গণতন্ত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গণতন্ত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

কাশ্মীরের জনগণের স্বাধীনতার সংগ্রাম ভারতের সেনার পেশী শক্তিতে ভীত সন্ত্রস্ত নয়

কাশ্মীরের মাটিতে ভারতের সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে পাথর যুদ্ধে রত কিশোরী

কাশ্মীরের মাটিতে ভারতীয় সেনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ বিপুল ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে আর কাশ্মীরের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার ছোড়া প্রতিটি পাথর বিজেপি ও আরএসএস এর সেই “নোটবন্দি হওয়ায় পাথর ছোড়া বন্ধ হয়ে গেছে” গোছের দাবিকে চূর্ণ বিচূর্ণ করছে। আর এই জনজাগরণের বিরুদ্ধে ভারতে উঁচু জাতের হিন্দু মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা রোজ গলা চড়িয়ে সেনাবাহিনী কে গণহত্যা করার জন্যে দাবি জানানো সত্বেও এবং মোদী সরকারের দ্বারা কট্টর ব্রাক্ষণত্ববাদী বিপিন রাওয়াত কে কাশ্মীরিদের উপর অকথ্য অত্যাচার করে এই গণ সংগ্রাম বন্ধ করার দ্বায়িত্ব ন্যস্ত করা সত্বেও কাশ্মীরের মাটিতে সরকারি সন্ত্রাস ডাহা ফেল করছে। কাশ্মীরের জনগণ মাথা উঁচু করে সংগ্রাম করছেন।

যদিও ভারতীয় সেনা বাহিনীর জেনারেল বিপিন রাওয়াত, নিজ সামন্ততান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে একবিংশ শতাব্দীতেও ঘোষণা করে চলেছে যে আধিপত্য বজায় রাখতে হলে ভারতীয় সেনা কে জনগণের মধ্যে নিজ-সম্পর্কে ভীতি সঞ্চার করতেই হবে, তবুও কার্যক্ষেত্রে এই সামন্ততান্ত্রিক চেতনা দিয়ে গড়ে তোলা - নয়া ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা কে রক্ষা করার বাহিনী - ভারতীয় সেনা কিন্তু আজ রোজ অসংখ্য মানুষ কে গুলি করে মেরেও ভারত কাশ্মীরের জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতে পারছে না, আর যেহেতু ভারতের সেনা বাহিনী জনগণের মধ্যে নিজের শক্তি সম্পর্কে ভীতি জাগ্রত করেই নিজের প্রতিপত্তি কায়েম করতে সক্ষম হয় তাই সেই কাজে অক্ষম হয়ে এই বাহিনী কাশ্মীরের মাটিতে হেরো বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।

লিতুল গগৈ এর মতন এক ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী কে ভারতীয় সেনার দ্বারা মেডেল দেওয়া কোন বড় ব্যাপার নয় কারণ লিতুল গগৈ’র আগে ভারতের শাসক শ্রেণীর, টাটা-আম্বানি-আদানি ও জোতদার-জমিদারদের স্বার্থ রক্ষাকারী সেনা বাহিনী ও আধা সেনা বাহিনী সেই সমস্ত অফিসার ও সৈনিকদের পুরস্কৃত করেছে যারা নানা ভাবে জনগণের উপর অত্যাচার করে বা সন্ত্রাস ছড়িয়ে শাসক শ্রেণীর প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করতে সাহায্য করেছে। তাই কুনান পোশপারায় গণধর্ষণ থেকে শুরু করে কাশ্মীরের অসংখ্য গণহত্যা ও গুমখুনের হোতা সেনা জওয়ানদের দেওয়া হয় বড় বড় পুরস্কার ও প্রচুর অর্থ ও সুযোগ সুবিধা। সেই খুনি ও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে পাথর ধেয়ে আসলেই বলা হয় “গরিবের ছেলেটা কে মারছে” আর সেই মধ্যবিত্তরা, যারা দিল্লিতে একটি ছাত্রীর গণধর্ষণের পরে সারা দেশ জুড়ে আন্দোলনের পথে নেমেছিল, তারাই কুনান পোশপারায় ৯ বছর থেকে ৭০ বছরের নারীদের গণধর্ষণকারী জওয়ানদের বাহবা দেয় দেশ প্রেমের মূর্ত স্বরূপ বলে।

ভারতের মাটিতে কাশ্মীর কে কেন্দ্র করে যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ সাবর্ণ হিন্দু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের কে ভারতের শাসক শ্রেণী এক ছাতার তলে আনতে সক্ষম হয়েছে এবং কাশ্মীরের উপর ভারতীয় অধিগ্রহণ কে বজায় রাখার সামাজিক স্তম্ভ রূপে এই সমর্থন কে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে, তাই নরেন্দ্র মোদীর সরকারের পক্ষে ভারতের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের কাছে কাশ্মীরের জনগণের উপর অকথ্য সামরিক দমনপীড়ন ও অত্যাচার চালানোর জন্যে কোন অনুশোচনা করতে যেমন হচ্ছে না, তেমনি কোন রকমের জবাবদিহিও করতে হচ্ছে না। জনগণের করের টাকায় কাশ্মীরের মানুষ মারার জন্যে বেশি বেশি করে সৈন্যবল কে পাঠানো হচ্ছে জনগণের রক্তে হোলি খেলার জন্যে ও ভারতের ঔপনিবেশিক শাসন ও আগ্রাসন কে বজায় রাখার জন্যে। মনিপুর, নাগাল্যান্ড থেকে কাশ্মীরে তাই নির্বিচারে গণহত্যা করা আজ একেবারে জলভাত হয়ে গেছে। আর সাবর্ণ মধ্যবিত্তদের ও উচ্চবিত্তদের কাছে এই রক্তপাত আজ স্বস্তিদায়ক, তাঁদের মুসলিম বিদ্বেষী আত্মা আজ পরিতৃপ্ত।  

বর্তমানে অনেক বিরোধী দল ও শক্তি নরেন্দ্র মোদীর সরকার ও আরএসএস এর দিকে কাশ্মীর সমস্যাকে বেড়ে যেতে দেওয়ার অভিযোগ করে তর্জনী তুলেছে। ব্যাপারটা এমন ভাবে পেশ করা হচ্ছে কিছু কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে, যেন কাশ্মীরের সমস্যা কে খুব সহজেই সমাধান করা যেত, কিন্তু যেহেতু নরেন্দ্র মোদী কাশ্মীরের মাটিতে হিংসার আবহাওয়া কে জিইয়ে রেখে রাজনৈতিক ভাবে হিন্দুত্বের ঝান্ডা কে বলিষ্ঠ ভাবে ভারতীয় সাবর্ণ হিন্দু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে গেড়ে দিয়ে নিজের প্রতিপত্তিকে শক্তিশালী করতে উদগ্রীব, তাই এই সমস্যার কোন সমাধান হচ্ছে না। আর মূলধারার প্রচার মাধ্যমের তথাকথিত সরকার-বিরোধী পক্ষের এই যুক্তি মোদী ও হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী ভারতের বেশির ভাগ মানুষই মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কাশ্মীরের সমস্যা সমাধানের পথ বাতলানো হচ্ছে আলোচনার টেবিলের মাধ্যমে, যদিও সেইরকম হাজারো আলোচনা অতীতে ভেস্তে গেছে ও কোন ধরণের সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সাহায্য করেনি।  

তবে আমাদের কাছে আজ সমস্যাটা নরেন্দ্র মোদীর অপশাসনের নয় বরং কাশ্মীর নিয়ে ভারতের শাসকশ্রেণীর দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা নীতির প্রশ্ন। কাশ্মীর কি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ? কাশ্মীরের জনগণ কি নিজেদের ভারতের নাগরিক হিসেবে মনে করেন? ভারতের সেনা কে কি কাশ্মীরের জনগণ ডেকে নিয়ে গেছিলেন উপত্যকায়? কাশ্মীরের বিক্ষোভকারীরা কি জনগণের একটা ছোট অংশমাত্র?

উপরোক্ত প্রশ্নগুলির জবাব আপনি নানা শিবিরে নানা রকমের শুনবেন। যদি আপনি বিজেপির শিবিরে যান বা অর্ণব গোস্বামীর মতন ঝানু হিন্দুত্ববাদী সাংবাদিকের বাচালি শোনেন, অথবা যদি আপনি বলিউডের “দেশপ্রেমিক” মশলা মেশানো সিনেমা দেখেন তাহলে আপনার মনে হবে কাশ্মীরের মানুষ ভারত কে নাকি ভালোবাসেন এবং কাশ্মীর নাকি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, বা কাশ্মীরের মাটিতে সেনাবাহিনী সঠিক কাজই করছে, ইত্যাদী। অথচ, যদি আপনি সেই একই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে দক্ষিণ থেকে উত্তর সমগ্র কাশ্মীর চষে বেড়ান তাহলে শুনবেন একটাই কথা, কাশ্মীর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্যালেস্তাইন বা উত্তর আয়ারল্যান্ড আর ভারতের ভূমিকা এখানে জায়নবাদী ইস্রায়েল বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে কম নয়।

কাশ্মীরের মানুষ আপনাকে শোনাবেন যে তাঁরা চান স্বাধীনতা, নিজেদের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করতে চান তাঁরা। কাশ্মীরের জনগণের কাছে ভারতের ফৌজ এক বিদেশী আগ্রাসী বাহিনী বাদে কিছুই নয় এবং এই ফৌজের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা কে তাঁরা নিজেদের পবিত্র কর্তব্য হিসেবে গণ্য করেন।  তাঁরা অনেকদিন শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচনের পথে অংশগ্রহণ করেছিলেন কারণ বিএসএফ বা রাজপুতানা রাইফেল তাঁদের মাথায় রাইফেল ঠেকিয়ে তাঁদের ভোটদানে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল বলে। যে অল্প কয়েকজন মানুষ স্বেচ্ছায় ভোট দেন, তাঁরা ভোট দেন অনেক সময় জলের কল, রাস্তার পিচ, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিষেবার জন্যে, তাঁরা কাশ্মীরের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার লক্ষ্যে ভোট দেননা।  

ভোটের চেয়ে কার্যকরী কাশ্মীরের জনগণ আন্দোলন ও সংগ্রামের পথ কে মনে করেন আর তাই তাঁরা কাশ্মীরের রাস্তায় আজ অবলীলায় নেমে আসছেন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, এবং নিজেদের মধ্যে ঢুকে থাকা সালাফিবাদী জাকির মুসার মতন বেইমানদের ছুড়ে ফেলছেন কারণ তাঁরা বুঝেছেন যে বিরাট গণ আন্দোলন বা সংগ্রাম ছাড়া ভারতের থেকে তাঁদের স্বাধীন হওয়ার সব রাস্তা বন্ধ। তাঁদের আন্দোলন ইন্টারনেট ব্যান, বিচ্ছিন্ন টেলিফোন ও প্রচার মাধ্যমের কারণে সর্বদা বাইরে আসতে সক্ষম নয়, তাঁদের ছোট ছোট বিজয়গুলোর খবর ভারতের সংগ্রামী জনগণ সবসময়ে জানতে পারেন না, তবুও প্যালেস্তাইনের থেকে দৃঢ় হয়ে আর আয়ারল্যান্ডের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাশ্মীরের মানুষ আজ লড়ছেন।  

আন্তর্জাতিক ভাবে যেহেতু ভারত বিশ্বের উপর প্রভুত্ব কায়েম করা মার্কিন একচেটিয়া ও লগ্নি পুঁজি কে লোভনীয় বাজার, সস্তা কাঁচামালের উৎস, ও সস্তা শ্রমের যোগান দেয়, এবং যেহেতু এখানকার শাসকশ্রেণী বিনা দ্বিধায় পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের সেবা করে তাই ভারতের  শাসক শ্রেণী কাশ্মীরে জঘন্য গণহত্যা করা সত্বেও কাশ্মীরের জনগণের জন্যে রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে কান্নাকাটি হয় না আর ভারত সরকার কে কড়া ভাষায় মার্কিন সরকার ভৎসনা করে না। ফলে আন্তর্জাতিক ভাবে সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনপুষ্ট ভারতের পক্ষে কাশ্মীরের মানুষের থেকে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো কেড়ে নিয়ে তাঁদের উপর নির্মম অত্যাচার চালানো কোন রকম ভাবেই কষ্টকর হয় না আর ভারতের সেনা বাহিনী বরং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ও জায়নবাদী ইসরায়েলের সাথে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্বন্ধ গড়ে তোলে এই অছিলায়।

তবুও কাশ্মীরের জনগণ কে দমিয়ে রাখতে অপারগ হয় ভারতের শাসক শ্রেণী ও তার খুনি বাহিনী। হাজারো মানুষ কে খুন করে, নারীদের ধর্ষণ করে, বাচ্চাদের চোখে ছররা চালিয়ে অন্ধ করেও, বন্দুকের নল থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেও, কাশ্মীরের জনগণ কে এবং তাঁদের চেতনা কে পদদলিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে ভারত সরকার। সারা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ ও বৃহৎ দেশী পুঁজির সাহায্যে ও সমর্থনে বলীয়ান নরেন্দ্র মোদীর সরকার, অর্ণব গোস্বামী, সুধীর চৌধুরী, স্বপন দাসগুপ্ত, বা কাঞ্চন গুপ্তর মতন পেটোয়া সাংবাদিকদের নিরন্তর প্রচার সত্বেও আজ কোন ভাবেই কাশ্মীরের মাটিতে স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারছে না। এমনকি গণহত্যার রক্তের স্রোতে রাস্তা ঘাট ভাসিয়ে দিয়েও তারা কাশ্মীরের জনগণের স্বাধীনতার আকঙ্ক্ষা কে পর্যদুস্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

কাশ্মীরের সমস্যাটা নরেন্দ্র মোদীর শাসনের সমস্যা নয়, কাশ্মীরের সমস্যা আরএসএস এর দ্বারা মিলিটারি কে পরিচালনা করার সমস্যা নয়, বরং কাশ্মীরের সমস্যা হলো জনগণের মুক্তি আন্দোলনের সমস্যা, স্বাধীনতা আন্দোলনের সমস্যা। এই সমস্যার সমাধান ভারতের সরকারে একের বদলে অন্য পার্টি এনে হবে না, এই সমস্যার সমাধান হবে কাশ্মীরের জনগণের ন্যায্য স্বাধীনতার দাবিকে নতমস্তকে মেনে নিয়ে তাঁদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অত্যাচার ও অবিচারের জন্যে ক্ষমা চেয়ে। আর নরেন্দ্র মোদী বা আরএসএস যে বিনা লড়াইয়ে এক সুচাগ্র মেদিনীও দেবে না সেকথা কাশ্মীরের ছোট ছোট বাচ্চারা জানে বলেই তাঁরা পাথর ছুড়ছেন।

ভারত ও তার শাসক শ্রেণী এবং বিদেশী লগ্নিকারী সংস্থাগুলো যে কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবি শান্তিপূর্ণ ভাবে মেনে নেবে, সেই রকমের  অলীক কল্পনা আমাদের করা উচিত নয়। ভারত একটি গায়ের জোরে গঠিত জাতি-রাষ্ট্র, যাকে এক করে রেখেছে সেনাবাহিনীর বজ্র আঁটুনি। বকলমে সামরিক শাসন ও জনগণের মধ্যে সেনা সম্পর্কে গভীর ভীতির সঞ্চার করিয়ে নিজ শাসন কে গণতান্ত্রিক বলে কি ভাবে পরিচালনা করতে হয় তা ভারতের শাসক শ্রেণীর চেয়ে বেশি ভাল কেউ করে দেখাতে পারেনি আর তাই এই শাসনব্যবস্থার পক্ষে কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবি স্বীকার করে নেওয়া মানে হলো নিজ শাসনের গোঁড়ায় কুড়োল মারা। কারণ কাশ্মীর মুক্ত হলে মনিপুর, নাগাল্যান্ড, আসাম তো বটেই, এমনকি দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় রাজ্যগুলিও  দ্রাবিড়নাডুর দাবি তীব্র করবে।

কাশ্মীরের জনগণের স্বাধীনতার একমাত্র পথ হলো গণ সংগ্রাম ও মুক্তির লক্ষ্যে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো কে একত্রিত করে আপোষহীন সংগ্রাম করা। কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে এখন অনেকেই পথে নেমেছেন আর অনেক সংগঠন বিভিন্ন লক্ষ্যে তাঁদের পরিচালনা করছে। আজ কাশ্মীরের জনগণের দরকার একটি আগুয়ান বিপ্লবী কেন্দ্র ও রাজনৈতিক সংগঠন যা তাঁদের কে শুধুই ভারতের সামরিক শাসনের থেকে মুক্ত করার লড়াইয়েরই নেতৃত্ব দেবে না, বরং মুক্ত কাশ্মীরের জনগণের আর্থিক বৈষম্য দূর করতে এবং সামন্ততন্ত্র কে নিঃশেষ করে একটি নয়া গণতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সমাজ গড়ে তোলার লড়াইয়েরও নেতৃত্ব দেবে। যতদিন না এমন একটি সংগঠন, যা একটি বাস্তব ভিত্তিক তত্ব দ্বারা ও একটি ঐক্যবদ্ধ ও দূরদর্শী কেন্দ্র দ্বারা পরিচালিত, কাশ্মীরের জনগণের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে উঠে না আসছে, ততদিন পর্যন্ত কাশ্মীরের উপর থেকে ভারতের শাসকশ্রেণীর শাসনের অবলুপ্তি ঘটানো সম্ভব হয়ে উঠবে না।

কাশ্মীরের মাটি থেকে ভারতের আগ্রাসী বাহিনী কে দূর করে দিতে এই রকমই একটি সংগঠনের আজ ভীষণ বেশি প্রয়োজন হয়ে উঠেছে এবং এই প্রয়োজন কে পূর্ণ করার দ্বায়িত্ব নেওয়ার থেকে, কাশ্মীরের মানুষ কে তাঁদের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে সহযোগিতা করার দ্বায়িত্ব থেকে যদি আজ সমস্ত প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তি নিজ হাত গুটিয়ে নেয় তাহলে, জনগণ কে বশ মানাতে ডাহা ফেল করেও, কাশ্মীরের মাটিতে ভারতের সম্প্রসারণবাদী শাসকশ্রেণী নিজ আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

আসুন কাশ্মীরের পাশে দাঁড়াই ও ভারতের শাসক শ্রেণীর ও তার মিলিটারির দ্বারা কাশ্মীরের জনগণ কে ভীতি প্রদর্শন করে বা অকথ্য অত্যাচার করে নিজ ক্রীতদাসে পরিণত করার চক্রান্ত কে চূর্ণ করতে আমরা সকলে, এক গণতান্ত্রিক - স্বাধীন - প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ কাশ্মীরের জন্যে কাশ্মীরের জনগণের সংগ্রাম কে সঠিক রূপ দান করতে সহযোগিতা করি।  

আমরা দেশদ্রোহী তাই আমরা মানুষ হত্যার চরম বিরোধিতা করি

Indian paramilitary lathicharge on Kashmiri protestors


আমরা দেশদ্রোহী তাই আমরা প্রশ্ন করি। দেশদ্রোহী বলেই তো আমরা তোমাদের সাধের কাশ্মীর নিয়ে ন্যাকা কান্না কাঁদি না বরং হান্দওয়ারা নিয়ে প্রশ্ন তুলি, তোমার রাষ্ট্রীয় সংস্করণে প্রকাশিত গল্পকে খারিজ করে চোখে চোখ রেখে রাজদ্রোহীর মতন প্রশ্ন করি যে কেন একটি কিশোরীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করার দায়ে থানায় আটকে রাখা হবে? কেন তাঁর উপর লালসা চরিতার্থ করতে যে ভারতীয় সেনার বীর পুঙ্গবটি এসেছিল তাকে গ্রেফতার করা হলো না। আমরা কুনান পোশপরা থেকে শাপিয়ানে ধর্ষণ কান্ডে জড়িত ভারতীয় সেনা কে দেশভক্তির দৃষ্টান্ত হিসাবে স্বীকার করি না বলেই আমরা দেশদ্রোহী। আমরা দেশ বিক্রি, নারী ধর্ষণ, গণ হত্যা ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলি বলেই হয়তো আমরা দেশদ্রোহী।

এই দেশের উচ্চ বর্ণের পয়সাওয়ালা লোকেরা পায়ের উপর পা তুলে বলবে ওই বাচ্চা ছেলে মেয়েগুলো দেশের শত্রু, জঙ্গী, ওদের মেরে ফেলায় বা ওই মুসলমান মেয়েদের একটু ধর্ষণ করলে ক্ষতি নেই।  এর মধ্যে দিয়েই ভারতের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে, ভারতের সীমা আরও সুরক্ষিত হবে। আর যদি আমরা প্রশ্ন তুলি যে যখন প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ আমার দেশের সাথে থাকতে চাইছে না, কারণ এই দেশ কোনদিন তাঁদের দেশ ছিল না, ঠিক যেমন বাংলাদেশ কোনো কালেই নেপালের অঙ্গ ছিল না, তাহলে তাঁদের জোর করে ধরে রেখে, খুন ধর্ষণ করে, টিয়ার গ্যাস মেরে কি করে ধরে রাখা যাবে? কোনো দিনই তো কাশ্মীরের জনগণ ভারতের শাসন কে মন থেকে মেনে নিতে পারবেন না। প্রতি পাঁচ বছরে বন্দুকের নলের মুখে তাঁদের ভোট দিতে বাধ্য করিয়ে উপত্যকায় গণতন্ত্র-গণতন্ত্র খেললেই তো সেই মানুষগুলি আর দাসত্বের বন্ধন স্বীকার করবে না। এটা তো একবিংশ শতাব্দী ! ঠিক তখনই আমাদের উপর নিক্ষেপিত হবে বাছা বাছা বিশেষন ও খিস্তির বন্যা। দিল্লি - বোম্বাই হলে গেরুয়া লম্পটের দল জাতীয়তাবাদের পতাকা নিয়ে লাথি মারতে উদ্ধত হবে, কলিকাতার বুকে লকেট-রুপা-দিলীপের নাট্য মন্ডলী ক্ষিপ্ত হয়ে গুঁতা মারতে আসবে, আর সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক ও সর্ব শ্রেষ্ঠ টিভি চ্যানেলগুলি দাঁত খেঁকিয়ে তাড়া করবে। দেশ প্রেম শেখোনি ? ভারত ছেড়ে পাকিস্তান যাও!

তবুও আমরা নির্লজ্জ কান কাটা বেহায়ার মতন কিছু অপ্রিয় কথা জিজ্ঞাসা করে যাব। জানতে চাইবো কেন কাশ্মীরের মহিলারা আজও ওই "শান্তির দূত" ভারতীয় সেনার ঘাঁটির সামনে দিয়ে একলা যেতে, কোথাও বা দল বেঁধে যেতেও ভয় পান? কেন মনিপুরের মহিলারা রাস্তায় নেমে নগ্ন হয়ে ভারতীয় সেনা বাহিনী কে চ্যালেঞ্জ ছোড়েন যে - আয় আমাদেরও ধর্ষণ কর? কেন ছত্তিশগড়ের আদিবাসী নারীদের উপর শুধু দল বেঁধে ধর্ষণই নয় বরং তাঁদের স্তন টিপে দেখা হয় যে তাঁরা নকশাল কিনা ? দেশের তথাকথিত অবিচ্ছেদ্য অঙ্গগুলির অর্ধেকের বেশি যখন আজ হয় সেনা বাহিনীর শাসনের অধীন বা দেশী-বিদেশী কর্পোরেশনগুলির ভাড়াটে বাহিনী হিসেবে কার্যরত পুলিশ - আধা সামরিক বাহিনীর বন্দুকের শাসনে চলছে তখন কোন গণতন্ত্রের কথা আমাদের গৃহমন্ত্রী সহ তাবর মন্ত্রী সান্ত্রী ও তাদের মালিক পুঁজিপতিরা বলে? গণতন্ত্র মানে নির্বিচারে মানুষ হত্যা এবং হত্যাকারীকে সর্বোচ্চ রক্ষা কবচ প্রদান? গণতন্ত্র মানে দেশের সবচেয়ে গরিব ৮৩ কোটি মানুষের উপর যুদ্ধ ঘোষণা করা ? গণতন্ত্র মানে সাম্প্রদায়িক হত্যাকান্ড ঘটিয়ে জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়ে ভোটে জেতা ? গণতন্ত্র মানে আদানি, আম্বানি, বেদান্ত, টাটা, জিন্দল, বিজয় মালয়া, রামদেব, সাক্ষী মহারাজ, যোগী আদিত্যনাথ, সাধ্বী প্রজ্ঞাদের শাসন? সেই গণতন্ত্র নামক বস্তুটিকে মুখ বুজে মেনে নিয়ে বিদেশী পুঁজির জুতো চেটে জীবন নির্বাহ করে "মোদী বাবার জয়" বলে গাধার মতন চেচানো কে দেশপ্রেম বলে না দালালি করা বলে সে কথা কি আজও স্পষ্ট করে বলার দরকার পরে?

এক কালে জহরলাল নেহরু সাহেব কাশ্মীরের জনগণ কে কথা দিয়েছিলেন যে হানাদারদের তাড়িয়ে কাশ্মীরে শান্তি ফিরিয়ে এনে ওখানকার জনগণ কে ভারত সরকার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দেবে এবং রাষ্ট্র সংঘের পর্যবেক্ষণে গণভোটের মাধ্যমে সেই আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ফয়সালা হবে। সংবিধান পাশ করিয়েই নেহরু ও কংগ্রেস চালাকি করে সেই প্রস্তাবকে আস্তাকুঁড়েতে ছুড়ে ফেলে দেয় এবং সেই দিন থেকে কাশ্মীরের মানুষকে নাগা-মিজো-মনিপুরীদের মতন জোর করে ভারতের অধীনে রাখার কাজ শুরু হয়। দাসত্বের বাঁধন ভেঙ্গে স্বাধীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় প্রাণ যায় বহু মানুষের। ভারত আর পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী কাশ্মীরের মানুষকে নিয়ে ভয়ানক জুয়া খেলা শুরু করে। দুই দেশের শাসকশ্রেণী প্রমান করার চেষ্টা চালায় যে কাশ্মীরের স্বার্থ তার সাথে থাকায় ভালো হবে। পাকিস্তান তৈরি করে এক ঝুটো "আজাদ কাশ্মীর", আর ভারতের শাসকশ্রেণী তো আজাদী শব্দটিকেও সহ্য করতে পারে না। তারা আরও নির্লজ্জ হয়ে ঘোষণা করে যে কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং তাই মিলিটারী নামিয়ে সমস্ত রকমের আন্দোলন সংগ্রাম কে দমন করতে ভারতের শাসকশ্রেণী কুন্ঠা বোধ করে না।

কিন্তু দেশপ্রেমী নই বলেই হয়তো আমরা প্রশ্ন করি যে আর কতদিন দেশপ্রেমের নামে কাশ্মীরের ছেলেমেয়েদের রক্তে লাল হবে উপত্যকার রাস্তা? আমরা জানতে চাই কেন কাশ্মীরের মানুষকে আমাদের নামে হত্যা করা হচ্ছে যখন এই দেশের অধিকাংশ মানুষ, খেটে খাওয়া শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনগণ এই হত্যা, গুম, ধর্ষণের বিরুদ্ধে? যে ঝাড়খন্ড-উড়িষ্যা-ছত্তিশগড়ের আদিবাসীদের আজ বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলির স্বার্থে ভারতের সরকার খুন করছে, জমি-জঙ্গল-জল থেকে বেদখল করছে সেই মানুষগুলির নামে কেন কাশ্মীরের মানুষের উপর অকথ্য অত্যাচার চালানো হচ্ছে? 

আমরা দেশপ্রেমী নই বলেই হয়তো আমরা দাবি তোলার হিম্মত দেখাই যে আমাদের নামে কাশ্মীরে হত্যা ধর্ষণ চালাতে আর দেব না। আমাদের নামে কুনান পোশপরা চালাতে দেব না। আমরা আমাদের নামে নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরতে দেব না। এটাই যদি রাজদ্রোহ হয় তাহলে আমাদের সকলেরই, আমরা যাঁরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করি, আমরা যাঁরা মানব অধিকারে বিশ্বাস করি, আমরা যাঁরা ওদের কালা আইন মানতে চাই না - সেই সকলেরই রাজদ্রোহী হয়ে গর্বিত বোধ করা উচিত। কারণ আমরা সকলেই তো দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের স্বার্থের সাথে সঙ্গতি রেখে ওই ১০ শতাংশ ক্লীব ও মেরুদন্ডহীন দালালদের থেকে নিজেদের আলাদা করে নেওয়ার সাহস দেখিয়েছি। 

আমরা গর্বিত রাজদ্রোহী হয়ে, আমরা গর্বিত তোমার দেশ বিরোধী হয়ে, কারণ তোমার দেশ আমার দেশ নয় আর আমার দেশ তোমার দেশ নয়। তাই ১০ শতাংশ ওই আমাদের দেশবিরোধী কর্পোরেট তাঁবেদারদের দেশছাড়া করতে সকল গণতন্ত্র প্রেমী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান করি। মনে রাখবেন আমরা সত্যের পক্ষে - তাই জয় আমাদের হবেই। ওদের লাঠি-গুলি-বেয়নেট যত বেশি চলবে বুঝতে হবে ওরা তত বেশি ভয় পেয়েছে। যত বেশি কিশোরকে ওই কাশ্মীরে সেনা বাহিনী হত্যা করবে পাথর ছোড়ার জন্যে বা লোড শেডিং এর বিরোধিতা করার জন্যে তত বেশি বুঝতে হবে যে ওরা ভয় পেয়েছে। যত বেশি বস্তার থেকে লাতেহার, নাগাল্যান্ড থেকে মনিপুরে ওরা মানুষ মারতে সেনা পাঠাবে তত বেশি বুঝতে হবে যে রাজা আজ ভয় পেয়েছে। ওষুধে মানুষ বশ থাকবে না রাজা, জনতা শীঘ্রই দেবে ডাক - দড়ি ধরে মারো টান - রাজা হবে খান খান।
  

কানহাইয়া কুমারের শর্তসাপেক্ষ জামিন আগামী দিনে শাসক শ্রেণীর ভয়ানক ষড়যন্ত্রের একটি আভাস মাত্র

অনেকেই খুশি, বিপ্লবী বামপন্থী থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের তুলসীবাটা খেয়ে যারা সকালের শৌচ কর্ম করেন, আনন্দবাজার থেকে গণশক্তি, রাহুল গান্ধী থেকে অরবিন্দ কেজরিবাল, সবাই খুশি কারণ কানহাইয়া কুমার শেষ পর্যন্ত ৬ মাসের জন্যে অন্তর্বতীকালীন জামিন পেয়েছেন। জেএনইউ এর ছাত্র-ছাত্রীরা খুশি কারণ তাঁদের ছাত্র ইউনিয়নের অধ্যক্ষ ফিরে এসেছেন এবং ফিরে এসে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিচ্ছেন, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন বিজেপির ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে।ইংরাজি কিছু সংবাদপত্রের উদারনৈতিক সাংবাদিকরা খুশি কারণ তাঁদের উদ্যোগ ও আরএসএস এর বিরুদ্ধে তাঁদের লেখালিখির ফলে একটা সামগ্রিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল যার পরিনাম এই জামিনের আদেশে তাঁরা দেখছেন। মোটামুটি ভাবে বলতে গেলে উমর খালিদ ও অনির্বান ভট্টাচার্য জেলের ভিতর থাকলেও গোটা দেশ জুড়ে একটা খুশির হাওয়া উঠেছে গরিব মানুষের মাঝে কানহাইয়া কুমারের জামিনে বাইরে আসার খবর শুনে।

টিভি ও কর্পোরেট মিডিয়ার দৌলতে কানহাইয়া কুমার আজ রীতিমত একজন জঙ্গী বামপন্থী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তাঁর দেওয়া ভাষণ রীতিমত বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে আবল-বৃদ্ধ-বনিতার বুকে। গরিব মানুষের সন্তান, শোষিত জাতির সন্তান, কানহাইয়া কুমারের নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর চ্যালা চামুন্ডাদের বিরুদ্ধে গর্জন আজ শোষিত বঞ্চিত মানুষের বুকে আশা জাগাচ্ছে, প্রাক্তন পুলিশ কর্তা সঞ্জীব ভট্ট থেকে শুরু করে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিবাল, বিখ্যাত লেখিকা শোভা দে থেকে সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাই, সবাই একজন তরুণ তুর্কি বাম ছাত্র নেতার জ্বালাময়ী বক্তৃতায় অভিভূত। জেলে যাওয়ার আগে যে আজাদীর স্লোগান কানহাইয়া কুমার দিয়েছিলেন - সামন্তবাদ, মনুবাদ, পুঁজিবাদ,সংঘবাদ থেকে ক্ষুধার থেকে আজাদীর যে স্লোগান তিনি দিয়েছিলেন, তা আজ সারা দেশে এক ভয়াবহ দাবানল হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক হিসাব করেও বলতে পারছি না যে ১৯৬৪ সালে পার্টি ভাঙ্গার পরে ডাঙ্গেপন্থী সিপিআই এর থেকে এরকম কোন জন নেতার জন্ম হয়েছিল কি না। এক কালে ডাঙ্গেপন্থী সিপিআই এর ভাঁড়ারে ছিলেন হীরেন মুখুজ্যে, ইন্দ্রজিত গুপ্ত, সোমনাথ লাহিড়ির মতন সুবক্তারা। অথচ আভিজাত্য ও তাত্বিক পান্ডিত্যে ভরা এই সব রাঘব বোয়াল শোধনবাদীদের কানহাইয়া কুমারের মতন মাস আপিল ছিল না।  একমাত্র ব্যতিক্রম হলেন জ্যোতি বোস, কিন্তু তিনিও কোনো দিন আভিজাত্যের দালান থেকে নেমে সাধারণ মানুষের নেতা হওয়ার ক্ষমতা দেখাতে পারেননি। কিন্তু কানহাইয়া কুমার পারলেন, এবং পারলেন ২০১৬ সালে প্রতিক্রিয়ার স্রোতের মধ্যেই। 

কানহাইয়ার সংগ্রাম, স্লোগান ও সংঘের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কে বিপ্লবী অভিন্দন জানানো যায়, লড়াইয়ের প্রতি কদমে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শক্তির পাশে থাকা যায়, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে খুশি হওয়ার, আত্মসন্তুষ্টির নেশায় বুঁদ হওয়ার কোন কারণ দেখি না

তবে কি কানহাইয়া কুমারের জামিন হওয়ায় ফ্যাসিবাদ বিরোধী বাম শক্তিগুলির উল্লাসিত হওয়ার কিছু নেই?

না, সত্যিই কিছু নেই। কানহাইয়া কুমারের উপর থেকে ছাত্র আন্দোলনের চাপে মোকদ্দমা উঠিয়ে নেয়নি ভারতের শাসক শ্রেণী, শুধু পরিস্থিতির চাপে কানহাইয়া কুমার কে জামিন দেওয়া হয়েছে আগামী ছয় মাসের জন্যে

শাসক শ্রেণীর কারাদণ্ড বা ফাঁসির সাজা থেকে বাঁচতে জামিন নেওয়া এক ধরনের মুচলেকা দেওয়ার চেয়ে বেশি কিছু নয়। কারণ এই জামিনের শর্তগুলো শাসক শ্রেণী ও তাদের তাঁবেদার আরএসএস এর তরফ থেকে চাপিয়ে দেওয়া এমন কিছু শর্ত যা বাম আন্দোলনের নয় বরং সামন্ত প্রভু, দালাল পুঁজিপতি ও  বিদেশী বৃহৎ একচেটিয়া পুঁজির সেবা করে । 

কি বলছে কানহাইয়া কুমারের জামিনের আদেশ?

আদালত আদেশ দিয়েছে যে কানহাইয়া কুমার যেন জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের অধ্যক্ষ পদের ক্ষমতাবলে যেন তেন প্রকারে জেএনইউ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে "দেশ বিরোধী" কার্যকলাপ বন্ধ করতে সচেষ্ট হন, এবং আদালত মনে করে যে "আজাদী" চেয়ে কানহাইয়া কুমার ও তাঁর সঙ্গীদের দেওয়া স্লোগান আদতে "দেশ বিরোধী"। শুধু এইটুকুই নয়, আদালত বিজেপি - আরএসএস এর সুরে সুর মিলিয়ে কানহাইয়া কুমার ও সমগ্র বাম ছাত্রদের এই বলে তিরস্কার করে যে এই ছাত্ররা সেনা বাহিনীর ভূমিকা কে "শ্রদ্ধা" করে না এবং সেনাবাহিনী না থাকলে নাকি ভারতে গণতন্ত্র নামক বস্তুটি থাকতো না। আদালত চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে যে সেনা বাহিনী যে কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করে সেই পরিস্থিতিতে বামপন্থী ছাত্ররা কাজ করতে পারবেন না

এই রায়কে আর যাই করা যাক না কেন, কোনও ভাবেই স্বাগত জানানো যায় না। তবুও বিধির বামের তিন ভাগ, এক ভাগ নিরামিষাশী প্রভু ভক্ত গৃহ পালিত প্রাণী, এক ভাগ ছন্ন ছাড়া ঘর আর জঙ্গলের মধ্যে বিচরণ করা প্রাণী, আর এক দল জঙ্গলে থেকে শিকার করে পেট চালানো প্রাণী, এই তিন দলের মতের মিল তো হতে পারে না, কারণ জঙ্গলের বাঘ আর গোয়ালের গরু কখনও একই পাতে একই পদ খেতে পারে না, গরু ঘাস খায় আর বাঘ খায় শিকার করা টাটকা মাংস। 

তাই দেখা গেল যে কানহাইয়া কুমারের জামিন হতেই সাথে সাথে এক শ্রেণীর নব্য ও অভিজাত বামেরা জামিনের আদেশ কে নিজেদের বিজয় ও ফ্যাসিবাদের পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত করে আনন্দ উৎসব শুরু করে দেন। কানহাইয়া কুমার জেএনইউ ক্যাম্পাসে ফিরে এক আগুনের ফুলকি ঝরানো কিন্তু গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ বক্তৃতা দিলেন। এই ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদীয় বাম রাজনীতিতে কানহাইয়া কুমার কে বামেদের ভবিষ্যত ও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে পেশ করা হলো। 

কিন্তু এতসবের মাঝে চাপা পড়ে গেল জামিনের শর্তগুলির উপর আলোচনা, জামিন নেওয়ার স্বীদ্ধান্তের যৌক্তিকতা। আদালতের কাজ হলো প্রমাণ ও তথ্য পরীক্ষা করে যে কোনো মামলার উপর বর্তমানে লাগু আইনের সীমার মধ্যে থেকে রায় দেওয়া।ভালো হতো যদি মহামান্য দিল্লি হাই কোর্ট এই পরিধির মধ্যে থেকে রায় দিতেন।কিন্তু আদালত আইনের গন্ডির বাইরে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা কি রাজনীতি করবেন, কোন নীতিতে বিশ্বাস করবেন, কোন নীতির বিরোধিতা করবেন, সেনা বাহিনী আর দেশ রক্ষার কথা বলে কি ইঙ্গিত দিলেন ? আমরা জানতে পারলাম যে শাসক বদলালেও শাসন বদলায় না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বানিয়ে যাওয়া উনবিংশ শতাব্দীর প্রতিক্রিয়াশীল আইনের ভিত্তিতে এক বিংশ শতাব্দীর জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা কে দাবিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ভারতের শাসক শ্রেণীর চরম প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রেরই পরিচয় আরও একবার দিল। 

যে দেশের মানুষের করের পয়সায়, আয়করের চেয়ে বেশি পরোক্ষ করের পয়সায় পোষা পুলিশ-সান্ত্রী-ফৌজ সেই দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উপর আক্রমণ করে তখন কি জনগণের সেই বাহিনীগুলোকে প্রশ্ন করার অধিকার থাকে না ? যখন ধরুন জনতার করের টাকায় চলা আদালতের রায় শাসক শ্রেণীর পক্ষ বার বার গ্রহণ করে তখন তাঁদের টাকায় চলা আদালতের রায়ের সমালোচনা করার অধিকার সাধারণ গরিব মানুষের থাকবে না কেন ?

এই প্রশ্নগুলো তোলাও শাসক শ্রেণীর কাছে দেশদ্রোহের সমান এবং এই সব প্রশ্ন এই শাসক শ্রেণীর শাসন করার পবিত্র অধিকারকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। তাই তো সামন্তপ্রভু, দালাল পুঁজিপতি ও বিদেশী একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থে কাজ করা রাষ্ট্র যন্ত্রের কাছে প্রশ্ন তোলা, রাষ্ট্র যন্ত্রের মৌলিক চরিত্রের প্রশ্ন করা এক গর্হিত অপরাধ। 

আজ আদালত, সামগ্রিক রাষ্ট্র যন্ত্র এবং ভারতের শাসক শ্রেণী বামপন্থীদের উপদেশ দিচ্ছে সেনা বাহিনী কে সম্মান করার জন্যে, সেনা বাহিনীর উপাসনা করার জন্যে এবং মোটের উপর রাষ্ট্র যন্ত্রকে প্রশ্ন না করতে। বলা হচ্ছে যে ভারতের সেনাবাহিনী খুব কষ্ট করে শীত-তাপ সয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করে দেশ কে রক্ষা করছে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের দেশের উচ্চ জাতির বাচ্চাদের এই কথাটা বারবার করে শিখিয়ে সামরিক বাহিনীর প্রতি জোর করে আনুগত্য সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চালানো হয়।আমাদের শেখানো হয় যে সেনাবাহিনী না থাকলে আমরা বাঁচতাম না এবং আমাদের দেশে আমাদের কোনও অধিকার থাকতো না। এটাই তো যুক্তি? 

কেন আমাদের দেশের সেনাবাহিনী কে কষ্ট করে সীমান্ত ও দেশ রক্ষা করতে হয় ? কারণ দেওয়া হয় প্রতিবেশী দেশের ভারতের উপর কু দৃষ্টি। প্রশ্ন হলো প্রতিবেশী দেশ কেন ভারতের উপর কু দৃষ্টি রেখেছে ? কেন প্রতিবেশী দেশগুলি তৈরি করা হয়েছিল ভারত ভেঙ্গে ? যে দেশের শাসক শ্রেণী ও তাদের তাঁবেদাররা কথায় কথায় গান্ধীর অহিংসা ও সহনশীলতার ভাষণ দেয় তাদের হঠাৎ সেনা বাহিনী ও বন্দুক কেন দরকার হলো ?

যখন প্রশ্ন করা হয় বামপন্থীদের, বিশেষ করে বিপ্লবী বামেদের দেশপ্রেম নিয়ে, যখন বারবার উদাহরন দেওয়া হয় সেনাবাহিনীর আর আধা সামরিক বাহিনীর, তখন ইচ্ছে করে জানতে যে ভারতের সেনা বাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনী কি কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যেখানে মানুষ নিস্বার্থে দেশের সেবায় প্রাণ নিয়োজিত করছেন ? সেনা বাহিনীর জওয়ানদের যদি বেতন না দেওয়া হয় - সস্তা রেশন, অবসরের পরের সুযোগ সুবিধা, বাচ্চাদের জন্যে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা, চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা, যাতায়তের সুযোগ সুবিধা, কোয়ার্টার, বিদ্যুত, জল, ইত্যাদী যদি না দেওয়া হয় তাহলে কত জন প্রতিকুল পরিস্থিতে মরতে যেতে রাজি হবেন ? ওই আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার একট এর মতন অবাধে খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অধিকার না থাকলে কি এই দেশের সেনা বাহিনী কোনো জায়গায় মানুষের উপর শাসন করতে পারবে ? যে হিন্দুত্ববাদী আরএসএস ও বিজেপি আজ দেশপ্রেমের ঠিকাদারী করছে তাদের কত জন দেশের মানুষের স্বার্থে নিঃশর্তে মরতে রাজি হবে ?

এই সেনা বাহিনীর নামে যারা শপথ খেয়ে নিজেদের দেশপ্রেম প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, তাঁদের প্রশ্ন করি, কেন এই দেশের মানুষ আজও সেনা ও আধা সামরিক বাহিনী কে নিজেদের ফৌজ না ভেবে শুধুই সরকারি বাহিনী হিসেবে দেখেন ? কেন সাধারণ মানুষ ট্রেনের সেনা কামরায় চড়তে ভয় পান ? সেনাবাহিনীর প্রতি সম্মান থেকে না মার খাওয়া থেকে বাঁচতে ?

সংসদীয় বামেরা হয়তো দেশের সেনা ও আধা সামরিক বাহিনীর শ্রেণী বিশ্লেষণ করেন না তাঁদের আইনি ব্যবস্থায় টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হিসেবে। কিন্তু সেনা ও আধা সেনা বাহিনীর শ্রেণী বিশ্লেষণ ভালো করেই নিজেদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে করে ফেলেছেন কাশ্মীরের জনগণ, আসামের জনগণ, মনিপুরের জনগণ, মিজোরামের জনগণ, নাগাল্যান্ডের জনগণ, ঝাড়খন্ডের জনগণ, ছত্তিসগঢ়ের জনগণ, অন্ধ্র ও তেলেঙ্গানার জনগণ; শ্রেণী বিশ্লেষণ ভালো ভাবেই করেছেন দমদমের সেই ধর্ষিতা নাবালিকা যিনি ট্রেনে সামরিক কামরায় সেনা বাহিনীর কাকুদের ভরসা করে চেপে গণ ধর্ষিতা হয়েছিলেন, ভালো করেই বুঝেছিলেন ট্রাফিক সার্জেন্ট বাপি দাস, যিনি সেনা জওয়ানদের রাস্তায় চলা মহিলাদের উত্যক্ত করার বিরোধিতা করায় খুন হয়েছিলেন।  আজ দেশের মানুষের, গরিব মানুষের, শ্রমিক - কৃষক - খেটে খাওয়া মানুষের, জঙ্গলের অধিকার রক্ষার লড়াইতে সামিল আদিবাসী জনগণের সেনা প্রীতি অনেক কমে গেছে। নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির দৌড়ে যখন দেশের সরকারি চাকরি ও সরকারি শিল্পের পরিধি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে ঠিক সেই সময় দেশী - বিদেশী পুঁজির লুটের বিরুদ্ধে বেড়ে চলা জনগণের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ দমন করার স্বার্থে একমাত্র সরকারি বাহিনীগুলোই টিকে থাকবে আর তাই রাষ্ট্রের মালিক সামন্তপ্রভু, দালাল পুঁজিপতি, ও বিদেশী একচেটিয়া লগ্নি পুঁজি তাদের বাহিনীর প্রতি জনগণের আনুগত্য সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাবে।

কিন্তু শ্রেণী বিভক্ত সমাজে সংখ্যালঘু শাসক শ্রেণী কোনও ভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত মানুষের আনুগত্য বন্দুকের নলের দ্বারা আদায় করতে পারে না। কারণ স্বাভাবিক ধর্ম হিসেবেই শোষিত মানুষ পদে পদে শোষণ - বঞ্চনা - অত্যাচারের বিরোধিতা করে আসে।একটা সময়ে সামরিক শক্তি দিয়ে সেই প্রবাহমান বিদ্রোহী ধারাকে রোখা যায় না এবং ইতিহাস পদে পদে তা প্রমাণ করেছে।

কানহাইয়া কুমারের জামিনের রায় ব্রাক্ষণত্ববাদী শাসক শ্রেণীর চিনির বুলেট।কানহাইয়া কুমার কে ছাত্র আন্দোলনের চাপে শাসক শ্রেণী নিঃশর্ত মুক্তি দেয়নি, শর্তসাপেক্ষ জামিন দিয়েছে এবং শর্তগুলি শাসক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে। সংসদীয় পথের পথিক সরকারি বামেদের কাছে এই জামিন, যা আসলে শাসক শ্রেণীর কাছে মুচলেকা দেওয়া ছাড়া বেশি কিছু নয়, হয়তো বিজয়ের দলিল হতে পারে কিন্তু সংগ্রামী বিপ্লবী বামেদের কাছে এই জামিন আগামী দিনের কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের হদিস দিচ্ছে। উমর খালিদ ও অনির্বান ভট্টাচার্য আজও শাসক শ্রেণীর কারার অন্তরালে। কানহাইয়া কুমারের মতন উমর ও অনির্বান এত চটজলদি সংবিধান ও শাসন ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন দেখিয়ে নিজেদের বাঁচাবার চেষ্টা করবেন বলে মনে হয় না। তাঁদের কে বিধে দিতেই শাসক শ্রেণী সরকারি নিরামিষাশী বামেদের নিজের হাতে রাখতে কানহাইয়া কুমার কে জামিনে মুক্ত করেছে।

জনগণের মুক্তি, দেশের স্বাধীনতার সম্পর্কে বলার জন্যে আজ উমর খালিদ, অনির্বান ভট্টাচার্য, প্রফেসর এস এ আর গিলানি ও প্রফেসর ডক্টর জি এন সাই বাবার উপর ফাঁস কষছে শাসক শ্রেণী। ভারতের শাসক শ্রেণী ও তাদের মুখপত্র আরএসএস ও বিজেপি ভালো করেই জানে উমর খালিদ, অনির্বান ভট্টাচার্য, প্রফেসর গিলানি বা ডক্টর সাইবাবা কোনো ভাবেই শাসকের সুরে সুর মিলিয়ে জি হুজুর বলবেন না। তাঁরা প্রতিবাদ করবেন রাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, তাঁরা আদালতের মঞ্চকে ব্যবহার করবেন সাধারণ মানুষের স্বার্থে রাজনৈতিক প্রচার চালানোর জন্যে, এবং যে শাসক শ্রেণী একদিন এই ভাবেই মাস্টারদা সূর্য সেন থেকে ভগৎ সিং কে ফাঁসি কাঠে ঝুলিয়েছিল তারা চেষ্টা চালাবে বিচারের নামে প্রহসন চালিয়ে এই বিরোধী স্বরগুলি কে রুদ্ধ করতে।

যে দেশ আজ জেলখানায় পরিণত হয়েছে সেই দেশে জেলের ভিতরে বা বাইরে থাকার মধ্যে বিশেষ কোনো ফারাক নেই।  আজ দেশের সামনে এক কঠিন পরিস্থিতি এসে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রদায়িক ব্রাক্ষণত্ববাদী ফ্যাসিস্ট আরএসএস ও বিজেপির শ্রমিক-কৃষক বিরোধী যুদ্ধ, যা মূলত শুরু হয়েছে জেএনইউ এর ক্যাম্পাসের বামপন্থী ছাত্রদের উপর আক্রমণ করে, তা কোনও ভাবেই হালকা করে দেখলে চলবে না। জেএনইউ কান্ডের ফাঁকে বিজেপি সরকার ও ভারতের শাসক শ্রেণী দেশের কয়লা, সোনা ও লাইম স্টোন খননের অবাধ অধিকার দেশী ও বিদেশী পুঁজিতে চালিত কর্পোরেশনগুলির হাতে তুলে দিয়েছে। হরিয়ানাতে শ্রমিক সংগ্রামের উপর হিংস্র দমন পীড়ন নেমে আসছে, আদিবাসীদের অধিকারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ লড়াইয়ে সামিল সোনি সোরির উপর ঘৃণ্য হামলা হলো; ছত্তিসগঢ়, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড, ইত্যাদী জায়গায় আদিবাসী প্রতিরোধ ভাঙ্গতে রোজ জোর কদমে সামরিক অভিযান চলছে। এই পরিস্থিতির থেকে মুক্তি পেতে আমাদের অবশ্যই শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষ-ছাত্র-যুব-নারী-আদিবাসী-দলিত-সংখ্যালঘুদের সংগ্রামকে আজ ফ্যাসিবাদ বিরোধী মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। কানহাইয়া কুমারের মতন ব্যক্তিরা পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা নির্বাচনে সিপিআই ও সিপিএমের পক্ষ থেকে হয়তো প্রচার করতে পারেন, কিন্তু দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদ বিরোধী বিপ্লবী সংগ্রামে সামিল হতে পারবেন না। নেতৃত্ব তো দুরের কথা।

কানহাইয়া কুমারের স্লোগানের প্রতি সমর্থন জানাই, কিন্তু আজ বিশেষ দরকার হলো এই আজাদীর স্লোগান কে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া, ক্যাম্পাসের বাইরে ওই খেটে খাওয়া শ্রমিক-কৃষকদের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং তাঁদের সাথে নিয়ে দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রাম কে বিজয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া - এটাই আজ দেশের সমস্ত বামপন্থী - প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তির প্রধান ও পবিত্র কর্তব্য হওয়া উচিত।  জামিন নয়, দেশ জুড়ে যে জেলখানা গড়ে সমগ্র খেটে খাওয়া মানুষকে বন্দী বানাবার প্রচেষ্টা চলছে, সেই প্রচেষ্টাকে আসুন আমরা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিই।       

শুধু বুদ্ধিজীবিদের নয় চাই সামগ্রিক ভাবে খেটে খাওয়া মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ - প্রতিরোধ সংগ্রাম

বিজেপি সরকারের ভাগ করো - শাসন করো নীতির বিরোধিতায় আজ গলা মিলিয়েছেন দেশের সাহ্যিতিক, চলচ্চিত্র শিল্পী ও নির্দেশকরা, বিজ্ঞানীরা, এবং সর্বপরি দেশের সেই শিল্পপতিদের একটি ক্ষুদ্র অংশ যাদের জুতো চেটে তোয়াজ করা এই নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতিতে সরকারের প্রধান কর্মকান্ড। এই ক্রমাগত বিরোধিতা বুদ্ধিজীবি মহল কে অনেক বছর পর রাজনৈতিক ভাবে একটু সতেজ করে তুলেছে, তাঁরা সম্মিলিত ভাবে ভয় কাটিয়ে আসতে আসতে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার সাহস পাচ্ছেন। নিছক গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগে যেদিন দাদরির এক সাধারণ মুসলমান মানুষকে বেঘোরে প্রাণ হারাতে হয়েছিল সংঘ পরিবারের গৌ বাহিনীর হাতে, সেদিন হতভাগ্য মোহাম্মদ আখলাক ভাবতেও পারেননি যে এই দেশে তাঁর মৃত্যু কি ভীষন আলোড়ন তৈরি করবে। বুদ্ধিজীবি, লেখক, নির্দেশক, বিজ্ঞানীদের সাথে যুক্ত হয়েছে উচ্চ শিক্ষায় গবেষণার খাতে নন নেট ছাত্র -ছাত্রীদের স্বার্থে ইউজিসির প্রদত্ত বৃত্তি বন্ধ করার স্বিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশ জোড়া ছাত্র সংগ্রাম। ১৩৯ দিন ধরে সংগ্রাম চালিয়ে এফটিআইআই এর ছাত্ররা ধর্মঘট তুলে নিয়েও জারি রাখলেন গজেন্দ্র চৌহানের বিরুদ্ধে আন্দোলন। অন্যদিকে বিহারের নির্বাচনে লেজে গোবরে অবস্থা হওয়া সত্বেও টাকা দিয়ে ভোট কিনে ও অন্যান্য দলের কর্মীদের ঘুষ দিয়ে ভোটে জেতার প্রচেষ্টা করেও আজ মোদী ও অমিত শাহের বিজেপি নিশ্চিত হতে পারছে না, তাই অমিত শাহ কে ঘোষণা করতে হচ্ছে যে বিজেপির হার মানে পাকিস্তানের বিজয় (প্রকারন্তরে দেশের মুসলমানরা পাকিস্তানি) এই ঘৃণ্য তত্ব।

এত দেশ জোড়া বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের মধ্যে হঠাত আরএসএস এর আদেশে বিজেপির একমাত্র শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবি সাজা অরুণ জেটলি লিখলেন যে দেশে অসহিংসুতা নেই, বরং বাম ও উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবিরা নাকি চিরকাল অসহিংসু, তাঁরা নাকি চিরকাল মোদী কে ঘৃণা করে এসেছেন এবং তাঁরা মোদী বাবুকে আর প্রধানমন্ত্রীর পদে দেখতে চাইছেন না , এর ফলে নাকি মোদী বাবু নিজেই অসহিংসুতার শিকার।  প্রথমবার জীবনে শুনতে হলো যে এক দেশের প্রধানমন্ত্রী নাকি নিজেই আক্রান্ত।  অরুণ জেটলির লেখায় যুক্তির চেয়ে বেশি ছিল কলমের খোঁচা মেরে চোখ থেকে জল ঝরিয়ে - ওই খুকি কাঁদছে বলে হাত তালি দেওয়ার ন্যাকামির প্রয়াস। গল্পের গরুকে শুধু গাছে তোলেননি জেটলি, গাছে তুলে মইটা তুলে ছুট লাগিয়েছেন। আপামর জনগণ কে বোকা বানাবার স্বার্থে যদিও অরুণবাবুকে একটু ভালো গল্প লিখতে শিখতে হবে। হয়তো বা দুর্দিনে তাঁর সমর্থন পাওয়ায় খুশি হয়ে আরএসএস এই কাজটি চেতন ভগত কে সঁপে দিতে পারে আর আমরা পাব এক  ইংলিশ এ লেখা নতুন উপন্যাস - দেড়খানা  প্রধানমন্ত্রী।

অরুণ বাবু দু:খ করে লিখেছেন যে বাম ও গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবিরা বড়ই অসহিংসু, তাঁরা বিরোধী মতকে (পড়ুন গেরুয়া ফ্যাসিস্ট)সমর্থন তো করেনই না, সেই মতামতকে নিজ গুণে বাড়তেও দেন না।  জেটলির আক্ষেপ বামদের মৌরসী পাট্টায় যে সকল প্রতিষ্ঠান আছে সেখানে তাঁরা কোনও ভাবেই বিরোধীদের (পড়ুন সাম্প্রদায়িক ব্রাহ্মণ্যবাদী ফ্যাসিস্টদের) টিকে থাকতে দিতে চান না, তাঁরা বহুত্ববাদ কে ঘৃণা করেন বলেই তো বেচারা এবিভিপি জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, ও অন্যান্য নামী প্রতিষ্ঠানের ছাত্র - ছাত্রীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে অপারগ।  সেই জায়গায় বেচারা গৌ সেবকরা দুটো তিনটে বজ্জাত গরু খেঁকো কে মেরেছে তার জন্যে বেচারা প্রধানমন্ত্রী কে নিয়ে টানাটানি!

সমস্যাটা হচ্ছে অরুণ বাবু এবং তাঁর নাগপুরে বসা প্রভুরা এটা মেনে নিতে এখনো কষ্ট পায় যে শত চেষ্টা করেও গেরুয়া শিবিরে কিছু বাজারী অভিনেতা - অভিনেত্রী, পুরানো দিনের গাইয়ে - বাজিয়েরা ছাড়া বিশেষ করে বুদ্ধিজীবিরা ঘেঁষে না, রাম মন্দির আর রাম রাজত্ব থুড়ি ব্রাহ্মণ্যবাদী ফ্যাসিস্ট শাসনের পক্ষে এমনকি বহু দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবিরাও নাক সিঁটকে থাকেন।  এ ছাড়া দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ছাত্র - ছাত্রীরা চিরকালই এবিভিপি কে 'ছোট লোকের' পর্যায়ে গণ্য করে এবং একমাত্র তাদের শাসনাধীন রাজ্য ছাড়া কোথাও গেরুয়া শিবিরে ছাত্র-ছাত্রীরা বা এমনকি সুযোগ সন্ধানিরাও বেশি ঘেঁষে না। কিন্তু বর্তমানে কর্পোরেট পুঁজির সেবা দাস বিজেপির দরকার দেশের যুব ছাত্রদের উপর ব্যাপক প্রভাব, যাতে তারা উচ্চ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত উঁচু জাতের হিন্দুদের নিজেদের পক্ষে টেনে রাখতে পারে এবং তাঁদের দিয়ে কর্পোরেট পুঁজির লোভ লালসা চরিতার্থ করার প্রয়াসকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু উঁচু জাতির হিন্দু ছাত্র যুব সমাজে ওই উত্তর প্রদেশ - গুজরাট - মধ্য প্রদেশ - রাজস্থান - হরিয়ানা ও দিল্লির গো বলয় বাদ দিয়ে দিলে আর কোথাও এবিভিপির কোনও প্রতিপত্তি নাই।  এই দুঃখে কাতর জেটলির কাছে প্রলাপ বকা ছাড়া আর কি করনীয় ?

ভারতবর্ষের ইতিহাসে ব্রাহ্মণ্যবাদকে চিরকালই শাসক শ্রেণী ভীষন ভাবে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে। হিন্দু শাসকদের আমলে আজকের ভারত ছিল না, এবং নানা রাজত্বে বিভক্ত ভারতের নানা জাতির হিন্দুদের নানা ধরণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র চিরকালই ভারতের এক অন্যন্য আকর্ষন ছিল। মুঘল বা তার আগের দিল্লির মুসলমান বাদশাহীর যুগেও মুসলমান শাসকরা ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা তো করেননি বরং নিজ শাসন ও শোষনের স্বার্থে তাকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন চিরকাল।  ইংরেজদের ভারতে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন কালে ধূর্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পথিকৃতগণ ব্রাহ্মণ্যবাদ কে চরম ভাবে তোয়াজ করে চলেছিল।ভারতবর্ষই সেই সময়ে একমাত্র দেশ ছিল যেখানে জাতি বৈষম্য শুধুমাত্র হিন্দুদের মধ্যেই নয় বরং মুসলমানদেরও ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করে। এই দেশের যে সব নিচু জাতির শোষিত মানুষ ব্রাহ্মণ্যবাদকে পরাস্ত করতে মুসলমান বা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলেন তাঁরাও অচিরেই বুঝেছিলেন যে জাতির শাসন এই দেশে কোনও ধর্মেই শেষ হবে না বরং নতুন রূপে আবির্ভূত হবে।

বর্তমানে বর্ণ শ্রমের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা আরএসএস এর কাছে ভীষন প্রয়োজন কারণ একমাত্র এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই দেশব্যাপী সামন্তবাদ বিরোধী, কর্পোরেট পুঁজির শোষণ বিরোধী সংগ্রাম কে কন্ঠরুদ্ধ করে মারা সম্ভব হবে। মানুষকে মালিকের দাস বানিয়ে নির্বিবাদে গাধার মতন খাটিয়ে মারার ব্রাহ্মণ্যবাদের চেয়ে বেশি কার্যকরী নীতি আর কি বা হতে পারে ? বিনা মূল্যে শ্রম দেওয়ার যে রীতি আজও বিহার - উত্তর প্রদেশ - হরিয়ানা ও মধ্য প্রদেশের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে টিকে আছে তাকে আজ এক সর্ব ভারতীয় রূপ দিয়ে সামন্তবাদ ও বিদেশী এক চেটিয়া পুঁজির ভারতে ভিত শক্ত করে গড়ে তোলার কর্মকান্ডে আজ আরএসএস এক অগ্রদূত।

এই সময়ে আরএসএস ও বিজেপির বিরুদ্ধে দেশ জোড়া যে বিক্ষোভের আঁচে বুদ্ধিজীবিদের একটা বড় অংশ হাওয়া দিচ্ছেন তার সব ভালোর মধ্যে মন্দটা হলো যে এই লড়াই শুধুমাত্র সমাজের মুষ্টিমেয় কিছু উচ্চ শ্রেনীর মানুষের মধ্যেই আজ সীমাবদ্ধ। আপামর খেটে খাওয়া গরিব মানুষের মধ্যে এই লড়াই কে ছড়িয়ে দিয়ে, তাঁদের ন্যায্য সংগ্রামের সাথে, সামন্তবাদ ও কর্পোরেট পুঁজির নির্মম শোষণ - অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁদের রোজকার বেঁচে থাকার সংগ্রামের সাথে তাঁদের লড়াইকে মিলিয়ে দিতে বুদ্ধিজীবিদের একটা বড় অংশ আজ অপারগ, বা বলা ভালো তাঁরা সেই কাজটি করতে চান না, কারণ তাঁরা একটি এলিটিস্ট সিনড্রোমে ভোগেন। তাঁদের কাছে গরিবদের ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইগুলি ভীষণ তীক্ষ ও উগ্র, তাই তাঁদের পক্ষে শ্রমিক কৃষকের লড়াইয়ের সাথে একাত্ম হওয়া আজ মহা কষ্টকর কাজ।

আমরা যদি গভীর ভাবে ইতিহাসকে খতিয়ে দেখি তাহলে বুঝতে পারবো যে দেশের আপামর শ্রমিক ও কৃষকের সংগ্রাম, বিশেষ করে ঐক্যবদ্ধ ও সংহতি মূলক লড়াই ছাড়া ফ্যাসিবাদ কে পরাস্ত করা অসম্ভব।  বুদ্ধিজীবিদের লড়াইতে অনেক তাত্বিক মার প্যাঁচ, বড় বড় ভাষণ, গান, থিয়েটার, ও মনোরঞ্জনের নানা উপাদান হয়তো থাকতে পারে, তা হয়তো শ্রমিক কৃষকের সংগ্রামের মতন অত রুক্ষ ও সোজা সাপ্টা হয় না।  কিন্তু আর্থ -সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে বোঝা যাবে যে এই শ্রমিক কৃষকের সংগ্রামের থেকে বিছিন্ন সংগ্রাম বুদ্ধিজীবিদের হয়তো সাময়িক ভাবে তুঙ্গে তুলবে কিন্তু পরবর্তী কালে এই লড়াই কোনও রসদ না পাওয়ার কারণে এবং বিচ্ছিন্নতার কারণে অচিরেই কানা গলিতে চক্কর খাবে। যতদিন বুদ্ধিজীবিরা নিজেদের ক্ষুদ্র গন্ডি পের হয়ে শ্রমিক ও কৃষকের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মানসিকতা না অর্জন করতে পারছেন ততদিন তাঁদের অনুপস্থিতিতে ওই অমিত শাহ আর মোদী বাবু শ্রমিক - কৃষকের মধ্যে জাত ও ধর্মের ভিত্তিতে দেওয়াল তুলে তাঁদের সামন্তবাদ ও কর্পোরেট লুটের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে চোরাগলিতে টেনে নিয়ে শেষ করতে চাইবে। এই কারণেই তো বিজেপি আজ দেশী - বিদেশি পুঁজির সর্বশ্রেষ্ঠ দালাল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে।

        

২রা সেপ্টেম্বরের দেশজোড়া শ্রমিক - কর্মচারীদের ধর্মঘট কে জিততেই হবে

২রা সেপ্টেম্বরের দেশ জোড়া শ্রমিক সংগঠনগুলির ডাকা সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘট কে ভাঙ্গার কথা প্রকাশ্যে ঘোষনা করে মমতা ব্যানার্জী সরাসরি মোদী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের প্রতি তার নৈতিক সমর্থনের ইঙ্গিত দিলেন, তার সাথে তিনি তার স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে তাতিয়ে তুললেন তার ছাত্র পরিষদ কর্মী সমর্থক থুড়ি গুন্ডা বাহিনী কে যাতে তারা ৬০-৭০ এর দশকের যুব কংগ্রেস - ছাত্র পরিষদের মত সরাসরি বামপন্থী কর্মী সমর্থকদের উপর হামলা করে ধর্মঘট ভাঙ্গার কাজ করতে পারে। এই আস্ফালনের প্রেক্ষাপট হলো মমতার পুলিশের দ্বারা ২৭শে অগাস্ট নির্মম ভাবে নবান্ন অভিযানে সামিল কৃষকদের মিছিলের উপর দমন পীড়ন। একদিন মিছিল আটকে মমতা ও তৃণমূলী সরকারের স্থির বিশ্বাস হয়েছে যে তারা শ্রমিক ও কৃষকদের যে কোনও লড়াই ভাঙ্গতে পারবে তাদের দলদাস প্রশাসনকে লেলিয়ে দিয়ে।   

২রা সেপ্টেম্বরের দেশ জোড়া শ্রমিক - কর্মচারীদের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল ডান - বাম মিলিয়ে ১১ টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন, কিন্তু ধর্মঘট থেকে শেষ মুহুর্তে আরএসএস এর চাপে পিছু হটে সংঘ পরিবারের শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় মজদুর সংঘ। এই ধর্মঘট ডাকা হয়েছে মোদী সরকারের জন বিরোধী নীতিগুলির বিরুদ্ধে। গত এক বছর ধরে বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার তার পূর্বসূরী কংগ্রেস সরকারের পথ ধরে চলে বড় বড় কর্পোরেটগুলির, বিদেশী বৃহত একচেটিয়া লগ্নি পুঁজি ও তার দেশী দালাল পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করার জন্যে জনগণের ঘাড়ে নামিয়ে আনছে একের পর এক ভয়ানক কোপ।  যেমন শ্রম আইন সংস্কার করে দেশের শিল্প ক্ষেত্রে কর্মরত এক বিরাট অংশের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো। ন্যুনতম মজুরি বাড়ানোর যে সংগ্রাম সারা দেশব্যাপী মূল্য বৃদ্ধির বাজারে শ্রমিক শ্রেণী চালিয়ে আসছে তার প্রতি নির্মম পরিহাস করে লোক দেখানো ভঙ্গিতে যত সামান্য বাড়ানো হলো মজুরি, অন্যদিকে কর ছাড় সহ নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে মালিক শ্রেণীকে দেওয়া হচ্ছে অঢেল লাভ কামাবার উপায়।  ৮ ঘন্টার কর্মদিবস আউটসোর্সিং ও এসইজেড এর দৌলতে আগেই শ্রম দুনিয়া থেকে চলে গেছে অতীতের রক্ষনাগারে, এবার ১০-১২ ঘন্টার নিয়মিত কর্ম দিবস করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীকে ক্রীতদাসের মতন ব্যবহার করার স্বার্থে। ওভারটাইমের জায়গায় এখন নিয়মিত কর্মদিবসেই শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেশি বেশি খাটিয়ে প্রচুর মুনাফা কামাবার লালসায় বৃহত একচেটিয়া লগ্নি পুঁজিপতিরা, তাদের ভারতীয় দালাল পুজিপতি ও তাদের পেটোয়া বাজারী সংবাদ মাধ্যমগুলি এই তথা কথিত শ্রম আইন সংস্কারের নামে শ্রমিকদের উপর শোষনের বোঝা ভারী করার ষড়যন্ত্র কে 'সাহসী পদক্ষেপ', 'বলিষ্ঠ পদক্ষেপ', ইত্যাদী বলে সাধুবাদ দিছে। 

দেশের বেসরকারী ক্ষেত্রে কর্মরত কর্মচারীদের অবস্থাও শ্রমিকদের মতনই অসহনীয় পর্যায় নেমে গেছে।  বিপুল মূল্যবৃদ্ধির বাজারে বিদেশী বৃহত একচেটিয়া পুঁজি ও তাদের তল্পিবাহকদের প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিম্ন পদে কাজ করা কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে যত সামান্য, অন্যদিকে ম্যানেজমেন্ট এর বেতন বাড়ছে হুহু করে। সরকারী কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে, শূন্যপদে লোক নিয়োগ বন্ধ রেখে ঠিকা কর্মচারীদের দিয়ে পূর্ণ কর্মচারীদের বেতনের ১/১০ অংশ দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে, বেসরকারী ক্ষেত্রের মতন কোনও সুযোগ সুবিধা কর্মচারীদের দেওয়া হচ্ছে না। তার উপর শ্রমিক - কর্মচারীদের  সারা জীবন ধরে সঞ্চিত প্রভিডেন্ট ফান্ড এর টাকা এবার সরকারের পক্ষ থেকে বৃহত একচেটিয়া লগ্নি পুঁজি কে ভেট হিসাবে দান করা হচ্ছে শেয়ার বাজারে ফাটকা খেলার জন্যে। এর ফলে অবসরের পরে পথে নামবেন বহু শ্রমিক ও কর্মচারীরা, আর তাঁদের টাকা মেরে দিয়ে লালে লাল হবে এক শ্রেনীর ফাটকাবাজ পুঁজিপতি।      

এই পরিস্থিতিতে একদিকে মমতা যখন বৃহত এক চেটিয়া পুঁজির চাপে ও সারদা কেলেঙ্কারির ঠেলায় তার পুরানো মিত্র বিজেপির সাথে সন্ধি করেছেন গোপনে - ধরি মাছ না ছুই পানি - নীতি অবলম্বন করে এবং আক্রমণের তীর ঘুরিয়েছেন শ্রমিক কৃষকদের সংগ্রামের দিকে তখন স্পষ্টতই তার মন্তব্যের ও হুমকির মধ্যে দিয়ে এটা পরিস্কার হচ্ছে যে তিনি কাদের স্বার্থ রক্ষা করতে চান।  কেন তিনি শ্রমিক - কৃষক বিরোধী মোদী সরকারের অর্থনৈতিক নীতিগুলির আর খোলাখুলি বিরোধিতা করতে পারছেন না সে কথা তিনি স্পস্ট করে  বাংলার খেটে খাওয়া মানুষদের জানাতে দ্বিধা বোধ করছেন কেন ? তার ধর্মঘট বিরোধিতার অর্থই হলো যে তিনি খোলাখুলি ভাবে মোদী সরকারের কর্পোরেট তোষণ রাজনীতির পক্ষে দাঁড়ালেন, যেমন দাঁড়িয়েছিলেন বাজপেয়ীর সরকারের বিলগ্নীকরণ ও উদারীকরণের নীতির পক্ষে সেই ২০০০-২০০৪ সালে। কিন্তু শুধু মাত্র মুসলমান ভোট খুয়ে যাবার আতঙ্কে উনি এখনো সর্ব সমক্ষে বিজেপির সাথে হাত মেলাচ্ছেন না।  

মমতার সরকার কিছুদিন মুখে মুখে বিজেপির বিরোধিতা করলেও সংসদে অন্যান্য বিরোধীদের থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখে দর কষাকষি চালিয়ে যায় বিজেপির বিরুদ্ধে।  তাই পেঁয়াজ সহ সমস্ত তরী তরকারী, চাল, ডাল, তেল সহ খাদ্য বস্তু ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের চরম মূল্যবৃদ্ধি সত্তেও তারা কোনও কেন্দ্র বিরোধী লড়াইয়ে জোট বাঁধেনি। রাজ্যের কোনও জায়গায় পেঁয়াজের কালোবাজারী রুখতে রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারী উদ্যোগে সঠিক দামে পেঁয়াজ বন্টনের ব্যবস্থাও মমতা ব্যানার্জীর সরকার করেনি। এরা ভাত দেওয়ার মুরোদ রাখেনা, কিন্তু কিল মারার গোঁসাইয়ের ভূমিকায় ভালো ভাবেই উত্তীর্ণ হয়।    
পশ্চিম বাংলায় একদিকে যখন আজ মূল্যবৃদ্ধির সূচক বেড়ে চলেছে, গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের হেঁসেল থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়েছে মাছ, মাংস, ডাল, ও সবুজ তরী তরকারী, কর্ম সংস্থানের সুযোগ কমায় লোটা কম্বল নিয়ে প্রবাসে যেতে বাধ্য হচ্ছে অসংখ্য তরুণ - তরুণী, অন্যদিকে যখন এই রাজ্যে অবস্থিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি, কর্পোরেট সংস্থাগুলি কলকাতা ও পশ্চিম বাংলাকে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে 'কম খরচের জায়গার' নাম দিয়ে অন্যান্য রাজ্য ও শহরের তুলনায় প্রচুর কম বেতনে কর্মচারীদের দিয়ে একই রকমের কাজ করায় (যদিও দিল্লি ও কলকাতায় জীবন যাপন করার খরচায় কোনও তারতম্য নজরে পরেনি ডালহাউসি তে রাস্তায় সস্তার ভাত মাছ ছাড়া) তখন কিন্তু আমরা মমতার গর্জন শুনি না ওই বিদেশী একচেটিয়া পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে, তাদের দেশীয় মারোয়ারী - গুজরাটি - বাঙালি পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে। সমস্ত গর্জন আর হুমকি তিনি লুকিয়ে রাখেন শ্রমিক ও কৃষকদের, কর্মচারী ও ছাত্র যুবদের বিরুদ্ধে। তার কারণ, মমতার শ্রেণী স্বার্থ বিজেপির থেকে অভিন্ন, তার শ্রেণী স্বার্থ জড়িয়ে আছে জোতদার - জমিদার বিদেশী ও দেশী পুঁজিপতিদের সাথে।তাই শুনি প্রতিবার ধর্মঘট ভাঙ্গার হুমকি, শ্রমিক -কৃষক-ছাত্র-যুব-মহিলাদের সংগ্রাম দমনের হুঙ্কার।            

ধর্মঘট গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেনীর এক অবিচ্ছেদ্য অধিকার, তাঁর গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের হাতিয়ার। এই অধিকার তাঁর থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না এবং কারুর চাপে সে নিজে থেকে এই হাতিয়ার সমর্পণ করবে না। আগামী ২রা সেপ্টেম্বর দেশ জোড়া ধর্মঘট সংগ্রামে বিপুল ভাবে শ্রমিক ও কর্মচারীরা অংশ গ্রহণ করে মোদী সরকারের কর্পোরেট তোষণের নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে নিজেদের দাবি জানাবেন এবং নিজেদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার লড়াইতে তীব্র গতিতে এগিয়ে যাবেন।  মমতার পুলিশ, যুব তৃণমূল, তৃণমূলী ছাত্র পরিষদ, গুন্ডা বাহিনী, বোমা-গুলি-লাঠি কোনও কিছুই শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির এই লড়াইকে রুখতে পারবে না। 

সেই ১৯৫৯ সালের ৩১শে অগাস্ট বিধান রায়ের কংগ্রেসী পুলিশ নির্মম ভাবে কলকাতার রাজপথে পিটিয়ে পিটিয়ে খুন করেছিল ৮৯ জন নিরীহ - ক্ষুদায় কাতর কৃষকদের, ২০১৫ সালের ২৭শে অগাস্ট মমতার তৃণমূলী পুলিশ পিটিয়ে আহত করলো নিরস্ত্র কৃষকদের, আর ২রা সেপ্টেম্বর লড়াই হবে শ্রমিকের আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে মমতার বৃহত পুঁজির স্বার্থে শ্রমিকদের উপর ফ্যাসিস্ট দমন পীড়ন নামিয়ে আনার ষড়যন্ত্রের। এ হবে রাজপথে খোলাখুলি দুই শ্রেনীর, শোষিত ও শোষকের শ্রেণী যুদ্ধ, এবং এই লড়াইতে শ্রমিকশ্রেণী কে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম করে জিততে হবেই।              



বীরভূমের কাহিনী - গণতন্ত্র'র স্বরূপের নমুনা

গণতন্ত্রের ধ্বজ্জাধারী তৃণমূল ও বিজেপির চোখ এখন বীরভুম জেলায় আবদ্ধ। সেখানে চলছে এখন সংসদীয় গণতন্ত্রের এক প্রধান কর্মযজ্ঞ, দল বদলের খেলা। জামা পাল্টাবার মতন করে সমস্ত মাথারা হঠাত দল ত্যাগ করতে শুরু করলো এবং এখানে এগিয়ে চলেছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের গোলের সংখ্যা বেশি কারণ ফরওয়ার্ড পজিশনে ফুর্তিতে খেলছে অনুব্রত ওরফে দিদির কেষ্ট।  

বীরভুম দখল করার তাগিদ বেশি কারণ এই জেলায় বিজেপি দাঁত ফুটিয়েছিল এবং আশ্চর্যজনক ভাবে মুসলমানদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তুলে।  মুসলমানদের পরিত্রাতা হিসাবে নিজেদের দাবি করা তৃণমূলের পক্ষে এই ঘটনা তীব্র যন্ত্রনাদায়ক ছিল। তাই বীরভুম কে দখল করার জন্যে জরুরি হল সংগ্রাম, মানে এলাকা দখলের জন্যে ভ্রাতৃঘাতী  দাঙ্গা।  এর পর চললো গুলি আর পেটোর খেলা, যা ভারতীয় সংসদীয় ব্যবস্থার বিশেষ করে পশ্চিম বাংলার রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। 

হৃদয় ঘোষের হৃদয় পরিবর্তন হয়েছে সম্প্রতি। সাগর ঘোষের হত্যার কেস তুলে দিয়ে সে এখন মমতা বাড়ুজ্যের মমতা ও করুণার আঁচলের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে কেষ্টের সহায়তায়। কেষ্ট আবার দিদির নির্দেশে মাথা গরম না করে, আইন কানুন কে শ্রদ্ধা করে বুকে টেনে নিয়েছে তার বিচ্ছিন হৃদয়কে, যে এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত কেষ্টকে তার বাবার খুনি বলে গাল পাড়ছিল। বীরভূম জুড়ে বীর কেষ্টের জয় জয়কার শুরু হয়েছে, রাম ভক্ত হনুমানদের দলে ফাটল ধরেছে, দুধকুমার লেঙ্গি মেরে খাল টপকে ও পাড়ে, বাকি ঠেলে ঠুলে যারা গেরুয়া ঝান্ডা তুলে রেখেছে তাদের এখন ভয়ানক কৌষ্ট কাঠিন্যের দৌলতে ভুগতে হচ্ছে।  এক এক করে সব তালপাতার সেপাই শিবির ত্যাগ করে দিদির নীড়ে আশ্রয় নিচ্ছে কিছু ভালো খাওয়া পড়া জোটার আশায়।  সবাই আশা করে রেখেছে যে পারুইয়ের সেই গৃহবধুও এবার দিদির কাছে ছুটবেন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে করা অভিযোগকে সিপিএমের বিরুদ্ধে বদলে দেবেন, ঠিক যেমন হৃদয় ঘোষ নিজের পিতার হত্যায় অভিযুক্ত অনুব্রতর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নেওয়ার পর হঠাত আবিষ্কার করে যে তার বাবার মৃত্যুর জন্যে দায়ি একমাত্র সিপিএম।

বীরভুম এমন এক রণাঙ্গন, যেখানে একদিকে দিদির ভক্ত বাহিনী, যার সেনাপতি খোদ কেষ্ট, অন্যদিকে ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দারের পঙ্গপাল বাহিনী। দুইয়ের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধলেও যে তা হাস্যকর হবে সে কথা আজ বীরভূমের শিশুরাও স্পস্ট করে বুঝিয়ে দিতে পারবে। তাই গেরুয়া শিবিরের 'আচ্ছে দিন' এর সূর্যাস্ত  হয়ে গেছে বীরভূমের মাটিতে, সেথায় শুধু কেষ্টের জয়জয়কার। বীরভুম থেকে হাওয়া বদলের স্বপ্ন চূর্ণ হয়েছে গৈরিক বাহিনীর, এখন তারা যেন তেন প্রকারে মুখ রক্ষার প্রয়াসে ব্যস্ত।

বীরভুম এর সাম্প্রতিক তৃণমূল - বিজেপির সশস্ত্র সংঘাত আমাদের পশ্চিম বাংলার কেশপুরের ২০০০ সালের ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে এলাকা দখলের কোন্দলে ব্যস্ত সিপিএম ও তৃণমূল তাদের সংসদীয় গণতান্ত্রিক পথের পাঁচালি পড়া ছেড়ে নেমে এসেছিল খোলা খুলি মাস্কেট আর ওয়ান শাটার এর লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি কায়েম করতে।  আজ সংসদীয় গণতন্ত্রের নামাবলী গায়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মতন দুই অতি দক্ষিনপন্থী দলগুলিও সেই সশস্ত্র সংগ্রাম কেই ক্ষমতা দখলের এক মাত্র পথ বলে গন্য করলো।  ভাবতে অবাক লাগে যে কমিউনিস্টদের একটি অংশের সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের রাজনীতি কে এরা এই বলে ভার্ত্সনা করে যে ভারতবর্ষের রাজনীতিতে হিংসার কোনও স্থান নাই।  কিন্তু এদের কার্যকলাপ কি আমাদের মতন সাধারণ মানুষকে ভগবান বুদ্ধদেবের কথা মনে করায়? এই বিজেপির নেতারা কি স্বীকার করেনি যে তৃণমূলের আক্রমণ প্রতিহত করতে বীরভূমে এদেরও সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। আজ হঠাত রুপা গাঙ্গুলিকে কেন দুধ কুমার কে বাসায় ফিরিয়ে আনার দাবিতে সোচ্চার হতে হচ্ছে ? তার কারণ বিজেপির অন্দরে এই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়েছে যে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বীরভূমে সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে জমি দখল করতে গেলে ওই রকম পোড় খাওয়া সংঘ নেতাদের দরকার যারা হিন্দু মুসলমানে, বা হিন্দুতে হিন্দুতে, বা মুসলমানে মুসলমানে দাঙ্গা বাঁধাতে ওস্তাদ। 

আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দক্ষিনপন্থী ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলির, যারা একদিকে হিন্দু ফ্যাসিবাদ আর অন্যদিকে মুসলিম মৌলবাদ কে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে, তাদের এই উথ্বান দেখে গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ আজ সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছেন। কিন্তু একটু পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে যে এদের এই উথ্বানের কারণ হল ৩৪ বছর ধরে মেকি 'বামেদের' অপশাসন। যা এই রাজ্য থেকে ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, অন্ধ বিশ্বাস, ও ভ্রাতৃঘাতী হিংসার রাজনীতিকে নির্মূল করার কোনও প্রচেষ্টা তো করেইনি, বরং এই সমস্ত কাজে বেশি বেশি করে ইন্ধন দিয়ে গেছে খিড়কির দরজা দিয়ে। জন সমক্ষে যখন জ্যোতি বোস - বুদ্ধদেবরা বড় গলায় মানুষের চেতনা বৃদ্ধি হওয়ার দাবি করছিল, ঠিক তখনই অন্যদিকে পাড়ায় পাড়ায় শনি পুজো থেকে নানা গুরুদেবের ভজনা বৃদ্ধি পেল, বটতলায় সিঁদুর মাখানো পাথরে মানুষের মাথা ঠোকা বাড়লো, জুম্মাবারের নামাজে নামাজিদের সংখ্যা বাড়লো, পীরের দরগায় গিয়ে মাথা ঠোকা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সামাজিক বিভেদ রেখা আরও স্পস্ট হয়ে উঠলো।  যে বামপন্থীদের কাজ ছিল মানুষের চেতনা বৃদ্ধি করা, তাদের প্রগতিশীল চিন্তাধারায় সমৃদ্ধ করে তোলা, রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত করে তোলা, তারা শুধু প্রোমোটার আর জোতদারদের সাথে রফা করে চলে গুন্ডা বদমাইশদের সাহায্যে দল ভারী করেছিল আর রিগিং করে জেতার জন্যে এক বিরাট 'সম্পদ' বাহিনী গড়ে তুলেছিল। তাদের ৩৪ বছরের রাজনৈতিক শাসনে তারা পশ্চিমবাংলার খেটে খাওয়া মানুষদের, শ্রমিক ও কৃষকদের, মেহনতী মধ্যবিত্ত ও ছাত্র - যুবদের শুধুই প্রতিক্রিয়ার শিবিরের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। 

এই অবস্থায় আজ পশ্চিম বাংলার মসনদে যে দলই আসীন হোক, তার পক্ষে হিংসা - বিদ্বেষ - সন্ত্রাস না ছড়িয়ে কোনও ভাবে রাজ্য শাসন করা সম্ভব না। পেটো আর ওয়ান শাটার - মাস্কেট - ৯ মিমি পিস্তল দিয়েই এই রাজ্যের মসনদে আসা যায় ও টিকে থাকা যায় এই সত্যটি আজ শিশু মাত্র বোঝে। বীরভুম তার থেকে আলাদা নয়। হয় কেষ্ট নয় দুধকুমার এই দুইয়ের মধ্যে যে এই জেলায় নিজ দলের প্রতিপত্তি বজায় রাখতে চাইবে তাকেই এখানে পেটোর শাসন কায়েম করতে হবে। রাজনীতির মঞ্চে দাড়িয়ে মমতা - রাহুল - অধীর - বুদ্ধ সবাই এক যোগে হিংসার রাজনীতির বিরোধিতা করবে, একযোগে বলবে তারা সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে বিশ্বাস করে, আর রাত পোহালেই রাস্তায় গুলিবিদ্ধ লাশ পরে থাকবে সেই সংসদীয় দলের পদাতিক বাহিনীর এবং দোষ হবে বিরোধী সংসদীয় দলের।  

বাম জমানার হুগলি - মেদিনীপুর - ২৪ পরগণার জায়গায় আজ তৃণমূল যুগের বীরভুম, এই রাজ্যের পট পরিবর্তনের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রের রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং এই খুন - পাল্টা খুন, বাড়ি জ্বালানো, ধর্ষণ, হিংসার মাধ্যমেই আমরা শুনবো যে ভবিষ্যতে এক উন্নত রাজ্যে আমরা নাকি পৌঁছাবো, আমাদের রাজ্যে নাকি উন্নয়নের ধারা বয়ে যাবে এবং লক্ষ লক্ষ ছেলে - মেয়েরা যারা বাইরে পেটের টানে গেছেন তাঁরা সব বাড়ি ফিরে আসবেন কারণ কর্মসংস্থান নাকি এখানেই হবে। তাই পেটো ফাটবে, দানা চলবে, আর গণতন্ত্রের অন্তর্জলি যাত্রার মধ্যে দিয়ে বাঙালি দুয়ারে বসে থাকবে 'আচ্ছে দিনের' অপেক্ষায়। 

    

এই ব্লগের সত্বাধিকার সম্বন্ধে