ' আরবীয় সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে শেখায় ইসলামের নিয়ম হিসাবে।  উদার বাঙালি মুসলমানকে পরিণত করে কট্টর ধর্মীয় মৌলবাদীতে।  

তাই আজ দেখা যায় ভারতের পশ্চিম বাংলায়, আর বাংলাদেশের জেলায় জেলায় মাদ্রাসা শিক্ষার নামে বাঙালি শিশুদের দেওয়া হচ্ছে আরবিতে তালিম।  এই আরবি শিক্ষা এই গরিব মানুষের সন্তানদের কর্মসংস্থানে বা ভবিষ্যতে উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে কোনও সাহায্য করবে না। যেমন বিজেপি - আরএসএস কতৃক ভারতীয়দের সংস্কৃত শিক্ষার জিগির তোলা হয়, তেমনি জামাতিদের প্রশ্রয়ে বেড়ে চলে আরবি শেখার চল।  এর ফলে ধীরে ধীরে বাঙালি মুসলমান তাঁর নিজের সংস্কৃতি ও বৈশিষ্টগুলি আরবীয় সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের কাছে বিসর্জন দিয়ে আরবের জনজাতিগুলির একজন হিসেবে নিজেকে গণ্য করতে থাকে। বাংলাদেশের আওয়ামী লিগ বা জাতীয় পার্টি এই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত।  এদের যৌথ মদতেই ভারত ও বাংলাদেশে মার্কিণ পুঁজির এক চেটিয়া শোষণ শাসনের ধারা বজায় রাখতে ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তিগুলি আজ পথে নেমেছে।  

বাংলাদেশের যুক্তিবাদী নাস্তিকদের আন্দোলন একটি মধ্যবিত্ত সুলভ আন্দোলন যা সমাজের আর্থ সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত বিচার না করেই ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে চায়।  তাঁরা এইটা বিশ্বাস করে না যে ধর্ম সহ সমাজের সমস্ত উপরি কাঠামো আসলে অর্থনীতির ভিতের উপর দাঁড়িয়ে।  যতদিন অর্থনৈতিক ভিত বদলাবে না তত দিন মানুষের মন থেকে পুরানো চিন্তা, কু সংস্কার কে শেষ করা যাবে না।  তাই তাঁদের আন্দোলন সমাজ বদলাবার সংগ্রামের থেকে বিছিন্ন হয়ে রয়েছে।  তবুও তাঁরা একটি প্রগতিশীল শক্তি, যাদের আজ বেশি করে সমাজের মূলটা বদলাবার সংগ্রামের সাথে নিজেদের যুক্ত করতে হবে।  

কি ভাবে লড়াই করা যাবে মৌলবাদের সাথে ? কি ভাবে পরাস্ত করা যাবে ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলিকে? আমরা দেখেছি যে ভারত - পাকিস্তান - বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি মৌলবাদী ফ্যাসিস্টদের আক্রমণের বিরোধিতা করে মোমবাতি হাতে রাস্তায় মিছিল করেন, ফেসবুক - টুইটার প্রভৃতিতে লিখে লিখে বন্যা বইয়ে দেন।  কিন্তু এই সব করে কি কোনও ভাবে ফ্যাসিবাদ কে রোখা যায় ? না, যায় না।  

ফ্যাসিবাদীরা এটা জেনে আরও বেপরোয়া হয়ে যায় যে সরকার যেমন তাদের বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না, তেমনি প্রতিবাদী প্রগতিশীল শক্তিগুলি শুধুমাত্র গান্ধীবাদী আন্দোলনের মধ্যে নিজেদের প্রতিবাদ সীমিত রেখে তাদের খোলা মাঠে গোল মারার সুযোগ করে দেবে।  তাই তারা বুক ফুলিয়ে একের পর এক খুন করে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অকথ্য অত্যাচার করে, এবং মানুষের স্বাধীনতা হরণ করে।  

গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিগুলির প্রয়োজন আজ তীব্র গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলা ফ্যাসিবাদী মৌলবাদের বিরুদ্ধে।  এই প্রতিরোধ শুধু মাত্র খেটে খাওয়া মানুষদের রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে, এবং রাজনৈতিক ভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে এই লড়াইয়ে সামিল করিয়েই একমাত্র সম্ভব ফ্যাসিবাদ কে সন্ত্রাসিত করা।  বাংলাদেশের যেখানেই ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা হানা দেওয়ার কথা ভাববে সেখানেই তাদের সামনে শ্রমিক - কৃষক - মেহনতি মানুষের জঙ্গি প্রতিরোধ দেখা দেবে, ইঁটের বদলে পাটকেল খাওয়ার ভয়ে ফ্যাসিস্টদের নিজেদের গুটিয়ে নিতে হবে, কারণ জন প্রতিরোধ কে কি করে ভাঙ্গতে হয় তা ফ্যাসিস্টদের মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব স্থিত বাবারাও জানে না।  

বাংলাদেশের সরকারের কাছে বিচার ভিক্ষা করা এক অপরাধ। কারণ, খুনির কাছে কখনো খুনের ন্যায় বিচার চাইতে নেই।  তাই আমাদের বাংলাদেশী বন্ধুরা, যারা আজ বিজ্ঞান, যুক্তি,  প্রগতির কথা বলছেন তাঁদের আজ ঠিক করতে হবে যে তাঁরা কি শুধুই কথায় বাঘ মারার সংস্কারী চিন্তাভাবনা নিয়ে মৌলবাদী ফ্যাসিস্টদের সাথে ফেসবুকে তর্ক - গালাগাল করে জীবন কাটাবেন, না কি কঠিন বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ করে সমস্যার মূলটা নিকেশ করার দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে অংশ নেবেন। সমাজের আমূল রূপান্তরণ না হলে সমস্ত মৌলিক সমস্যাগুলির মতন ধর্মীয় মৌলবাদ ও ফ্যাসিবাদের সমস্যার সমাধান হবে না।  এই সত্যটি আজ বিশেষ করে উপলব্ধি করতে হবে বাংলাদেশের নবীন প্রগতিশীল সমাজ কে।  তাঁদের মনে রাখতে হবে যে তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নবীন প্রজন্মের ভবিষ্যত।  তাঁরা যদি গাফিলতি করেন তাহলে ইতিহাস তাঁদের ক্ষমা করবে না।     

                

এই ব্লগের সত্বাধিকার সম্বন্ধে