পশ্চিমবঙ্গ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পশ্চিমবঙ্গ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

অমিত শাহ ও বিজেপির এনআরসি আর নাগরিকত্ব বিল নিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাটাছেঁড়া

মোদী ও অমিত শাহের বঙ্গ ভঙ্গ রাজনীতি

কিছুদিন আগে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ মালদায় এসে দলীয় সভা করে বাংলা দখল করার স্বপ্নের দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালেন। ১৯শে ফেব্রুয়ারি চার লক্ষ মানুষের জমায়েত করিয়ে ব্রিগেড সমাবেশে মমতা বন্দোপাধ্যায় যে ভাবে ২২-২৩টি ছোট-মাঝারি-বড় বিজেপি-বিরোধী দল কে একত্রিত করে মোদী সরকারের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নিজের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অভিলাষা কে সুপ্ত ভাবে প্রকাশিত করলেন, তাতে বিজেপি'র অনেক হিসেবেই ভণ্ডুল হতে পারে। এই ব্রিগেড সমাবেশের পর থেকেই বিরোধী ঐক্য কে কটাক্ষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপির তাবড় নেতারা একের পর এক ভাষণ দিয়ে জনতা কে বোঝাবার চেষ্টা করছেন যে মোদীর কোন বিকল্প হয় না। এরই মাঝে অমিত শাহের বাংলায় আগমন কয়েকটা কারণে ভীষণ চর্চিত হয়ে ওঠে এবং তাই এই সফরের পিছনের রাজনীতিকে গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে।

ডিসেম্বর মাসে বিজেপি'র বহু চর্চিত তিনটি রথ যাত্রা কে জনতার চাপে আদালত কে নিষিদ্ধ করতে হয় এবং এর ফলে অমিত শাহের রাজ্যে এসে ঘটা করে মন্দিরের ঘণ্টা বাজিয়ে বিজেপি'র ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের প্রচার শুরু করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফেব্রুয়ারি মাসে জল মাপতে নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গে সভা করতে আসতে চেয়েছিলেন। বিজেপি'র পরিকল্পনা হলো হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগিয়ে, সাম্প্রদায়িক হানাহানি লাগিয়ে যে করেই হোক পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসনের ২২টি জিতে সর্ব বৃহৎ দল হওয়া। অথচ মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দ্বারা যে ভাবে সরকারি শক্তি ব্যবহার করে চার লক্ষ মানুষের ভিড় জোগাড় করা সম্ভব সেই ভাবে নরেন্দ্র মোদী’র দ্বারা বা বিজেপি'র দ্বারা তৃণমূল শাসিত পশ্চিমবঙ্গে বাস, ট্রেন ও ট্রাক বোঝাই করে লোক আনা সম্ভব নয়। তাই রাজ্য বিজেপি কায়দা করে নরেন্দ্র মোদী'র সভা পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর ফাঁকে এসে অমিত শাহ সংখ্যালঘু মুসলিম জনবহুল মালদা জেলায় সমাবেশ করে হিন্দুত্ববাদী জিগির তুলে গেলেন আর তরুপের তাসের মতন ব্যবহার করলেন এনআরসি ও নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬’র মতন জনবিরোধী অস্ত্রগুলি।

অমিত শাহ বললেন যে আসামে এনআরসি প্রক্রিয়ায় নাম বাদ চলে যাওয়ায় কোন বাঙালি হিন্দু কে আতঙ্কিত হতে হবে না, মোদী সরকার নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬ ব্যবহার করে তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়াবে। এই ভাষণে তিনি বলেন যে “হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ কারুরই এনআরসি নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।” এই কথা তিনি ঠিক এমন সময়ে বললেন যখন শুধু আসাম নয় বরং সমগ্র উত্তর পূর্ব ভারত জুড়ে চলছে নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬ বিরোধী এক সুতীব্র আন্দোলন। বিজেপি'র সঙ্গ ত্যাগ করে অগপ’র মতন তীব্র অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলি কিন্তু আজ বিরোধী শিবিরে যোগদান করেছে। মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, প্রভৃতি রাজ্যে এই বিলের বিরোধিতা করেছে বিজেপি'রই জোট সঙ্গীরা।

এরই মধ্যে আসামে বিজেপি'র অভ্যন্তরে বাঙালি হিন্দু বনাম আসামি বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠায় হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতন সংঘের সবচেয়ে নাম করা নেতাদেরও রাম মাধবের মতন আরএসএস নেতাদের শরণাপন্ন হতে হয়। রাম মাধবের নেতৃত্বে বিজেপির নেতারা আসামে যখন দ্বন্ধ নিরসনে ব্যস্ত ঠিক তখন বিজেপি সভাপতি বাংলা'র মাটিতে দাঁড়িয়ে কেন হঠাৎ করে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করলেন জোর গলায় ঘোষণা করে যে সমস্ত বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা বাঙালি হিন্দুদের সরকার আইন করে নাগরিকত্ব দেবে? বিজেপি’র কি আসাম, ত্রিপুরা সহ অন্যান্য উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতে নিজের শক্তি ধরে রাখার কোন ইচ্ছা নেই? বিজেপি কি বাঙালি ভোট পেতে সমগ্র উত্তরপূর্বে নিজের জমি হারিয়ে দিতে রাজি? এটা কি বিজেপি'র নতুন বাঙালি প্রেম?

আসলে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের এই বাঙালি হিন্দু প্রীতি দেখানো আর মোদী সরকারের নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬, পাশ করানোর প্রচেষ্টার মধ্যে নিহিত আছে এক গূঢ়  অভিসন্ধি। প্রথমতঃ অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদী সহ সমগ্র সংঘ পরিবার জানে যে সংবিধানের ধারা ১৪ অনুসারে ভারত রাষ্ট্র মানুষের মধ্যে (নাগরিক ও অনাগরিক নির্বিশেষে) ধর্ম, জাতি, ইত্যাদির ভিত্তিতে কোন ধরণের প্রভেদ করতে পারবে না। সেই জায়গায় একটি ধর্মের মানুষ কে নাগরিকত্ব থেকে বেছে বেছে বঞ্চিত করার পরিকল্পনা আসলে সংবিধানের ভিত্তিকেই আক্রমণ করে। এই কারণেই দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ে চ্যালেঞ্জ করা হলে এই আইন ধোপেও টিকবে না।

দ্বিতীয়তঃ এনআরসি’র ভিত্তি হলো আসাম চুক্তি ১৯৮৫, আর এই চুক্তি অনুসারে আসামে ২৪শে মার্চ ১৯৭১ এর পর থেকে প্রবেশ করা মানুষদের বিদেশী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাঁদের নাগরিকত্ব খারিজ করা হবে। জনবিরোধী ও তীব্র জাতি-বিদ্বেষী (পড়ুন বাঙালি বিদ্বেষী) এই এনআরসি কে বিজেপি পূর্ণ সমর্থন করে, তবে ধর্মের ভিত্তিতে। এই এনআরসি’র চূড়ান্ত খসড়া তালিকায় নাম ওঠেনি ৩.২ কোটি মানুষের মধ্যে ৪০ লক্ষ মানুষের, যাদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই বাঙালি, হিন্দু ও মুসলিম উভয়ই। এবার বিজেপি'র আনা নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬, অনুসারে মুসলিম বাদে যে সকল উদ্বাস্তু মানুষ বাংলাদেশ থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতে এসেছেন তাঁরাই নাগরিকত্ব লাভ করবেন।

যদি বিজেপি'র আনা সংশোধনী আইন মেনে নাগরিকত্বের শেষ দিন নতুন ভাবে নির্ধারণ করা হয় তাহলে বাঙালি মুসলিমরা কেন ২৪শে মার্চ ১৯৭১ এর হিসেবে ‘বিদেশী’ হিসেবে গণ্য হয়ে নিজেদের অধিকার হারাবেন? কী কারণে মুসলিমদের সাথেই শুধু আসাম চুক্তি, ১৯৮৫, অনুসারে বিমাতৃসুলভ ব্যবহার করা হবে? কেন ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারা কে এই নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬, এর মাধ্যমে লঙ্ঘন করা হবে? এই সমস্ত প্রশ্নগুলো উঠলে বিজেপি বা তার ভাড়াটে বাহিনীর পক্ষে জবাব দেওয়া সম্ভব না, শুধুই ধর্মীয় ঘৃণার জিগির তুলে এক দল লোককে ক্ষেপিয়ে তুলে মেরুকরণ করার চেষ্টা চালানোই বিজেপি ও মোদী সরকারের পক্ষে সম্ভব। আর আজ আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তাই করার চেষ্টা তারা চালাচ্ছে।

এবার ধরুন বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমের প্রশ্নে। ইসলামিক ফ্যাসিবাদের অত্যাচার থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আর তারপরে বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসামে এসেছেন লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দুরা। আসামে বহু বাঙালি মুসলিমরাও এসেছেন একটু রোজগারের আশায়, একটু পেট ভরে দুই বেলা খেতে পাওয়ার আশায়। তবে উদ্বাস্তু মুসলিমদের থেকে আসামে ব্রিটিশ শাসকদের দ্বারা উত্তরবঙ্গের থেকে, বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রাম জেলাগুলি থেকে বহু মুসলিম কৃষক পরিবার কে আসামে নিয়ে আসা হয় ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে যাতে তারা চাষাবাদ করে সরকারের খাজনা বাড়াতে পারে। তাই দক্ষিণ আসামের বা নমনি আসামের বহু জেলায় মুসলিম বাঙালিদের সংখ্যা বেশি। তেমনি শিলচর সহ সমগ্র বরাক উপত্যকায় বাঙালি হিন্দুদের সংখ্যা অনেক বেশি।

বাংলাদেশ থেকে ইসলামিক ফ্যাসিস্ট আক্রমণের কারণে ছিন্নমূল হয়েছেন যে সমস্ত বাঙালি হিন্দুরা, ঐতিহাসিক কারণেই তাদের একটা অংশ এখনো একটা ইসলাম বিদ্বেষে ভোগেন এবং তাই তাদের পক্ষে স্বাভাবিক ভাবে বাঙালি মুসলিমদের সাথে মিলেমিশে থাকা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফলে তাঁরা অচিরেই বিভেদকামী ও বাঙালি-বিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাতের পুতুল হয়ে ওঠা শুরু করেন। অনেক বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুরা বিজেপির প্রচারের বিরুদ্ধে গিয়েও তাদের বাঙালি ঐতিহ্য কে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং বাঙালি মুসলিমদের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছেন হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ কে ও অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের পরাস্ত করতে।  

নিজের জন্মভূমিতে, নিজের মাটিতে মানুষের যদি দুই বেলার আহারের বন্দোবস্ত হয়, তাঁদের মাথার উপর যদি ছাদ থাকে আর তাঁদের প্রাণ যদি নিরাপদে থাকে তাহলে সেই মানুষদের কোন ভাবেই ছিন্নমূল হয়ে ভেসে বেড়াতে হয় না। ১৯৭১ সালের পর থেকেই ভারতের নয়া উপনিবেশ হিসেবে বাংলাদেশ টিকে আছে আর তাই অনেক বাঙালি মুসলিম ও হিন্দুরা কৃত্রিম সীমানা পেরিয়ে নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যে দুই বেলা করে কম্মে খেতে আসামে এসেছেন। এই বাঙালি মুসলিম ও আসামে যুগ যুগ ধরে শোষণ, বঞ্চনা ও অত্যাচার সয়ে বাস করা বাঙালি মুসলিমেরা মিলে একটা বড় ভোট ব্যাঙ্কে পরিণত হয়েছেন এবং এই ভোট ব্যাঙ্কটা থাকলে বিজেপি বা অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের ভোটে সুবিধা করা মুশকিল আর তাই এই ভোট ব্যাঙ্ক ভাঙ্গা এদের দুইজনের পক্ষেই প্রচন্ড দরকারি।

তাই এনআরসি দিয়ে যখন অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালিদের জোর করে আসামের থেকে ভিটেচ্যুত করে আবার একবার উদ্বাস্তু বানাতে চায়, ঠিক তখনই বিজেপি চেষ্টা করে নেপোয় মারে দই’র মতন জোর করে বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব প্রদান করে অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বাঙালি মুসলিমদের করতে চায়। এতে বিজেপি'র এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব হবে।

অহমীয় ও বাঙালি মুসলিম মিলিয়ে দেখলে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা ভোটের ফলাফল নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদের অর্ধেকের বেশি কে যদি ভোটার তালিকা থেকেই বাদ দেওয়া যায় তাহলেও কিন্তু বিজেপি বা অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের অনেক লাভ। আর যদি আসামে কয়েক লক্ষ বাঙালি হিন্দু ভোটার কে নাগরিকত্ব দিয়ে থিতু করানো যায় তাহলে সেই পথ ধরে পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দুদের কাছেও বিজেপি নিজের গ্রহণ যোগ্যতা বাড়িয়ে তুলতে পারবে। আসামের জনসংখ্যায় বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের যদি একটি প্রকান্ড শক্তি হিসেবে স্থাপন করা যায় তাহলেই পশ্চিমবঙ্গে ও ত্রিপুরায় বিজেপির পোয়াবারো হবে।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা আসন সংখ্যা হলো ৪২ আর সমগ্র উত্তরপূর্বের সাত ভগিনী রাজ্যের মিলিত লোকসভা আসন সংখ্যা হলো ২২। ফলে বিজেপি'র পক্ষে বাঙালি আর বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তু ভোট ব্যাঙ্কটিকে স্বযত্নে লালনপালন করা ও সাম্প্রদায়িক গরল ঢেলে এই সম্প্রদায়টিকে বাঙালি মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাঁতিয়ে তোলা অত্যন্ত লাভজনক। এরই সাথে সমগ্র উত্তরপূর্বে আদিবাসী, উপজাতি খ্রিস্টান ও পেগান জনগণের উপর হিন্দুত্ববাদের প্রতিপত্তি কায়েম করার জন্যেও কিন্তু বাঙালি হিন্দুদের ব্যবহার করা যাবে খুবই সহজে।

অনেকে যদি মনে করে থাকে যে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুরা বিজেপির নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬, এর মাধ্যমে লাভবান হবেন তাহলে তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার চেয়ে বেশি একটা ভোট ব্যাঙ্ক বানানো, মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক ধ্বংস করা ও এই বাঙালি হিন্দু বনাম বাঙালি মুসলিম দ্বন্ধের সুযোগ নিয়ে সমস্ত উত্তরপূর্বের থেকে সম্পদ লুঠ করার প্রক্রিয়া কে তীব্র করে তুলবে বিজেপি আর এর লাভ তুলবে হাতেগোনা কিছু হিন্দি-ভাষী বেনিয়া মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিরা ও তাঁদের মালিক - বৃহৎ বিদেশী একচেটিয়া ও লগ্নি পুঁজি।

আজ সঠিক লাইন এনআরসি বিরোধিতা করা ও নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬ সমর্থন করা নয়, আজ সঠিক লাইন নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬ বিরোধিতা ও এনআরসি সমর্থন করাও নয়। সঠিক লাইন হলো গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে, অর্থনৈতিক সমতা ও জনতার হাতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ক্ষমতার জন্যে বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলা আর এই কাজে আসামে ও পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করা সকল গরিব মানুষের অংশগ্রহণ খুবই জরুরী। এই অংশগ্রহণ করাবার জন্যে প্রথমে খেটে খাওয়া গরিব বাঙালি হিন্দু, বাঙালি মুসলিম, বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ, বিভিন্ন  জনজাতির মানুষ ও অহমীয় হিন্দু ও মুসলিমদের একত্রিত করতে হবে কে আসল মিত্র আর কে আসল শত্রু তা চিনিয়ে দিয়ে।

জনগণ যদি শ্রেণীসংগ্রামের রাজনীতি কে  আঁকড়ে ধরতে পারেন, একটি প্রগতিশীল, বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব যদি জনগণ কে আগুয়ান হয়ে পথ দেখাতে পারে, নিজ সৃজনশীল দক্ষতা কে ব্যবহার করে যদি ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম কে সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল অনুসরন করে পরিচালনা করা যায় তাহলে অমিত শাহের বাঙালি মননে ও চেতনায় বিরাজ করে রাজত্ব করার সাধ ঘুঁচিয়ে দেওয়া সম্ভব।

২২-২৩টি সংসদীয় দলের রামধনু রঙের সুবিধাবাদী জোটের দ্বারা ভোটের মাঠে বিজেপি কে কোথাও কোথাও ল্যাং মারা সম্ভব হলেও, আরএসএস দ্বারা প্রচারিত মুসলিম-বিদ্বেষ ও হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী রাজনীতির রেশ কিন্তু কাটবে না বরং তলে তলে বেড়ে চলবে আর পাঁচ বছর পরে আবার পুনরায় তীব্র শক্তি নিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা চালাবে। তাই হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ কে খতম করার পথ হলো গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি এবং যে সকল উৎপাদন সম্পর্ক এই শত্রুদের সমর্থন করছে ও রসদ যোগাচ্ছে তাদের উৎখাত করা।

অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদী'র বাংলা কে দখল করে নিজেদের ঘাঁটি বানানোর প্রচেষ্টা কে  রুখে দিতে, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ সহ নানা জায়গায় বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা কে আটকাতে আজ এক বৃহৎ ও ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম দরকার, যে সংগ্রাম এই বিজেপি ও আরএসএস এর সরবাহ লাইনকে কাটতে সক্ষম হবে ও বাংলার রাজনৈতিক পুণ্য ভূমিতে সাম্প্রদায়িক হিংসা, বিদ্বেষ ও মানুষে-মানুষে বিভেদের রাজনীতি’কে  চিতা কাঠে তুলতে পারবে। সেই সংগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে আজ সমস্ত গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল ফ্যাসিবিরোধী মানুষ কে একত্রিত করে পথে নামতে হবেই। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর তাই আমাদের লেনিনের মহান উক্তি - “বিলম্ব মানেই মৃত্যু” মনে রেখে নিজেদের গতি ও মনের প্রসারতা, দুটোই বাড়াতে হবে।

পুরুলিয়ায় বিজেপি কর্মীদের হত্যা কি সংঘ পরিবারের স্বার্থে?



সম্প্রতি, পুরুলিয়া জেলায় দুই বিজেপি কর্মীর দেহ কিছুদিনের ব্যবধানে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে এবং তারপর থেকেই রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা অবনতির ও তৃণমূলের হিংসাত্মক রাজনীতির প্রসঙ্গ তুলে বিজেপি ও সংঘ পরিবার বাজার গরম করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও পুরুলিয়া পুলিশের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুসারে দ্বিতীয় মৃত ব্যক্তি, দুলাল কুমার (৩০), আত্মহত্যা করেছেন, তবুও রাজ্য সরকার এই মৃত্যুর তদন্তের ভাঁড় সিআইডি’র হাতে তুলে দিয়েছে। বিজেপির নিশানার তীর তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে আর তৃণমূলের নিশানার তীর বিজেপি থেকে মাওবাদী, প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই।  পুরুলিয়া জেলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস গো হারা হারায় মমতা বন্দোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দোপাধ্যায় জেলাকে বিরোধী শূন্য করতে চান বলে বিজেপির অভিযোগ। 

কয়েকদিনের ব্যবধানে সংগঠিত এই জোড়া মৃত্যু বাংলার জনমানসে বিজেপির পক্ষে কতটা সহানুভূতির জোয়ার এনে দেবে তা বিতর্কের বিষয়, কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য যে এত সরল ভাবে সমাধান হবে তা কিন্তু যে কোন সমালোচক সাংবাদিকের পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টকর। বিজেপির অভিযোগ নিঃশর্ত ভাবে মেনে নেওয়া অনেকটা হয়ে যাবে রাষ্ট্রের হাতে খুন হওয়া মানুষেরা এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ারে মরেছে সেটা স্বীকার করে নেওয়ার মতন। 

বিজেপি এই রাজ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিদ্বন্ধি হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস কে আজ টেক্কা দিতে পারছে তার কৃতিত্ব যেমন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দ্বারা ১৯৯৮ সালে বিজেপি কে খাল কেটে বাংলায় ঢুকতে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে দেওয়ার ঘটনায় নিহিত, ঠিক তেমনি, অধঃপতিত সংশোধনবাদী সংসদীয় বামপন্থী দলগুলির, যাদের পান্ডা হলো সিপিএম, তাদেরও চরম দেউলিয়াপনা ও অক্ষমতায় নিহিত। 

রাজনৈতিক হিংসার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখা ও বিরোধীদের নিকেশ করে দেওয়ার রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস পার্টি ১৯৫০ এর দশকে আমদানি করেছিল কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে, শ্রমিক ও কৃষকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্যে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতা দখল করতে পারে কারণ ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর পদলেহী শ্বাপদ সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের সরকার যে নৃশংস তান্ডব লীলা পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭২ থেকে চালিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে নকশালপন্থীদের প্রতিরোধ সংগ্রাম ও বন্দিমুক্তি সংগ্রামের লাভটা জ্যোতি বোস ও সিপিএম সেদিন নেপোয় মারে দই করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পেরেছিল বলে। ঠিক তেমনি, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ সালে বামফ্রন্টের সামাজিক-ফ্যাসিবাদী শাসন কে উচ্ছেদ করে এক প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিবাদী সরকার গঠন করতে পেরেছিল কারণ মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ও মাওবাদীদের সাহায্যে তৃণমূল কংগ্রেস সিপিএমের হার্মাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম থেকে লালগড়ের নানা প্রান্তে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিল এবং তার ফলে একটি চরম দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল দল হওয়া সত্বেও তৃণমূল মানুষের কাছে নিজেদের একটি প্রতিবাদী ও প্রতিরোধী ভাবমূর্তি গড়ে সমর্থন কুড়োতে পেরেছিল। আজ বিজেপি ঠিক সেই পথেই চলে, সিপিএমের খালি করে যাওয়া ময়দানে সিপিএমের প্রাক্তন কর্মী ও সমর্থকদের সমর্থনে বলীয়ান হয়ে তৃণমূলের নৃশংস সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারছে। 

এখানে বিজেপি যে শুধু হিন্দুদের সমর্থন আদায় করছে তাই নয়, ২০১৪ সালে সমগ্র বীরভূমের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে বিজেপি নিজের সংগঠন কে শক্ত করে গড়ে তোলে এবং সেই সংগঠনের উপর ভর করে দুধ কুমার মন্ডলের মতন জোতদার অনুব্রত’র (কেষ্ট) মতন সাংঘাতিক সন্ত্রাসবাদীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে জমি দখলের। এই রাজায় রাজায় যুদ্ধে যে অসংখ্য উলুখাগড়ার প্রাণ যায় তাঁদের অধিকাংশই কিন্তু সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নয়তো আদিবাসী বা নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের গরিব মানুষ। ঠিক কেশপুরের মতন আজ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের ক্ষমতা ধরে রাখার ও বিজেপির ক্ষমতা দখল করার হিংসাত্মক সংঘর্ষ চলছে। এরই মধ্যে, পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে তীব্র হিংসা কে উপেক্ষা করেও বিজেপি যে পুরুলিয়া দখল করতে পেরেছে তার শ্রেয় কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে দিন দিন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বেড়ে চলা ক্ষোভ কে দিতে হয়। 

বীরভূম, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জুড়ে আজ বিজেপি গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে যাচ্ছে আরএসএস এর সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ক কে ব্যবহার করে এবং এই কাজে তৃণমূলের একটা বড় অংশই কিন্তু বিজেপি কে সাহায্য করছে রাতের আঁধারে। এই ধরুন বাঁকুড়ার তালডাংরার কথা, বিজেপি এখানে প্রবেশ করে ১৯৯৮ সালে তৃণমূলের কোলে চেপে আর আজ আরএসএস এর অসংখ্য সন্ত্রাসী শিবিরের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসবাদী ফৌজ খাড়া করেছে এবং তোলা আদায়, নারী পাচার থেকে বিভিন্ন বেআইনি কারবারে নিজের একচেটিয়া অধিকার কায়েম করে ফেলেছে । তৃণমূল এখানে বিজেপির সাথে রফা করে ফেলেছে আর কোথাও কোথাও অস্তিত্বের সঙ্কটে ধুঁকতে থাকা সিপিএম বিজেপির সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে লুটের বখরার উপর অধিকার কায়েম করতে। 

সিপিএম আজ কংগ্রেসের লেজুড় হয়ে যেটুকু অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছিল তাও আজ বিশ বাওঁ জলে এবং এর ফলে সিপিএমের কর্মীরা দলে দলে বিজেপিতে যোগ দিচ্ছে প্রাণ ও জমি বাঁচাতে। বর্তমানে যদি আবার বিধানসভা নির্বাচন হয় তাহলে সিপিএম পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রের থেকে ধুয়ে মুছে যাবে এবং বিজেপি তৃণমূলের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলার ঔদ্ধত্ব দেখাবে, এই কথা বলার জন্যে কোন বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দরকার পড়বে না, কারণ একথা আজ গ্রামের শিশুরা পর্যন্ত বলতে পারবে।  

এর মধ্যে যদি তৃণমূল কে নিজের ঘাঁটি ও ক্ষমতা বাঁচাতে হিংসায় জড়াতে হয়, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস কে রাতের অন্ধকার অবধি অপেক্ষা করতে হবে না, বরং দিনের আলোয়, ভাঙড়ের মতনই, যে কোন জায়গায় যে কোন ব্যক্তি কে হত্যা করার ক্ষমতা আজ মমতা বন্দোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের আছে। তৃণমূলের হিংসার সাথে সমগ্র রাজ্য পঞ্চায়েত নির্বাচনে পরিচিত হয়েছিল ভালো ভাবেই আর তাই বিজেপির দুই চুনো পুঁটি কে দিনের আলোয় নিকেশ করতে তৃণমূলের কোন বিশেষ সমস্যা হতো না। পুরুলিয়ার মতন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাউকে পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঠিক পরেই রাতের অন্ধকারে বাইকে করে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে খুন করে গাছে টাঙিয়ে মৃতের জামায় হুমকি লিখে আসার মতন বেদনাদায়ক পরিশ্রম তৃণমূলের হার্মাদ বাহিনী এই মুহূর্তে করবে এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হবে। 

বিগত দিনে, বামফ্রন্ট আমলে, পুরুলিয়ার ওই সকল অঞ্চলে মাওবাদীদের হাতে বেশ কিছু সিপিএম নেতা ও কর্মীর প্রাণ যায়, যার সাথে কিন্তু বর্তমানের বিজেপি কর্মীদের হত্যার কোন সাদৃশ্যতা খোঁজা শিশুসুলভ আচরণ হবে। মাওবাদীরা যাঁদের আজ অবধি খুন করেছে তাঁদের মৃতদেহের পাশে তাঁরা পোস্টার লিখে নিজেদের দ্বায়িত্ব স্বীকার করেছে এবং সেই পোস্টারগুলির নিচে মাওবাদীদের সাংগঠনিক পরিচয় থাকতো। নিজেদের নামে কাউকে হত্যা করতে মাওবাদীরা কুন্ঠিত বোধ করে না কারণ তাঁদের দল অনেক দিন ধরেই নিষিদ্ধ এবং নির্বাচনের কোন বালাই মাওবাদীদের নেই। যদিও মাওবাদীরা বর্তমানে পুরুলিয়ায় ফের নিজেদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তবুও এই দুই মৃত্যুর দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপানো যায়না, কারণ তাঁরা যদি এদের মেরেই থাকতো তাহলে সেই মৃত্যুর দায় নিয়ে প্রশাসনের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা আতঙ্কের স্রোত বইয়ে দিতে পারতো মাওবাদীরা।  

যদি তৃণমূল এবং মাওবাদীরা এই দুই জন কে না মেরে থাকে তাহলে কে এদের মারতে পারে? সিপিএম আর কংগ্রেসের এখন সাইনবোর্ডটুকুও পুরুলিয়া জেলায় নেই। তৃণমূলের সন্ত্রাসে এই দলগুলির অস্তিত্ব অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। তবে যে দলের শক্তি এই মুহূর্তে পুরুলিয়ায় বেড়েছে তা হলো বিজেপির এবং এর সাথে সাথে আরএসএস এর। নিজ দলের লোক কে কোরবানির পাঁঠা বানানো বিজেপির কাছে নতুন কিছু না। হরেন পান্ড্যা থেকে গোপীনাথ মুন্ডে, দীনদয়াল উপাধ্যায় থেকে প্রমোদ মহাজন, যখন যাকে খরচের খাতায় ফেলার দরকার বিজেপি বা আরএসএস এর হয়েছে তখন সেই মরেছে কোন না কোন আততায়ীর হাতে, দোষটা অবশ্যই অন্য কারুর উপরে চাপানো হয়েছে। এত বড় বড় মহীরুহ যাঁরা কেটে ফেলতে পারে অবলীলায়, তাঁরা যে দুটি নটে গাছ মাড়িয়ে দেবে না সে কথা শিশুও বিশ্বাস করবে না। 

সম্প্রতি, পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে, নিজের পক্ষে সমর্থনের জোয়ার আনতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের দরকার হয়ে পড়ে বিজেপির এবং তাই পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য এলাকার মতন পুরুলিয়াতেও রাম নবমীর মতন অবাঙালি, উত্তর ভারতীয় উৎসব কে ঘিরে দাঙ্গার আগুন লাগায় সংঘ পরিবার। এই কাজে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে বজরং দলের জেলা নেতা ও বিজেপির যুব নেতা গৌরাব সিংহ, যে আবার প্রাক্তন এসএফআই কর্মী। তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে মানুষে মানুষে ঘৃণা ছড়াতে ওস্তাদ গৌরাব সিংহ, পুরুলিয়ার রাম নবমীর দিনে সশস্ত্র মিছিলের মাধ্যমে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গার আগুন জ্বালায় এবং এই হিংসায় এক মুসলিম যুবকের মৃত্যু হয় বজরং দলের কর্মীদের আক্রমণে। হিন্দি-ভাষী উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় আরএসএস নেতাদের ভাড়াটে গুন্ডা হিসেবে গৌরাব সিংহ ইতিমধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছে জমির দালালি থেকে নানা অপরাধে সামিল হয়ে। এহেন গৌরাব সিংহ গ্রেপ্তার হওয়ায় তাঁর স্বরূপ যাতে জনগণের সামনে না আসে, পুরুলিয়ার থেকে বিজেপির নারী পাচার থেকে মাদক পাচারের মতন অপরাধের হিসেব যাতে জনগণ বা দেশের মানুষ না জানতে পারেন, তাই হয়তো হঠাৎ দুটি মৃতদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেল। 

বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কিন্তু এই ঝুলন্ত দেহ পাওয়ার পর থেকেই নিজেদের প্রচার কে তুঙ্গে নিয়ে গেছে এবং তৃণমূলের সাথে সাথে শ্রমজীবি মানুষের স্বার্থে আন্দোলন করা, দলিত ও আদিবাসী জনগণের স্বার্থে কথা বলা শক্তিগুলি কে নিজেদের আক্রমণের নিশানা বানিয়েছে। আসানসোলে মার্চ মাসে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাবার হোতা, সুপ্রিয় বড়াল ওরফে বাবুল সুপ্রিয় কিন্তু সোজা আক্রমণ সেঁধেছে বামপন্থীদের উপর এই বলে যে বিজেপির দলিত ও আদিবাসী কর্মী হত্যার বিরুদ্ধে তাঁরা কেন প্রতিবাদ করছেন না। বিজেপি বলছে যে তাঁদের কর্মীদের উপর আক্রমণ আসলে ফ্যাসিবাদ এবং এর প্রতিবাদ সকল বাম ও গণতান্ত্রিক মানুষদের করা উচিত। 

হয়তো বাবুল সুপ্রিয়ের মনে নেই যে বিজেপি বা আরএসএস এর নেতৃত্বাধীন কোন সংগঠনে যোগ দেওয়ার সাথে সাথে দলিত ও আদিবাসী সমাজের কিছু দলছুট মানুষ সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর পদাতিক বাহিনীর সদস্য হয়ে ওঠে। তাঁরা যে শুধু মুসলিম বা খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক আক্রমণ চালায় তাই নয়, বরং অন্যান্য দলিত ও আদিবাসীদের বিরুদ্ধেও তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, যেমন টাটা ও বেদান্তের পয়সায় পরিচালিত হওয়া ছত্তিশগড়ের সালোয়া জুডুম এর খুনি সন্ত্রাসীরা সকলেই কিন্তু আদিবাসী সমাজ থেকে আগত আরএসএস এর সস্তা পদাতিক ছিল। তাই যে আদিবাসী বা দলিত আরএসএস সন্ত্রাসী হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের ঝান্ডা উত্তোলন করার জন্যে প্রাণ দেয়, তাঁদের সাথে শোষিত, নিপীড়িত ও অত্যাচারিত দলিত ও আদিবাসীদের কোন সম্পর্ক থাকে না। ফলে সেই গেরুয়া বাহিনীর কাছে বিকিয়ে যাওয়া আদিবাসী বা দলিতের স্বার্থের সাথে সমগ্র আদিবাসী ও দলিতদের স্বার্থের কোন সম্পর্ক থাকে না এবং তাই কোন গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল শক্তি এহেন মৃতদের পক্ষে আন্দোলন করে না। 

বিজেপির পক্ষে খরচের যোগ্য যে কোন আদিবাসী বা দলিত কর্মী কে আরএসএস এর দক্ষ সন্ত্রাসবাদীদের দিয়ে খুন করিয়ে গাছে টাঙিয়ে, ভাঙা ভাঙা বাংলা বক্তব্য লিখে একটা সেনসেশন ছড়ানো সংঘ পরিবারের পক্ষে কোন বড় ব্যাপার নয়। পুরুলিয়ার সাথে, পুরুলিয়ার আদিবাসী সমাজের সাথে বিজেপির কোন প্রত্যক্ষ বা আবেগের সম্পর্ক নেই। পুরুলিয়ার দরিদ্র মানুষ কি ভাবে দিন কাটান, কি ভাবে আদিবাসী জনগণ সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিন মাত্র ভাত খেয়ে বাস করেন, তা নিয়ে বিজেপির কোন মাথা ব্যাথা নেই। বিজেপির কাছে পুরুলিয়ার প্রয়োজনীয়তা হলো নকশালপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার জন্যে, সমস্ত জোতদার ও জমিদারদের নিজের নেতৃত্বে নিয়ে আসার জন্যে এবং অসংখ্য আদিবাসী যুবকদের টাকা, মদ ও মহিলার প্রলোভন দেখিয়ে আরএসএস এর সন্ত্রাসী বানিয়ে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে পদাতিক বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে। 

বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গের থেকে বামপন্থার রেশটুকু, শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের রেশটুকু শেষ করে দিয়ে শুধু মাত্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে নিজের পালে জোর হাওয়া টেনে প্রধান বিরোধী দল হতে চায়। মমতা বন্দোপাধ্যায় এবং কংগ্রেস পার্টিও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ভারতের যে কোন রাজ্যের মতন শুধু দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ময়দান হওয়ার পক্ষপাতী। অন্যদিকে অস্তিত্বের সঙ্কটে হতাশ সামাজিক-ফ্যাসিবাদী সিপিএম ও অন্যান্য সংসদীয় বাম দলগুলির সুবিধাবাদের পাঁকে ডুবে শেষ হয়ে যাওয়া দেখে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের মধ্যেই বামপন্থা নিয়ে এক বিরূপ মনোভাবের জন্ম হয়েছে। এই সঙ্কট কালে কোন বিপ্লবী বামপন্থী শক্তির শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি জনতার মধ্যে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত প্রচার আন্দোলনের অভাবে, লেগে পড়ে থেকে তৃণমূলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনগণ কে, বিশেষ করে দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের, আদিবাসী জনগণকে ও নমঃশূদ্র মানুষদের জাগিয়ে না তোলার ফলে আজ হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী শক্তি ও ইসলামিক মৌলবাদী শক্তি গ্রামাঞ্চলে প্রশ্রয় পেয়ে নিজেদের দুর্গ গড়ে তুলছে। 

আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়ার জন্যে বিজেপি ও আরএসএস অনেক রক্ত বইয়ে দিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দি-ভাষী অঞ্চলগুলোয় কি ভাবে উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খন্ড এবং বিহার থেকে গুন্ডা বাহিনী এনে দাঙ্গা লাগিয়ে মেরুকরণ চালাচ্ছে বিজেপি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ আসানসোল ও রানিগঞ্জের রাম নবমীর উপলক্ষ্যে লাগানো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আজ এই ঘৃণার বীজ কে আরএসএস বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে আদিবাসী অঞ্চলে রোপন করছে এবং এখনই এদের কে প্রতিরোধ করে পরাস্ত না করতে পারলে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে এমন বিষবৃক্ষ ফলে উঠবে যা আমাদের ভবিষ্যৎ কে বিষ বাতাসে ভরিয়ে দেবে এবং হিংসা ও মৃত্যুর ঘৃণ্য তান্ডব এই বাংলার পরিচয় উঠবে। হয় আমাদের আজ বাংলার ভবিষ্যতের জন্যে রুখে দাঁড়াতে হবে আর না হয় হিন্দি-ভাষী হিন্দুত্বের ধ্বজ্জাধারীদের পদদলিত হয়ে চিরকাল বাস করতে হবে।   


বাংলার মাটিতে দাঙ্গার চক্রান্ত চূর্ণ করতে ঐক্যবদ্ধ হোন



একটা সামান্য ফেসবুক পোস্ট থেকে যে ভয়াবহ ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা সমগ্র বাদুড়িয়ায় শুরু হলো এবং ক্রমেই পৌঁছে গেল বসিরহাট ও সংলগ্ন স্বরূপনগর, হিঙ্গলগঞ্জ, দেগঙ্গা ও হাসনাবাদ অঞ্চলে,  তা দেখে মনে হলো যে এই সাম্প্রদায়িক হিংসার জন্যে জমি প্রস্তুত করা হয়েছে অনেক আগে থেকেই। কারণ বিনা পরিকল্পনায় আর বিনা সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে এই ধরণের সংগঠিত হিংসা ও দাঙ্গা ছড়ানো অসম্ভব হয়ে যায়। সামগ্রিক ভাবে দেখতে গেলে একটা ফেসবুক শেয়ারের কয়েক ঘন্টার মধ্যে যে কাণ্ড গোটা বাদুড়িয়া অঞ্চলে হলো তার পিছনে রয়েছে গূঢ় অভিসন্ধি।

বসিরহাট-বাদুড়িয়া সাম্প্রদায়িক সংঘাতের কারণ কি ? কেন হঠাৎ তেঁতে উঠে এমন তীব্র হিংসায় সামিল হলো এই অঞ্চলের লোকেরা? কেন মমতা বন্দোপাধ্যায়ের প্রশাসন ও দাপুটে তৃণমূলী হার্মাদ বাহিনী আজ ব্যাকফুটে চলে গেল? কি ভাবে তপন ঘোষ - জিষ্ণু বোসের মতন হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা উত্তর চব্বিশ পরগনার মতন কৃষক আন্দোলনের জেলায় নিজেদের আধিপত্য একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সরকার ও তথাকথিত বাম ও প্রগতিশীল শক্তির অগোচরে প্রতিষ্ঠা করতে পারলো? আর হঠাৎ করেই কি, একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এই দাঙ্গা শুরু হলো? এর পিছনে কি কোন পরিকল্পনা বা সমন্বয় ছিল না ? যদি ছিল তাহলে কারা ছিল তার পিছনে? বিভিন্ন ধর্মীয় ও মৌলবাদী সংগঠনের এই দাঙ্গার পিছনে ভূমিকা কি ছিল? কেন পুলিশ নির্বাক দর্শক হয়ে বসিরহাট-বাদুড়িয়া কে জ্বলে যেতে দিল?


আপনি যদি বাংলা বা সর্ব ভারতীয় মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশন দেখেন, হিন্দুত্ববাদী পেটোয়া মিডিয়া কে বাদ দিয়েই, তবে দেখবেন সব জায়গায় দেখানো হচ্ছে যে এই দাঙ্গা একটি স্বতঃস্ফূর্ত দাঙ্গা আর এর না কোন পরিকল্পনা ছিল, না কোন লক্ষ্য ছিল। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত একটি দাঙ্গা এক জায়গার থেকে শুরু হয়েও অন্য জায়গায় এত তাড়াতাড়ি কি করে ছড়িয়ে পড়লো আর কেনই বা পুলিশ বা প্রশাসন আধা সামরিক বাহিনীর সমর্থনে এই দাঙ্গা কে দমন করতে পারলো না? যেমন ওরা দমন করেছিল লালগড়ের জনগণের ন্যায়সঙ্গত লড়াইকে বা ভাঙড়ের কৃষকদের আন্দোলন কে, ঠিক সেই ভাবে প্রশাসন কেন নখ দাঁত বের করে দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে কেন ঝাঁপিয়ে পড়লো না? কেন যে ভাবে লাঠি চার্জ করে কিছুদিন আগেই যেভাবে নবান্ন অভিযানকারী বামফ্রন্টের কর্মীদের ক্ষত বিক্ষত করেছিল মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পুলিশ বাহিনী সেই ভাবে লাঠি চার্জ করে দাঙ্গাবাজদের হাড় ভাঙতে পারলো না ?

আসলে বাদুড়িয়া-বসিরহাটের দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতটা মোটেই কোন স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন নয় বা শৌভিক সরকারের মতন এক কিশোরের ফেসবুক পোস্ট সংক্রান্ত নয়, আসলে এগুলো হলো উপলক্ষ, দাঙ্গার কারণ লুকিয়ে আছে অন্যত্রে, যা এক বৃহৎ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ এবং কিছুটা হলেও স্থানীয় দুর্নীতির সাথে যুক্ত।


বাদুড়িয়া-বসিরহাট দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিত



ইছামতি নদীর পাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে বছরের পর বছর এক সাথে বাস করেছেন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, যাঁদের বেশির ভাগই শ্রমজীবি মানুষ। উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐক্য কে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল কৃষকদের সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও শ্রমিক শ্রেণীর জঙ্গী আন্দোলন। এর ফলে অনেক চেষ্টা করেও গত শতাব্দীর ৬০ ও ৭০ এর দশকে এই অঞ্চলে কল্কে পায়নি সংঘ পরিবার বা অন্যান্য দাঙ্গাবাজ ফ্যাসিস্ট সংগঠনগুলো।

তবে ১৯৯০ এর  দশক থেকেই এই সমস্ত অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক বিভেদের পটভূমি তৈরি করা শুরু হয়, এবং আশ্চর্যজনক ভাবে সেইদিন এই বিভাজন সৃষ্টির হোতা কিন্তু ছিলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেস এর প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে তিনি বিজেপির হাত ধরেন এবং সর্ব ভারতীয় ক্ষেত্রে নিজ প্রভাব বিস্তারের স্বার্থে তিনি ও তাঁর পার্টি - তৃণমূল কংগ্রেস সেদিন কিন্তু আরএসএস ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সংগঠনগুলিকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।

তৃণমূলের সাথে গাঁটছাড়া বাঁধার কারণেই বিজেপির প্রথম বিধায়ক রাজ্য বিধানসভায় ১৯৯৯ সালে অশোকনগর উপনির্বাচন জিতে প্রবেশ করে। সেই সময়েই পশ্চিমবঙ্গের থেকে দুইজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয় বিজেপির আর রাজ্যে আস্ফালন বেড়ে চলে বিজেপির। যদিও বাম আমলে মুসলমানদের অবস্থা রাজ্যে ভীষণ করুন হয়, তবুও তৃণমূলের সাহায্যে সেই সময়ের থেকেই বিজেপি প্রচার করা শুরু  করে যে রাজ্যে মুসলমান তোষণ নাকি বেড়ে গেছে এবং হিন্দুদের থেকে নাকি মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হতে চলেছে। সেই বিষাক্ত প্রচার কে না তো তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার কোনদিন খন্ডন করেছিল আর না তৃণমূল কংগ্রেস বা জাতীয় কংগ্রেস।

২০১৪ সালের মোদী-ঢেউ যখন সারা ভারতে গেরুয়া রঙ লাগানো শুরু করলো, তখন পশ্চিমবঙ্গের থেকে আবার দুইটি আসন অনায়সে জিতে গেল বিজেপি আর সেই বিজয়ের ফলে আরএসএস এর নেতৃত্ব চরম উৎফুল্ল হয়, কারণ পশ্চিমবঙ্গ কে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও বিভাজনের মানচিত্রে না আনতে পারলে ব্রাক্ষণত্ববাদী একনায়কতান্ত্রিক কর্পোরেট-সামন্তবাদী ফ্যাসিবাদ কে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, কারণ পশ্চিমবঙ্গ, তামিল নাড়ু, কেরল, প্রভৃতি রাজ্য থেকেই ব্রাক্ষণত্ববাদী শাসক শ্রেণী পায় সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিজীবি পদাতিক বাহিনী কে।

বিজেপি ও আরএসএস এর পুনরুত্থানের পিছনে বসিরহাট এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছিল। ২০১৫ সালের বিধানসভা উপনির্বাচনে এই বসিরহাট থেকেই ভোটে জিতে বিধানসভায় প্রবেশ করেন শমীক ভট্টাচার্য। এই বসিরহাটের মাটিতে এসেই মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সরকার কে ফেলে বিজেপির সরকার গড়ার ডাক দিয়েছিলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে শেষ রক্ষা হয়নি, ২০১৬  সালের বিধানসভা নির্বাচনে গো-হারা হারতে হয় বিজেপি কে এই কেন্দ্রে।

তবে হিন্দুত্ববাদীদের ঘৃণ্য প্রচার পিছিয়ে থাকে না। বিশেষ করে প্রতিবেশী জেলায় জমি আন্দোলন শুরু হতেই কৃষক জনগণ কে জমি বা সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রাম থেকে দূরে রাখতে এবং বন্ধ কলকারখানার শ্রমিকদের কারখানা খোলার আন্দোলন বা চালু কারখানার শ্রমিকদের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে দূরে ঠেলে দিতে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসরাইল ও মার্কিন গুপ্তচর সংস্থার টাকায় চলা হিন্দু সংহতি, আরএসএস ও বজরং দল।

এই অঞ্চলে একই সময়ে গজিয়ে উঠেছে মার্কিন দালাল সৌদি আরবের টাকায় তৈরি হওয়া সালাফি জঙ্গী ইসলামের পাঠ শেখানোর মাদ্রাসা, এবং সেই মাদ্রাসা চালাতে বাইরের থেকে আসছে সালাফি ইসলামী মৌলানারা, যাঁদের শিরায়-উপশিরায় বইছে মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি জোটের ছড়ানো ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষ। এই মৌলানা ও ইমামদের একটি বড় অংশই শাসক পার্টি তৃণমূলের শিবিরে জুটেছে এবং পার্টির নানা সেলের ছোট বড় নেতা হয়ে উঠেছে।

এলাকায় এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে উঠেছে রাম ও হনুমানের মন্দির, যাঁর সাথে দিন-আনি-দিন-খাই শ্রমজীবি হিন্দুদের কোন কালেই কোন সম্পর্ক ছিল না। ইছামতির পাড়ে এই বাদুড়িয়া-বসিরহাট অঞ্চলের অনেক গ্রামে ধীরে ধীরে তলোয়ার ও লাঠি খেলা শেখানোর টোপ দিয়ে নিরীহ গরিব হিন্দু বাড়ির শিশু ও কিশোরদের নিয়ে আসে আরএসএস ও বজরং দলের কর্মীরা আর তারপর তাঁদের মন কে বিষিয়ে তোলানো হয় মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে।

হাজারো হাজারো ঝুটো ভিডিও, ছবি ও বিকৃত তথ্য পরিবেশন করে হোয়াটস্যাপ ও ফেসবুকের মাধ্যমে হিন্দু যুব সমাজের একটা বড় অংশকেই মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী বানাতে উঠে পড়ে লেগেছে আরএসএস। কিন্তু বহু বছর ধরে এক সাথে বাস করা মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে দাঙ্গা লাগানো বাংলার মাটিতে যে কঠিন সে কথা বুঝেছে আরএসএস আর তাই বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও পূর্ব উত্তর প্রদেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কর্মী ও সমর্থকদের ভাড়া করে পশ্চিমবঙ্গে আনিয়েছে গেরুয়া বাহিনী। যেই মুহূর্তে যেখানে দাঙ্গার প্রয়োজন, সেই মুহূর্তে সেখানে দলে দলে লোক কে ট্রেনে বা ট্রাকে চাপিয়ে পাঠিয়েছে আরএসএস। বিএসএফ কে ব্যবহার করে রাজনাথ সিংহ আরএসএস এর হিন্দুত্বের বিষ কে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে গভীরে রোপন করার পরিকল্পনায় সহায়তা করার জন্যে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করাচ্ছে জামাতি জঙ্গীদের, যাঁদের একটা বড় অংশ হিঙ্গলগঞ্জ ও দেগঙ্গায় আশ্রয় নিচ্ছে নানা ধরণের সুন্নি সংগঠনগুলোর শেল্টারে।


কিছুদিন আগেই, ঈদের পরের দিন, অর্থাৎ ২৭শে জুন - আরএসএস এর বেসরকারি বাংলা মুখপত্র দৈনিক যুগশঙ্খ প্রথম পৃষ্টায় একটি উস্কানি মূলক খবর ছাপে - ঈদের দিন বাদুড়িয়ার মসজিদে উড়লো পাকিস্তানের পতাকা। ছবিটি পত্রিকার কেউ তোলেনি, কারণ ছবিটি একটি মোবাইল থেকে তোলা হয়েছিল এবং পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করা হয়েছিল। কোন হিন্দুত্ববাদী গ্রূপ থেকে ছবিটি পেয়েই প্রথম পাতায় বড় বড় করে কাল্পনিক তথ্য সহ দৈনিক যুগশঙ্খ এই খবরটি ছাপে, আর ছবিটিতে পাকিস্তানের ঝান্ডা বলে দেখানো হচ্ছে ইসলামিক ঝান্ডা কে, যার ধারে কোন সাদা পাড় নেই। এই রকম ঝুটো, অথচ জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী প্রথম পাতার খবর দেখে সেই সময়েই কিন্তু বাদুড়িয়ার মানুষ ও অন্যান্য জায়গার প্রগতিশীল ও রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ কিন্তু বুঝে গেছিলেন যে ধুলাগড় ও হাজীনগরের মতন এবার বাদুড়িয়া নিয়েও কোন চক্রান্ত আরএসএস ও বিজেপি ফেঁদেছে।


শৌভিক সরকার ও বাদুড়িয়ার দাঙ্গা 

শৌভিক সরকার কে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ 

বাদুড়িয়ার রুদ্রপুরের মাগুরখালী গ্রামের ছেলে শৌভিক সরকার। ১৭ বছরের স্কুল ছাত্রটি তাঁর সম্পর্কের জেঠু বাবলু সরকারের বাড়িতে মা মারা যাওয়ার পর থেকেই মানুষ। মাগুরখালীতে হিন্দু ও মুসলিমরা নির্বিরোধে বছরের পর বছর বাস করেছেন এবং একে অপরের ধর্ম কে শ্রদ্ধা করেছেন, একে অপরের সুখ দুঃখের সাথী হয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত সোমবার  ৩ জুলাই ২০১৭ তে। বেশ কিছুদিন ধরেই শৌভিক ফেসবুক ও হোয়াটস্যাপের দ্বারা পরিচালিত আরএসএস এর বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক প্রচারের শিকার হয় এবং মুসলমানদের ধর্মীয় স্থলের উপর একটি ন্যাক্কারজনক ছবি সহ পোস্ট সে নিজের ফেসবুকে শেয়ার করে, যা দেখে তাঁর মুসলমান সহপাঠীরা ক্ষিপ্ত হয় এবং শৌভিক কে ক্ষমা চেয়ে পোস্টটা ডিলিট করে দিতে অনুরোধ করে। কিন্তু শৌভিক ক্ষমাও চায়নি এবং পোস্টটি ডিলিট করতেও অস্বীকার করে, কারণ তখন আরএসএস এর কিছু লোক শৌভিককে অনুপ্রেরণা দেয় পোস্টটা ডিলিট না করতে।

সন্ধ্যে বেলায় প্রায় ২০০ জন বহিরাগত, যাঁদের অধিকাংশই অবাঙালী (যা উত্তর চব্বিশ পরগনার গ্রামাঞ্চলে দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়) সেখানে হাজির হয় এবং শৌভিকের বাড়ির উপর আক্রমণ করা শুরু করে। স্থানীয় মাগুরখালী মিলন মসজিদের সভাপতি আমিরুল ইসলাম থেকে শুরু করে স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দারা এই বহিরাগত গুন্ডাদের আক্রমণ কে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন তবুও সংখ্যায় বা পেশী শক্তিতে তাঁরা পেরে ওঠেন না আর এই সুযোগে বাবলু সরকারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় দুষ্কৃতীরা, যারা প্রত্যেকেই বহিরাগত ও “নারা--তকবির আল্লাহু-আকবর” স্লোগান দিতে দিতে আসে। তবে সেই বহিরাগত হামলাকারীদের হাত থেকে শৌভিক কে কিন্তু রক্ষা করেন এলাকার মুসলমানেরাই। তথাকথিত মুসলিম ধর্মরক্ষী বাহিনীর লাগানো আগুন নিভিয়ে বাবলু সরকারের বাড়ি কে কিন্তু এলাকার মুসলমানরাই রক্ষা করেন। শৌভিক কে পুলিশ পরে এসে যখন গ্রেফতার করে তখন সে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে লুকিয়ে ছিল একটি পাট ক্ষেতে।

সেই সন্ধেবেলার বহিরাগতদের বাঁধানো ঝামেলার পরে কিন্তু মাগুরখালী গ্রামে আর কোন হিংসার ঘটনা ঘটেনি। তবে যদিও গ্রামের দুই সম্প্রদায়ের মানুষই শৌভিকের অর্বাচীন কাজের সমালোচনা করেছেন, কেউই তাঁর উপর আক্রমণ বা পুলিশি পদক্ষেপ কে সমর্থন করছেন না, কারণ এর ফলে ওই কিশোরের ভবিষ্যতের উপর খারাপ প্রভাব পড়বে বলে সবার বিশ্বাস। সাম্প্রদায়িক উস্কানি সত্বেও হিন্দু ও মুসলমানরা একসাথে বসে শৌভিক সরকারের বাড়িতে হওয়া আক্রমণের বিরোধিতা করেন ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরোধিতা করেন এবং আশা করেন যে গ্রামের ছেলে শীঘ্রই বাড়ি ফিরবে এবং পড়াশুনো ঠিক করে করবে।

যদিও হিন্দুদের একটি অংশ কিন্তু শৌভিকের উপর ক্ষিপ্ত তাঁর অপরিমাণদর্শিতার অভাবের কারণে এবং এই ভাবে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি মনের মধ্যে ঘৃণা পুষে রাখার কারণে। তবে গ্রামের মুসলমানেরা শৌভিকের কীর্তি কে কিন্তু বাচ্চা ছেলের কীর্তি বলে ধার্তব্যের মধ্যেই আনছেন না। আর তাই মাগুরখালীর অশান্তির ফলে তেঁতুলতলা, বাঁশপোতা থেকে শুরু করে ১৬ কিমি দূরের বসিরহাটে দাঙ্গা বাঁধলেও এই গ্রামের মানুষ নিজেদের ঐক্য কে পরস্পরের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জাহির করে আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন, কারণ তাঁরা বুঝেছেন যে এই হানাহানির সময়ে, এই ধরনের প্ররোচনার ও ষড়যন্ত্রের সময়ে, একমাত্র মানুষের ঐক্যই পারে অন্ধকারের শক্তি কে হারিয়ে দিতে।

শৌভিক সরকারের উপর আক্রমণ কারা করলো? গ্রাম বাংলার মাটিতে হঠাৎ করে এত অবাঙালির উৎপত্তি হলো কোথা থেকে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরের সাথে সাথে এ’ও জানা দরকার যে মুসলিম সমাজের একটা অংশ কে বোমা, লাঠি ও তলোয়ার দিয়ে কারা রুদ্রপুর বাজার, জঙ্গলপুর বাজার অবরোধ করতে মদত করে এবং কারা এই অবরোধ কে মুসলিমদের দ্বারা হিন্দুদের ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, হিন্দু মহিলার ধর্ষণ করা, হিন্দু জনগণ কে হত্যা করার মিথ্যা খবর বানিয়ে পরিস্থিতি কে আরও উত্তপ্ত করতে চার দিকে গুজব ছড়িয়েছিল? আর সেই গুজব শুনে পিস্তল, বোমা ও তলোয়ার নিয়ে মাথায় গেরুয়া ফেট্টি ও কপালে লাল সিঁদুরের টিপ পড়ে কারা নানা  জায়গায় মুসলিমদের দোকান ও বাড়িতে আগুন লাগায়, বাস ও ট্রাক জ্বালিয়ে দেয় এবং রেল অবরোধ করে?

শৌভিকের বাড়িতে যাঁরা আগুন লাগাতে গেছিল তাঁদের এলাকার মানুষেরা কোন দিন দেখেননি, এবং তাঁদের বেশিরভাগ লোকই হিন্দি ভাষী ছিল। সেই আক্রমণকারীদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁরা যে সকলেই মুসলমান দুষ্কৃতী ছিল তারও কোন প্রমাণ নেই। মাগুরখালীর জনগণ এই হামলার কথা চাউর করেননি, মাগুরখালী গ্রামের মুসলমান যুবক বরং দমকল ডেকে বাবলু সরকারের বাড়ির আগুন নেভাতে নেমেছিলেন। তাহলে এই হিন্দি ভাষী আক্রমণকারীরা কাদের সমর্থনে বলীয়ান হয়ে এসেছিল শৌভিক সরকারের বাড়িতে আগুন লাগাতে?

যদি আমরা ধরেও নিই যে শৌভিকের মুসলিম সহপাঠীরা দেগঙ্গার বেড়াচাঁপা অঞ্চলে ঘাঁটি গাড়া অল ইন্ডিয়া সুন্নাত আল জামায়েত, অল ইন্ডিয়া মজলিস এ ইত্তেহাদুল মুসলিমীন, বা মাগরিবী বাঙাল আঞ্জুমান এ ওয়াজিন নামক কিছু সৌদি-মার্কিন অর্থে পরিচালিত সালাফি ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী সংগঠন কে ডেকে এনেছিল শৌভিকের বাড়িতে আগুন জ্বালাতে, তাহলেও প্রশ্ন হলো এত তাড়াতাড়ি এত বড় স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত করাতে পারলো মাত্র কয়েকজন স্কুল পড়ুয়া? যে ফেসবুক পোস্টটি কে নিয়ে এত ঝামেলা সেই পোস্টটিতে এমন কি ছিল যে সংখ্যাগুরু  সম্প্রদায়ের পাল্টা আক্রমণ, মাগুরখালী গ্রামের জনগণের প্রতিরোধ, এই সবের চিন্তা না করেই ২০০ জনের উপর অবাঙালী হঠাৎ বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুর সম্প্রীতির নীড় এই গ্রামে আক্রমণ করে?

অস্বীকার করে লাভ নেই যে রাজারহাট এলাকার মৌলবাদী তোষণের স্বার্থে পরিচালিত আলিয়াহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সালাফি ছাত্রদের সমর্থনে অনেক অশিক্ষিত ও অসামাজিক পেশায় লিপ্ত মুসলমানদের- যাঁদের বেশির ভাগই শাসক পার্টি তৃণমূলের ঝান্ডাধারী-সঙ্গে নিয়ে অল ইন্ডিয়া সুন্নাত আল জামায়েত সমগ্র রুদ্রপুর বাজার ও জঙ্গলপুর বাজারে প্রথমে অবরোধ করে এবং পুলিশ অবরোধ ওঠাতে আসলেই তাঁরা দাঙ্গা করা শুরু করে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় কিছু দোকান আর রাস্তায় চলা বাস ও লরিতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এমতাবস্থায় রাস্তায় নেমে মুসলিম জনগণ কে নিরস্ত হওয়ার জন্যে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংখ্যালঘু সেলের নেতারা, কিছু অন্য সুন্নি সংগঠনের নেতৃত্ব ও এলাকার পরিচিত মৌলবীরা।

পুলিশের সাথে দাঁড়িয়ে তাঁরা অনুরোধ করেন মুসলিমদের কোন প্ররোচনার ফাঁদে না পড়তে এবং দাঙ্গাকারী সালাফি গুন্ডাদের বিচ্ছিন্ন করতে। পরিস্থিতি যখন প্রায় নাগালের মধ্যে চলে আসছিল ঠিক তখনই বিজেপির প্রচার মাধ্যমের দ্বারা ঝুটো ভিডিও ও ছবি দেখিয়ে রাজ্যের ও দেশের সর্বত্রে মুসলিম বিদ্বেষ কে বাড়িয়ে তোলা শুরু হলো। মিথ্যা প্রচারের ঢোল তীব্র ভাবে পেটানো শুরু করে সংঘ পরিবারের ভাড়াটে বাহিনীরা। ইন্টারনেটের সাথে সাথে হাতে-হাত মিলিয়ে বিজেপির পা-চাটা দালাল অর্ণব গোস্বামীর রিপাবলিক চ্যানেল, বিজেপি সাংসদ ও দুই নম্বরি কারবারি সুভাষ চন্দ্রের জি নিউজ এবং অন্য অনেক হিন্দুত্ববাদী টিভি চ্যানেল খবরটি কে বিকৃত করে প্রকাশ করা শুরু করে। তাঁরা দেখায় যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় না থাকার কারণে এখানকার হিন্দুরা অসুরক্ষিত এবং তাই বিজেপি কে এই রাজ্যে ক্ষমতায় আনা চাই।

এই প্রচারের সাথে সাথেই কিন্তু শুরু হলো হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডব। এলাকায় এলাকায় বাইকে চড়ে, পিস্তল, বোমা ও তলোয়ার নিয়ে, মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বেঁধে রাম ভক্ত হনুমানের দল কিন্তু শুরু করলো একের পর এক মুসলিম বস্তির উপর হামলা, জ্বালিয়ে দেওয়া হলো পুলিশের জিপ, পাথর বর্ষণ করা হলো পুলিশের বড়কর্তাদের উপর। প্রায় সাতজন মুসলিম কে ভয়ানক ভাবে হামলা করে এই হিন্দুত্ববাদী ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী, জ্বালিয়ে দেয় দোকান-বাজার আর লুটে নেয় গরিব মানুষের বাড়ি। হিন্দুত্ববাদীদের এই আক্রমণ কে হিন্দি ও ইংরাজী মিডিয়া কিন্তু সম্পূর্ণ রূপে অগোচরে নিয়ে যায় এবং সামনে রাখে শুধু -মুসলিম মৌলবাদের উথ্বানে বাংলা বিপন্ন - এই স্লোগান।

হিন্দুত্ববাদী অবাঙালী গুন্ডাদের বিরুদ্ধে কিন্তু দিকে দিকে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন খেটে খাওয়া হিন্দু ও মুসলিম জনগণ। দাঙ্গার সবচেয়ে ঘৃণ্য সময়ে তাঁরা কিন্তু বাংলা’র এক অদ্বিতীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজির গড়লেন, তাঁরা কিন্তু দেখালেন যে হিন্দুত্ববাদীদের প্ররোচনা সত্বেও তাঁরা, গ্রাম বাংলার মানুষেরা, কিন্তু নিজেদের ঐক্য কে ভাঙতে দেবেন না। তাই হিন্দুত্ববাদী ভাড়াটে অবাঙালী দাঙ্গাবাজদের বাজার খারাপ হলো এবং তাঁদের বিক্ষিপ্ত হিংসা ও প্রচুর পরিমাণে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে নিজেদের কে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হলো।

আরএসএস বিভিন্ন প্রদেশ থেকে যে অবাঙালী লোকেদের নিয়ে এসেছে টাকা দিয়ে ভাড়া করে, তার থেকে প্রায় ২০০০-৩০০০ লোককে তাঁরা দেগঙ্গা,স্বরূপনগর, হিঙ্গলগঞ্জ, বাদুড়িয়া ও বসিরহাট অঞ্চলে পাঠায় দাঙ্গা লাগাতে। আর এদের চোখের সামনে দেখেও মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সেই বীর পুঙ্গব পুলিশ বাহিনী কিন্তু ভাঙড়ের মতন তাঁদের উপর নখ দাঁত খুলে ঝাঁপিয়ে পড়েনি, বরং মদত করেছে কাজ সেরে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে। ধরা পড়ে  শুধু শৌভিক সরকারের মতন নাবালক চুনোপুঁটিরা আর দিলীপ ঘোষ-তপন ঘোষের মতন ব্রাক্ষণত্ববাদী-ফ্যাসিবাদী লোকেরা থেকে যায় পুলিশের থেকে সহস্র যোজন দূরে। হালকা মেজাজে দলের রাজ্য দপ্তরে দিলীপ ঘোষ সংবাদ মাধ্যম কে নির্লজ্জের মতন নিজেদের ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা সব জাল ভিডিও দেখিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে সমগ্র বাদুড়িয়ায় ও বসিরহাটে হিন্দুদের নাকি ভীষণ খারাপ অবস্থা।

মিলন মন্ডল, অভিরূপ মজুমদারের মতন কট্টর আরএসএস এর ভাড়াটে কর্মীরা ইন্টারনেটে কখনো বাংলাদেশের থেকে নেওয়া ছবি তো কখনো গুজরাট দাঙ্গার ছবি কে নির্লজ্জের মতন বাদুড়িয়া আর বসিরহাটের দাঙ্গা বলে চালাবার চেষ্টা করে। বজরং দলের লোকেরা সাদা কাগজের উপর শৌভিক সরকারের ফাঁসি চাই দাবিতে পোস্টার ছাপিয়ে নানা জায়গায় লাগিয়ে দেয় মুসলমানদের উপর দোষ চাপাতে আর খুঁজে খুঁজে মুসলমান গরুর মালিকদের হত্যা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দাঙ্গার আড়ালে। তবে যেহেতু রাজ্যটা হলো পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট বা উত্তর প্রদেশ নয়, তাই এই সকল চক্রান্তের সফল হওয়ার জায়গায় নানা ভাবে ধাক্কা খেতে হলো বিজেপি ও আরএসএস কে।

বসিরহাট - দুর্নীতিবাজ-দাঙ্গাবাজ বিজেপির গলার কাঁটা


রাজ্য বিজেপির পক্ষে বসিরহাট হয়ে উঠেছে গলার কাঁটা। অনেক দিন ধরে জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক প্রচার চালিয়ে, জোতদার-জমিদারদের ভাড়াটে গুন্ডাদের একটা বড় অংশ কে নিজেদের দিকে টেনে এনে, সাবর্ণ লুম্পেন হিন্দুদের একটা বড় অংশ কে এবং নিচু জাতের হিন্দুদের মধ্যে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া জনগণ কে হিন্দুত্ববাদের শিবিরে এনে ২০১৫ সালে কোন ভাবে বসিরহাটের থেকে নিজেদের মোদী যুগের প্রথম বিজেপি বিধায়ক জিতিয়ে এনেছিল রাজ্য নেতৃত্ব।  তবে ২০১৬ সালে সেই বেলুন চুপসে যায়, যার ফলে বিজেপি পরে বৃহৎ সঙ্কটে।

বিজেপির বসিরহাটের নেতা বিকাশ সিংহ, নিজের সহচর সুজিত বিশ্বাস ও হিঙ্গলগঞ্জের নেতা জয়দেব বর্মন সহ অনেকের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করে বসিরহাট-হিঙ্গলগঞ্জ সহ নানা জায়গার গরিব মানুষের থেকে টাকা নেন প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় বাড়ি বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। দাঙ্গা লাগার আগে, আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৩ই জুন ২০১৭ তে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বিকাশ সিংহ-সুজিত বিশ্বাসেরা প্রায় ১২০০ গরিব পরিবার থেকে ঝুটো প্রতিশ্রুতি দিয়ে ₹৪ লক্ষ করে তুলেছিলেন এবং সেই টাকা বেমালুম হাপিস করে দেন। ফলে যে গরিব মানুষগুলো চাষের জমি বন্দক দিয়ে বা চড়া সুদে নানা মহাজনের থেকে ঋণ  নিয়ে এত এত টাকা এই বিজেপি নেতাদের দিয়েছিলেন তাঁরা পড়েন অথৈ জলে।

সমগ্র বসিরহাট জুড়েই বিজেপির বিরুদ্ধে এক গণ বিক্ষোভ জাগ্রত হতে থাকে এবং এর ফলে কার্যত বাড়ি ছাড়া হয়ে থাকতে হয় বসিরহাটের বিজেপি নেতৃত্ব কে। বিজেপির মধ্যেই যারা এই টাকায় ভাগ পায়নি তাঁরা রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের কাছে নালিশ করলেও কট্টর হিন্দুত্ববাদী দাঙ্গাবাজটাও কিন্তু বিকাশ সিংহ ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের পাশেই দাঁড়ায়। রাজ্য সরকার এই দুর্নীতির তদন্তের ভার রাজ্য সিআইডি’র হাতে তুলে দিয়েছে আর তার পরে এলাকায় বিজেপির উপর আরও চাপ বাড়ে এবং যে বসিরহাটের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলে বেশ কয়েক বছর আগে দাপুটে দল হয়ে উঠেছিল বিজেপি, সেই বিজেপির অফিসে ধুপ ধুনো দেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া ভার হয়ে ওঠে।

নরেন্দ্র মোদী নিজে এসে বসিরহাটে প্রচার করে যাওয়া সত্বেও শমীক ভট্টাচার্যের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থীর কাছে বেমালুম পরাজয় দেখিয়ে দিয়েছে যে বিজেপি এই অঞ্চলে ব্যাপক ভাবেই জন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এই পার্টির পক্ষে রাজনৈতিক ভাবে এলাকায় নিজের প্রতিপত্তি পুনঃস্থাপন করার জন্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানো ছাড়া আর কোন রাস্তা ছিল না।

বসিরহাট-হিঙ্গলগঞ্জ সহ নানা জায়গায় এমন বহু লোকের উপর আক্রমণ করা হয়েছে যাঁরা বিজেপির বিরুদ্ধে ২০১৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন বা বিকাশ সিংহ, সুজিত বিশ্বাস বা জয়ন্ত বর্মনের মতন দুর্নীতিবাজ হিন্দুত্ববাদী ঠগদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আড়ালে বিজেপি ক্রমাগত ভাবে তৃণমূল কে পিছনে ঠেলে সমগ্র বসিরহাটে নিজের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে আর এই কাজে দিলীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ দুর্নীতিবাজ বিকাশ সিংহ এক মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

মূলতঃ নিজেদের প্রতিপত্তিকে পুনঃস্থাপন করার জন্যে এবং বসিরহাটের ভাঙা সংগঠন কে জোড়া লাগাতেই আরএসএস এর নেতৃত্বে বিজেপি এই দাঙ্গার প্রস্তুতি করেছিল বিভিন্ন মাধ্যম কে ব্যবহার করে। সমগ্র অঞ্চলের চোরাচালানকারী, নারী পাচারকারী, শিশু পাচারকারীদের একত্রিত করে এক বিশাল বাহিনী আরএসএস তৈরি করেছে এবং তার সাথে জুড়েছে দুষ্কৃতীদের বাহিনী বজরং দল আর দাঙ্গাবাজ গোপাল পাঁঠার অনুগামী তপন ঘোষের হিন্দু সংহতি।
বাদুড়িয়া - বসিরহাটের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও মুসলিম সংগঠনগুলির ভূমিকা

বাদুড়িয়া - বসিরহাটের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও মুসলিম সংগঠনগুলির ভূমিকা



যদিও শৌভিক সরকারের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে সামগ্রিক ভাবে সুন্নি মুসলমান সমাজের মধ্যে একটি উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল, তবে যে ভাবে কট্টর মৌলবাদী সংগঠনগুলির একটা বড় অংশ দাঙ্গা ও হাঙ্গামার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তা কিন্তু অভাবনীয় ছিল। বিশেষ করে অনেকগুলো সুন্নি মুসলমান সংগঠনের নেতারা যে ভাবে পুলিশের সাথে নেমে বিক্ষুব্ধ জনগণ কে শান্ত করার চেষ্টা করেন, তার থেকে অনেক তথাকথিত হিন্দু সংগঠনেরও অনেক শেখার আছে।

শৌভিকের ফাঁসির দাবিতে আর স্রেফ দাঙ্গা করে নিজেদের প্রতিপত্তি জাহির করতে চাওয়া সংগঠনগুলির কিন্তু লোকবল যেমন কম ছিল তেমনি এদের বেশির ভাগই ছিল বাইরের দল, যারা এলাকার সমাজবিরোধীদের পথে নামায়। হায়দ্রাবাদের নিজামের কুখ্যাত রাজাকার বাহিনীর স্রষ্টা যে দল, সেই অল ইন্ডিয়া মজলিশ এ ইত্তিহাদে মুসলিমীন বা এআইএমআইএম দলের কিন্তু এই দাঙ্গার পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলে এলাকার মুসলমানরা মনে করছেন। ওয়াইসি নেতৃত্বকারী এই দলের সাথে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বহু মুসলমান সম্প্রদায় থেকে আসা চোরাচালানকারী যেমন যুক্ত ঠিক তেমনি যুক্ত কিছু মাছের ভেঁড়ির মালিক, ভিন রাজ্য থেকে আসা মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার মৌলবীরা, যাঁরা চরম ভাবে বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতি কে ঘৃণা করেন।

এআইএএমআইএম এর নেতৃত্বকারী ওয়াইসি ভ্রাতৃকূল এর আগেও সালাফীবাদের প্রচারের মাধ্যমে দেশের মুসলমানদের মধ্যে বিষাক্ত চেতনার বীজ রোপনের চেষ্টা করেছে এবং বহু অশিক্ষিত এবং পিছিয়ে থাকা মুসলমানদের মধ্যে নিজেদের প্রতিপত্তি বিস্তার করে ওয়াইসি ভ্রাতৃকূল কিন্তু নানা রাজ্যে মুসলমান ভোট কে ভাগ করে বিজেপি ও আরএসএস কে সাহায্য করে দিয়েছে। বিহার এর নির্বাচনে ওয়াইসির ঝাঁপিয়ে পড়া কে অনেকে স্রেফ মনে করে দেখতে পারেন।

তবে একক ভাবে শুধু এআইএএমআইএম কে দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ রাজ্যের তৃণমূল সরকারের প্রচ্ছন্ন মদত ও আশ্বাস না পেলে কিন্তু মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলি কোনদিনই ঘুরে দাঁড়াতে পারতো না পশ্চিমবঙ্গের জমিতে। অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদীদের চরম হারে মেরুকরণের অভিযান দেখিয়েও কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ভাবে মেরুকরণ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে আর তলে তলে মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলির সাথে তালমিল ঠিক রেখেই দাঙ্গার ছক কষছে আরএসএস-বজরং দল ও হিন্দু সংহতি।

বাদুড়িয়া-বসিরহাট দাঙ্গার শিক্ষা কি ? এই পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির কি করণীয়?


বাদুড়িয়া ও বসিরহাটের দাঙ্গার পরে রাজ্যে হিন্দু সংহতি ও এআইএএমআইএম এর সভা সমিতির উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সরকার। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আরও তাড়াতাড়ি নেগেটিভ পপুলারিটি বা নেতিবাচক জনপ্রিয়তা পেয়ে যাবে এই দুই ফ্যাসিবাদী সংগঠন। আজ এই দলগুলির সভা সমিতির উপর নিষেধাজ্ঞা না চাপিয়ে দরকার ছিল এই দলগুলোর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভাবে মোকাবিলা করা আর সেই ক্ষেত্রে কিন্তু মমতা বন্দোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার হাত গুটিয়ে বসে আছে।

২০১১ সালে মমতা বন্দোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার সময়ে তাঁর পিছনে বলিষ্ঠ সমর্থন দিতে দাঁড়ায় হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলি। মমতা বন্দোপাধ্যায়ের গত ছয় বছরের সরকারের মেয়াদে সবচেয়ে বেশি অক্সিজেন পেয়ে একেবারে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলি। তপন ঘোষের মতন দাঙ্গাবাজরা পুলিশি সুরক্ষায় রাজ্য জুড়ে হিন্দুদের, বিশেষ করে গরিব ও পিছিয়ে থাকা হিন্দুদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে বারবার। শহর ও মফৎস্বল থেকে দূরে এবার গ্রামাঞ্চলের মাটিতে এরা আরএসএস ও বিজেপির স্বার্থে বিভাজনটি আরও চরম করতে চায়।

গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে আজ খুঁজে দেখতে হবে নিজেদের দুর্বলতাগুলো এবং সেগুলো কে আজ কাটাতে হবে যথার্থ ভাবে। তাঁদের আজ মানুষের কাছে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পৌঁছাতে হবে কারণ আজ বিদ্যুৎ গতিতে কিন্তু আরএসএস বা সুন্নি সংগঠনগুলির ঘৃণা ভরা প্রচার তাঁদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই কিন্তু লোকে এই সমস্ত প্রচারে বিশ্বাস করে ফেলছেন এবং সেই তথ্যগুলো কে পুনরায় নতুন লোকেদের মধ্যে প্রচার করছেন।

সমস্ত প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে আজ বাদুড়িয়া-বসিরহাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার থেকে শিক্ষা নিয়ে একটা জনপ্রিয় এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রচার মাধ্যম গড়ে তুলতে হবে, যাতে সমগ্র জনগণের কাছে যে কোন ঘটনার  একটি বিশদ, তথ্যপূর্ণ এবং সমালোচনা-মূলক প্রতিবেদন পেশ করা যায় এবং তার মাধ্যমে সমাজের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বৈরিতা সৃষ্টি কে রোখা যায়। আর এই কাজ করতে গেলে চাই সংগঠন ও মানুষের মধ্যে পৌঁছে যাবার প্রচেষ্টা।

আমাদের বুঝতে হবে যে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে কোন ধরনের সাম্প্রদায়িকতা বা মৌলবাদ বেশি সর্বনাশী। দেখতে গেলে তো সব মৌলবাদী শক্তিই খারাপ তাহলে ভারতে প্রধান শত্রু হবে কে ? এর জন্যে দেখতে হবে যে ভারতে বা পশ্চিমবঙ্গে কোন সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। তাহলে আমাদের সামনে আসবে হিন্দু সম্প্রদায় এবং এর মৌলবাদী অংশ যা হিন্দুত্ববাদ নামে পরিচিত। কেন হিন্দুত্ববাদ কে সবচেয়ে ভয়ানক বলে মানছি? কারণ যে কোন দেশের সাম্প্রদায়িক সংঘাতে বা মৌলবাদের বৃদ্ধিতে সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের যোগদান বেশি হয়। হিন্দুত্ববাদ কে যেমন আমরা পাকিস্তান বা বাংলাদেশে প্রধান শত্রু মানতে পারবো না তেমনিই আবার আমরা ভ্যাটিকান সিটিতে শিখ মৌলবাদের বিরোধিতা করতে যাব না।

হিন্দুত্ববাদের দাঙ্গা লাগাবার মূল পরিকল্পনা হলো যে এরা হিন্দুদের, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে একটি বিপন্ন ও দুর্বল সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করে জনগণ কে মুসলমানদের বিরুদ্ধে, খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহ দিতে থাকে।  তাই প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিটি প্রতিনিধির আজ দরকার হলো তথ্য ও জ্ঞান এবং তাই দিয়ে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষদের বোঝাতে হবে যে কেন তাঁরা নন, বরং দেশে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, দলিত ও আদিবাসীরা। আর এই কাজ তর্ক বিতর্ক করে সম্ভব নয়, সম্ভব শুধু মাত্র ভীষণ ধৈর্য সহকারে জনগণ কে বোঝানো মারফত। ট্রেনে-বাসে-অফিসে আর কারখানায় মানুষের সাথে কথা বলা দরকার, তাঁদের ভুল ধারণা ভাঙ্গা দরকার এবং যে মিথগুলো দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে শাসক শ্রেণী তা আজ ভাঙা দরকার।

প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি এই কাজগুলো করতে পারে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করা যেতে পারে এবং ক্রমাগত প্রচার চালাবার জন্যে কর্মী পাওয়া যায়। আর এই প্রস্তুতি গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে আজ থেকেই করে যেতে হবে না হলে সামনে আরও অনেক বাদুড়িয়া -বসিরহাটের মতন ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা ও অশান্তি। আগামী বাংলা কে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার থেকে মুক্ত করতে, বাংলার সামগ্রিক খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে ঐক্য কে দৃঢ় ভাবে স্থাপন করতে, অবাঙালী-বহিরাগত রক্তচোষা মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি, ফোঁড়ে, দালাল, সুদের কারবারীদের থেকে বাংলা কে রক্ষা করতে, আজ জনগণের গভীরে পৌঁছাতে হবে, তাঁদের সম্পূর্ণ সত্য বলতে হবে এবং সমস্ত ভোটপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির স্বরূপ এদের সামনে আনতে হবে। তবেই জনগণ কে একটি গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পতাকাতলে সমবেত করে আরএসএস - বিজেপির মতন ঘৃণ্য দাঙ্গাবাজ মার্কিন দালাল শক্তি কে বাংলার মাটিতে পরাস্ত করা সম্ভব।  
    


পশ্চিমবঙ্গের ইস্কুলে বাংলা বাধ্যতামূলক হওয়ায় অল্প হলেও ধাক্কা খেল মোদীর হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের স্বপ্ন


পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা মন্ত্রী পার্থ চাটুজ্যের জন্যে বড় বেশি পিরিত হচ্ছে মনে, এত ভাল লাগছে লোকটার সিদ্ধান্ত কে যে ইচ্ছা হচ্ছে ধেইধেই করে নাচি। পশ্চিমবঙ্গে বাস করা শিশু কে যে স্কুলেই পড়ান না কেন তাঁকে বাংলা অবশ্যই শিখতে হবে। বলা যেতে পারে যে তলে তলে যতই তালমিল করে চলা হোক না কেন এই সিদ্ধান্ত তৃণমূল সরকারের তরফ থেকে দেশের সব ভাষাভাষীর মানুষের উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার কাজ করে চলা মোদী সরকারের, আর সেই সরকারের পিতৃদেব আরএসএস এর গালে একটি বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়।  

বাংলা লেখাপড়া শিখিয়ে ছেলে মেয়েদের শিক্ষিত করার কাজে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের ভীষণ অনীহা। সেই ব্রিটিশ যুগ  থেকেই চলছে সাবর্ণ ভদ্রলোক সমাজের ইংরাজীর সামনে নাকে খত  দেওয়া। যদিও বা ভারতের ও বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ইংরাজীর এই জরুরী ভূমিকার কথা মেনেও নেওয়া যায় তাহলেও কিন্তু বাঙালি বা তামিল ভাষী ছাত্র-ছাত্রীদের জোর করে হিন্দি শেখানোর যে নির্দেশিকা কেন্দ্রীয় সরকার চাপিয়ে দিয়েছে দেশের শৈশবের উপর তার আসল কারণ হলো হিন্দির দ্বারা সমস্ত অন্যান্য ভাষা কে পদদলিত করা ও গোলাম জাতি তৈরি করা। এবং এই সিদ্ধান্ত কে পশ্চিম পাকিস্তান কতৃক পূর্ব পাকিস্তানের উপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার মতনই মেনে নেওয়া যায়না।

১৯৬০ এর দশকে দ্রাবিড় আন্দোলনের ফলে, শিলচরের বাঙালির আত্মত্যাগের ফলে নেহরু সরকারকে ভারতের জনগণের উপর সংস্কৃতায়ন করা হিন্দি ভাষা জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের থেকে পিছু হটতে হয়। তবে সেই সময়ের থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যে ভাবে সিনেমা, সংস্কৃতি, সংগীত ও সরকারি কার্যকলাপের মাধ্যমে সারা ভারতে হিন্দি ভাষা দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তার ফলে বর্তমানে হিন্দুত্ববাদের ধ্বজ্জাধারী আরএসএস ও বিজেপির পক্ষে দেশের বেশির ভাগ অ-হিন্দি ভাষী সমাজের উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া ও দেশটিকে একটি হিন্দি ভাষী হিন্দু দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে।

বাঙালি, উড়িয়া, অহমীয়, মনিপুরী, তামিল, নাগা প্রভৃতি জাতির উপর, গোন্দ, গিরিজন, ডোঙ্গরিয়া কোন্ধ, সাঁওতাল, ওরাওঁ, ভীল, মুন্ডা, প্রভৃতি আদিবাসী সমাজের উপর আজ হিন্দির আগ্রাসন তীব্র গতিতে বাড়ছে। এমনকি হিন্দি বলয়ের অবধি, মৈথিলি, ভোজপুরি, পূর্বাঞ্চলীয় ভাষাগুলি ধীরে ধীরে হিন্দির উপাঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে নিজ বৈশিষ্ট্য ও নিজ স্বতন্ত্রতা আজ হারিয়ে ফেলেছে। তামিল, মালয়ালম, কন্নড় ও তেলেগু ভাষী মানুষের উপর আজ উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্বের আগ্রাসনের ফলে, ব্যাঙের ছাতার মতন বেড়ে চলা আরএসএস ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের শাখার ফলে, হিন্দির প্রভাব বেড়ে গেছে। শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি মানুষের একটি বড় অংশ কে আজ নানা কায়দায়, নানা জায়গায় হিন্দি বলতে বাধ্য করা হচ্ছে।


এইরকম পরিস্থিতিতে শ্রমজীবি মানুষের একটা বড় অংশই ধীরে ধীরে হিন্দি ভাষার ও সংস্কৃতির দাসে পরিণত হচ্ছেন, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে। এই শ্রমজীবি জনগণের মধ্যে পরবর্তী কালে তাই জাতি ও ধর্মীয় বিদ্বেষের নবীনতম সংস্করণগুলো, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিন্দি ভাষী সংঘ কর্মীরা হিন্দি ভাষায় সৃষ্টি করে থাকে, তার প্রচার অনেক সহজ হয়ে যায়, আর আরও সহজ হয়ে যায় কিছু কাঁচা টাকার লোভ দেখিয়ে এই শ্রমজীবি মানুষের বাড়ির ছেলে মেয়েদের সংঘের শাখায় ভর্তি করিয়ে তাঁদের দিয়ে মুসলমান ও খ্রিষ্টান হত্যাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত করা। এই হিন্দি ও হিন্দুত্বের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শোষিত ও পদদলিত জাতিগুলি, বাংলার মতন বিপন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিগুলি আজ রুখে দাঁড়াতে পারছে না নিজ জাতির শ্রমজীবি মানুষের মধ্যে ভাষার অধিকারের স্বার্থে  গড়ে ওঠা লড়াইয়ের অভাবে।

দীর্ঘদিন ধরে সমস্ত স্তরে পরিকল্পিত ভাবে হিন্দির ব্যবহার বাড়িয়ে তুলে ও দেশের মধ্যে তীব্র আঞ্চলিক বঞ্চনা কে হাতিয়ার করে  ভারতের শাসক শ্রেণী, অর্থাৎ হিন্দি-মরাঠি ও গুজরাটি ভাষী বৃহৎ মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিরা ও বড় বড় জোতদার-সামন্তপ্রভুরা দেশের শ্রমজীবি মানুষ কে বাধ্য করেছে নিজেদের প্রদেশ ছেড়ে হিন্দি-মরাঠি বা গুজরাটি ভাষী প্রদেশে বাস করতে এবং হিন্দি ভাষায় একে অপরের সাথে কথা বলতে। এই ভাবে দেশের শ্রমজীবি মানুষের থেকে এই বড় বড় পুঁজিপতি ও জোতদারেরা কেড়ে নিয়েছে তাঁদের নিজের ভাষায় কথা বলার ও নিজের রাজ্যে বাস করে দু বেলা পেট ভরে খেয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। নিজ শিকড় থেকে ছিন্ন হয়ে বাধ্য হয়েই এই সমস্ত শ্রমজীবি মানুষ অন্য প্রদেশে বাস করা শুরু করেন এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম বাংলা ও বাঙালি জীবনের থেকে সম্পূর্ণ রূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে জন্মগ্রহণ করে। আর এই ভাবেই একটি জাতি কে খুবই ঘৃণ্য কূটনীতির দ্বারা ব্রাক্ষণত্ববাদী উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় শাসক শ্রেণী নিজেদের গোলামে পরিণত করে।  

পশ্চিমবঙ্গ কে দীর্ঘদিন ধরে চক্রান্ত করে দেশের মধ্যে এক ঘরে করে রেখেছে এই দেশের হিন্দুত্ববাদী শাসক শ্রেণী ও তাঁদের দালাল সরকারগুলো। ফলে বাংলার মাটি ত্যাগ করে প্রতি বছর নানা ধরনের শিল্পে কাজ করতে, দিন মজুর বা কুলির কাজ করতে লক্ষ লক্ষ মানুষ দিল্লি, বোম্বাই, সুরাট, বারোদা প্রভৃতি জায়গায় যান এবং সেই সব রাজ্যের অধিবাসী হয়ে যান। এদের বেশির ভাগকেই শীঘ্রই নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে শুধুমাত্র শাসকশ্রেণীর স্বার্থে গোলামের মতন খেটে যেতে হয় এবং শাসক শ্রেণীর ভাষায় কথা বলতে হয়, শাসক শ্রেণীর আদব কায়দায় জীবন যাপন করতে হয়। এই সকল রাজ্যে প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে বাঙালি জাতি ও সেই জাতির অস্তিত্ব নিয়ে এতই অপপ্রচার করা হয় যে বেশির ভাগ স্বল্প চেতনার মানুষ সেই অপপ্রচার কে বিশ্বাস করে ফেলেন ও নিজ জাতির উপর ও ভাষার উপর তাঁদের বিতৃষ্ণা জাগে।

পশ্চিমবঙ্গে বাস করা উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সাবর্ণ বাঙালি ভদ্রলোকদের বেশির ভাগই আর ছেলে মেয়েদের বাংলা শিখতে দেননা আর বাংলা নিয়ে কটা রবীন্দ্র জয়ন্তী বাদে আর কোন চর্চা করতে দেননা। বিশেষ করে ইন্টারনেটের যুগে এগিয়ে থাকতে ছেলে মেয়েদের জোর করে ইংরাজী মিডিয়াম ইস্কুলে ভর্তি করেন এবং নিজ ভাষা কে বাদ দিয়ে অন্য ভাষা কে শ্রদ্ধা করতে শেখান। যে ছেলে মেয়েরা বাংলা মাধ্যম ইস্কুল থেকে পাশ করেন তাঁদের এই সাবর্ণ, wannabe, ভদ্রলোকের ছানারা হেয় চোখে দেখে এবং কোন মর্যাদা দেয় না। যেহেতু সকল চাকরির ইন্টারভিউ ইংরাজী ভাষায় হয় এবং নানাবিধ প্রযুক্তির পরিচালনা ইংরাজী ভাষায় হয় তাই বাংলা মাধ্যম থেকে পাশ করা বহু নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের ইংরাজী মাধ্যম থেকে লেখাপড়া শেখা ছাত্র-ছাত্রীদের তুলনায় দুর্বল ভেবে নেন এবং জীবনে একটি হীনমন্যতার শিকার হন। মনে রাখবেন যে এসইউসিআই এর ডাকা প্রাথমিক থেকে ইংরাজী শিক্ষার দাবিতে বাংলা বনধ সেই নব্বইয়ের শেষদিকে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল এই কারণেই।

ইংরাজী যেমন ভারতের ভাষা নয় আর হিন্দি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের ভাষা নয় তাই এই দুটি না জানা থাকলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কোন ক্ষতি যেমন নেই, ঠিক তেমনিই এই ভাষাগুলো না জানা কোন লজ্জার বিষয় নয়। ফ্রান্সে বা জার্মানিতে সেখানকার মানুষ ইংরাজী জানা থাকলেও অনেক সময়ে ইংরাজী ভাষায় জিজ্ঞাসা করা প্রশ্নের উত্তর দেননা ইংরাজী জানা নেই বলে অজুহাত দিয়ে। আসল কথা হলো সেই দেশের মানুষের দাবি হলো যে তাঁদের দেশে আসা প্রতিটি জাতির মানুষ যেন তাঁদের নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করেন এবং ভাঙা ভাঙা হলেও সেই ভাষায় তাঁদের সাথে কথা বলেন।    

যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার বহু বছর পরে আবার বাংলা শিক্ষা কে বাধ্যতামূলক করলো, তাই পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সকল ধরণের ইস্কুল কে এখন থেকে ছাত্রছাত্রীদের তাঁদের মাতৃভাষা ছাড়াও বাংলা শেখাতে হবে এবং এর ফলে বাংলার বিরুদ্ধে হিন্দি ও গুজরাটি ভাষী উচ্চ জাতির হিন্দুদের ঘৃণা বেড়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গে বাস করা হিন্দি ও গুজরাটি ভাষী উচ্চ জাতির লোকেরা প্রধানতঃ বৃহৎ মুৎসুদ্দি ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণীর লোক এবং এই রাজ্যে এরাই মূলত আরএসএস কে জমি করে দিচ্ছে। ফলে যে মুহূর্তে এদের বাড়ির ছেলে মেয়েরা সহজপাঠ পড়বে বা রবি ঠাকুর আর নজরুল পড়বে, তখনই এদের ব্রাক্ষণত্ববাদী মাড়োয়ারি-গুজরাটি হৃদয় বেদনায় কাতরে উঠবে, এবং যুগ যুগ ধরে এদের পুঁজির ক্রীতদাস হয়ে বাস করা বাঙালির কাছে সেটা হবে হয়তো একটা ছোট আনন্দের ক্ষণ।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধান্ত কে সমর্থন করলেও বাংলা কে কোন রকমেই শোষিত জনজাতির উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস কে সমর্থন করা যায় না। সাঁওতালি, নেপালি, রাজবংশী সহ বিভিন্ন ভাষায় কথা বলা, গান গাওয়া ও নিজ কর্ম ক্ষেত্রে কাজ করা মানুষের অবিচ্ছিন্ন অধিকার। বাংলা কে পশ্চিমবঙ্গের শোষিত জনজাতি ও আদিবাসী মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে ঠিক হিন্দি কে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার নামান্তর। বাংলা কে শুধুমাত্র তাঁদের জন্যে আবশ্যিক করা উচিত, যাঁরা শোষিত জনজাতি বা আদিবাসী সমাজের মানুষ নন, যাঁদের নিজস্ব স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই এবং যাঁরা বাংলার শোষকশ্রেণী হিসেবে পরিচিত, যেমন মাড়োয়ারি, গুজরাটি, ইত্যাদী সমাজের লোকেদের জন্যে বাংলা কে আবশ্যিক করা অবশ্যই সমর্থন যোগ্য। কিন্তু সাঁওতালি, রাজবংশী, ইত্যাদী ভাষার মানুষ কে জোর করে বাংলা শেখানো অনুচিত, বরং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচিত এই সকল জনজাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়কে তাঁদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি কে রক্ষা করতে সাহায্য করা এবং সমস্ত আদিবাসী ভাষা কে সরকারি ভাষার সম মর্যাদা দেওয়া, সেই সব ভাষার লিপি পুনরুদ্ধার করা বা নতুন করে তৈরি করা এবং সেই ভাষার ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা।

তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখন উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন সমাজবাদী সরকারের মতনই অস্তগামী কারণ বছরে প্রায় ₹৩০০০ কোটি খরচ করে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের বুকে নিজের রাজত্ব কায়েম করার লক্ষ্যে তীব্র গতিতে এগিয়ে চলেছে। উচ্চ জাতির অবাঙালি হিন্দুদের ও সাবর্ণ বাঙালি ভদ্রলোকদের একটা বড় অংশের উপর এদের আজ একচেটিয়া রাজনৈতিক কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আর এর ফলেই তৃণমূলের অবস্থা একেবারে ঘাটের মড়ার মতন হয়েছে। ফলে এই সরকারের দ্বারা ইস্কুলে বাংলা ভাষা আবশ্যিক করার সিদ্ধান্ত বিজেপির উপর একটা বড় ধাক্কা হলেও এর ফলে বিজেপি ও আরএসএস আরও বেশি করে অবাঙালি উচ্চ জাতির বেনিয়াদের ও অবাঙালি হতে চাওয়া বাঙালি সাবর্ণদের তাতিয়ে তুলবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আর তার ফলে বাঙালি ও অবাঙালি বেনিয়াদের মধ্যে দ্বন্ধটা খোলাখুলি প্রকাশ পাবে, যা হয়তো বাঙালির আত্মসম্মানের ও স্বাধিকারের দাবিতে লড়াই কে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তুলবে আগামী দিনে। আপাততঃ ইস্কুলের বাচ্চারা বাংলায় পড়ুক নজরুলের কবিতা আর রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প।  

  

এই ব্লগের সত্বাধিকার সম্বন্ধে