আরএসএস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আরএসএস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

যুদ্ধ ও উগ্র দেশপ্রেমের জিগির তুলে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের ভোটের বাজার দখলের লড়াই কে পরাস্ত করুন


ভাঙচুর চলছে, দেশপ্রেমের ভাঙচুর। সেই পুরানো চাল ভাতে বাড়ছে শাসকশ্রেণী আর গোগ্রাসে তা চেটেপুটে খাচ্ছে আমাদের দেশপ্রেমের নেশায় আচ্ছন্ন সাবর্ণ শহুরে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত লোকেরা। যুদ্ধ চাই, ভীষণ যুদ্ধ চাই তাদের, আর যুদ্ধের তর সইছে না, অবিলম্বে যুদ্ধ চাই। পাকিস্তানের লাশ দেখে তবেই এবার নাস্তা পানি খাবেন কর্তারা, তাই ফেসবুক, টুইটার সহ নানা সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। 

পুলওয়ামা হামলা হওয়ার পর থেকেই যুদ্ধের জিগির একদম ছাদ ভেদ করে আকাশে পৌঁছে যেতে চায়। তাই চিৎকার — যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ চাই। যুদ্ধ না হলে তো আর হিসেব নিকেশ হবে না, নিরামিষাশী মোদী ভক্তদের রাতের পনীর মশালা হজম হবে না, সকালে পরিষ্কার মলত্যাগ হবে না। তাই যুদ্ধ চাই, রক্তে স্নাত মাটি দেখেই আজ চোখ জুড়াবে ভক্তকুলের। 

তাই সেই ভারত যখন চীন আক্রমণ করে ১৯৬২ সালে তখন যেমন চিনা বাদাম ওয়ালা কে গড়ের মাঠে ফেলে পেটাতো কংগ্রেস দলের গুন্ডারা বা মহিলাদের লাল ব্লাউজের উপর ব্লেড চালাতো, বা কমিউনিস্টদের বন্দী করে জেলে রেখে অত্যাচার করতো, তেমনি আজ কাশ্মীরি মানুষ, যাদের জমি কে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে দাবি করে দেশপ্রেমিকদের দল, তাদের দেখতে পেয়েই রে রে করে তেড়ে মারতে যাচ্ছে গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা দেশপ্রেমিক বাছুরের দল, স্লোগান তাদের “জ্যায় সিরি রাম” আর হাতে তাদের ধারালো অস্ত্র। 

খুঁজে খুঁজে আক্রমণ করা হচ্ছে কাশ্মীরি ছাত্র-ছাত্রীদের, ব্যবসায়ীদের, এমনকি প্রসিদ্ধ ডাক্তারদের। হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ধরে পেটানো হচ্ছে, দেরাদুন, জম্মু প্রভৃতি জায়গায় কাশ্মীরি মানুষদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আর লাগানো হচ্ছে দেশদ্রোহীর তকমা। এই আক্রান্ত মানুষদের, যারা ওই মৃত জওয়ানদের মতন যুদ্ধ করতে গিয়ে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হননি, বরং নিজের জীবনযাপনের তাগিদে, লেখাপড়া শেখার তাগিদে, চাকরী করার তাগিদে নিজ ভিটে মাটি ছেড়ে ভারতের নানা কোনায় পড়ে আছেন হৃদয়ের এক কোণে একটুকরো কাশ্মীর কে লালন করে, তাদের রক্ষা করতে যে বা যারা এগিয়ে এসেছেন তারাও আক্রান্ত হয়েছেন বিবেচনাহীন, ফ্যাসিবাদের গরল পান করা উগ্র দেশপ্রেমিক নামক সংঘ পরিবারের সন্ত্রাসীদের  হাতে। 

যে বা যারা করেছে যুদ্ধের বিরোধিতা তারা আজ দেশদ্রোহী, যে বা যারা ভারত রাষ্ট্রের কাশ্মীরের উপর সামরিক দখলদারি’র বিরোধিতা করছে তারা দেশদ্রোহী, যারা আজ সাধারণ মানুষের উপর দেশপ্রেমের লেবেল আঁটা হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের বিরোধিতা করছে তারা আজ দেশদ্রোহী হিসেবে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের পোষ্য বাহিনীর কাছে চিহ্নিত হচ্ছে। আর এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ যে ভাল আছে তা কিন্তু মোটেই নয়। 

যুদ্ধের বিরুদ্ধে, সেনা নিয়ে নির্লজ্জের মতন রাজনীতি করার বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিরুদ্ধে মুখ খোলায় পশ্চিমবঙ্গেও হাজারে হাজারে গেরুয়া বাহিনীর জওয়ান’রা আক্রমণ করছে মুক্ত চিন্তার মানুষদের, বামপন্থীদের এবং অন্যান্য সকলকেই যারা রক্ত চাই, রক্ত চাই বলে চিৎকার করছে না। আক্রান্তদের বাঁচাতে গড়ে উঠছে না কোন বিপ্লবী ফ্যাসিবিরোধী ব্যারিকেড, আর তাই এই একের পর এক হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট আক্রমণে জর্জরিত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল চেতনার মানুষ।

বনগাঁ থেকে হাওড়া, কলকাতা থেকে সুদূর রানীগঞ্জ সর্বত্রই হিন্দুত্ববাদী শক্তি নিজের পেশীর জোর দেখিয়ে ভোটের আগে বাজার গরম করতে নেমেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদিও বা আশ্বাস দিয়েছেন যে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করবে তাঁর সরকার কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা যে ফাঁকা বুলি সবাই জানে। তৃণমূলের পৃষ্টপোষকতা ছাড়া বিজেপি ও আরএসএসের এই রাজ্যের বুকে এই ভাবে বুক বাজিয়ে মানুষের বাড়িতে শয়ে শয়ে গুন্ডা নিয়ে গিয়ে আক্রমণ করা সম্ভব হতো না। 

সামনে লোকসভা নির্বাচন আর এই সময়ে এই রকম ভাবে উগ্র দেশপ্রেমের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অন্যায়গুলো কে চাপা দিয়ে দেওয়ার সুযোগ কি আর কেউ খোয়াতে চাইবে, যখন সেই অন্যায় নীতির ফলে দেশের অর্থনীতি গত পাঁচ বছরে এমন গড্ডালিকায় গিয়ে ঢুকেছে যে তার বেরিয়ে আসা দুস্কর? 

তাই ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলিম নিধন যজ্ঞ শুরু করার আগে নরেন্দ্র মোদী যে ভাবে লক্ষ লক্ষ ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের সাহায্যে গোধারা রেল স্টেশনে আগুনে পুড়ে মৃত ৫৬ জন আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মীদের মৃতদেহ দাহ না করতে দিয়ে আহমেদাবাদে নিয়ে এসে সারা শহর প্রদীক্ষণ করিয়ে সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক অভীষ্ট অর্জন করেছিলেন, ঠিক সেই ভাবেই  ছকটা আবার তৈরী করা হচ্ছে। 

প্রতিটি মৃত জওয়ানের পরিবারের সম্মতি ছাড়াই বিজেপি তাঁদের মৃতদেহ নিয়ে বিশাল বিশাল মিছিলের আয়োজন করেছে। না, তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতে নয়, বরং এই সুযোগে মুসলিম-বিরোধী বিদ্বেষের বীজ কে চারায় রূপান্তরিত করতে, কাশ্মীরের মাটিতে ভারতের শাসকশ্রেণীর দ্বারা নিষ্ঠুর ভাবে জনগণ কে অত্যাচার ও শোষণ করার কাজে সমর্থন আদায়ের স্বার্থে, আগামী নির্বাচনে মোদী ও বিজেপি কে আতঙ্কের থেকে ভোট দেওয়ানোর স্বার্থে এই মিছিলগুলি’র আয়োজন করা হয়েছে। এই মিছিলগুলি সিআরপিএফের নিহতদের শেষ যাত্রার মিছিলের জায়গায় গণতন্ত্রের অবশিষ্টের অন্তর্জলি যাত্রা হিসেবে বেশি কুখ্যাতি অর্জন করেছে। 

যত বেশি করে লাশ নিয়ে মিছিল বিজেপি ও আরএসএস করছে, তত বেশি করে দেশের প্রান্তে প্রান্তে কাশ্মীরি মানুষদের উপর বেছে বেছে হামলা করা হচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মীরে মুসলিম মানুষদের বেছে বেছে হামলার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তেরঙা ঝাণ্ডা নিয়ে মিছিল করে, পাকিস্তান কে গাল পেড়ে আসলে দেশজুড়ে মুসলিম বিদ্বেষের আগুনে হাওয়া দিয়ে নির্বাচনের আগে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করতে চাইছে বিজেপি ও মোদী সরকার। সারা দেশের সংখ্যাগুরু হিন্দু সমাজের মধ্যে তীব্র ভাবে কাশ্মীরি মানুষদের ব্যাপারে ও মুসলিম জনতার ব্যাপারে যে ভীতি গেড়ে বসে আছে তার আঁচে হাওয়া দিয়ে নিজের নির্বাচনী স্বার্থসিদ্ধি করে নেওয়াই এখন রাফ্যাল থেকে নীরব মোদী কাণ্ডে জর্জরিত বিজেপি’র অভিলাষ। এই অভিলাষ চরিতার্থ করতে বিজেপি ও আরএসএস কিন্তু যে কোন সীমা ছাড়িয়ে নোংরামো করতে পারে আর তা বুঝতে হলে আপনাকে রাজনীতি নিয়ে পিএইচডি করতে হবে না। 

প্যাটার্নটা কিন্তু সেই একই। জায়গায় জায়গায় কাশ্মীরি মানুষদের উপর আক্রমণের প্যাটার্নটা এক, আক্রমণের সমর্থনে সিআরপিএফের জওয়ানদের মৃত্যুর যুক্তি ব্যবহার করে অপরাধটাকে ঢাকার চেষ্টা চলছে। সেই ২০০২ সালে যেমন মোদী নিউটনের তৃতীয় নিয়ম উল্লেখ করে বলেছিলেন যে গুজরাটে মুসলিম নিধন যজ্ঞ আসলে গোধারা কাণ্ডের “রিয়্যাকশন” মাত্র, তেমনি আজ সাম্প্রদায়িক হিংসা কে, গণতন্ত্র-বিরোধী হিংসা কে জনগণের রোষ বলে চালানোর চেষ্টা করছে বিজেপি ও আরএসএস। 

দেশের সব বড়-ছোট সংবাদ মাধ্যমের মুখে কাপড় গুঁজে তাদের কোন ধরণের সরকারের সমালোচনা করতে দেওয়া হচ্ছে না। মোদী’র পদলেহী সব সংবাদ মাধ্যম যুদ্ধং দেহি মনোভাব নিয়ে এমন এক আলোচনা চালাচ্ছে যার সব দিকেই যুদ্ধ কে, হিংসা কে কাশ্মীরের মতন একটি জটিল সমস্যার সমাধান হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। এ এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। সংখ্যালঘু মানুষরা, বিজেপি বিরোধীরা আর হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ-বিরোধীরা যে কেউ এই আক্রমণের শিকার হতে পারেন।

আর এই হট্টগোলে কেউ একবারও জিজ্ঞাসা করার সাহস পাচ্ছে না যে পুলওয়ামায় সিআরপিএফের জওয়ানদের উপর আক্রমণ কাদের ব্যর্থতায় হলো? কে এর দ্বায়িত্ব স্বীকার করছেন? কে পদত্যাগ করলেন? কেন মোদী সরকারের কাশ্মীর নীতি কাশ্মীর কে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিল?   

দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে কাশ্মীরের সমস্যা কে নিজ রণনৈতিক কারণে জিইয়ে রেখেছে ভারতের শাসকশ্রেণী। স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরের মানুষের সাথে গণভোট নিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে প্রতারণা করার পরেই কিন্তু বিদেশী শক্তির অনুপ্রেরণায় ১৯৮৯ সাল থেকে জঙ্গী আন্দোলন গড়ে ওঠে কাশ্মীর উপত্যকায় যার জের আজ পর্যন্ত চলছে। 

চরম সামরিক আগ্রাসন ও দৈনিক অকথ্য অত্যাচার, গুমখুন, ধর্ষণ ও ব্যাপক হারে ভারত রাষ্ট্রের দ্বারা নিরীহ স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরিদের নরসংহার হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার দাবির থেকে, নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির থেকে এক চুলও নড়েননি। প্রতি গ্রীষ্মে বরফ গললে তারা কিন্তু পথে নেমে বিশ্বের চতুর্থ শক্তিশালী সেনা বাহিনীর সাথে হাতে পাথর নিয়ে যুদ্ধ করেন, গুলি বা ছররা খেয়েও তারা গলা ফাটিয়ে ভারতের থেকে স্বাধীনতা চান।

হায়না যেমন লাশের ঘ্রাণ পেয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে ওঠে, আমাদের পেট ভরে খেতে পাওয়া, মোটা অর্থ আয় করা, সাবর্ণ উচ্চবিত্ত ও শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তথাকথিত দেশপ্রেমের ধ্বজ্জাধারীরা ঠিক তেমনি কাশ্মীরের মাটিতে সেনা বা আধা বা সিকি সেনার গুলিতে প্রাণ হারানো কাশ্মীরি মানুষের লাশ দেখে সেই রকমই উল্লাস প্রকাশ করে। কাশ্মীরের শিশুর চোখ লক্ষ্য করে ভারত রাষ্ট্র ছররা ছুড়লে তারা হুইস্কির গ্লাসে তুফান তুলে সেই ঘটনা কে স্বাগত জানায়। তারা ক্ষেপে যায় শুধু কাশ্মীরের মানুষ কে পাল্টা প্রতিরোধ করতে দেখলে। তারা রেগে যায় জনগণ কে পাথর ছুড়তে দেখলে। কারণ তখন তাদের জাতীয়তাবাদী অনুভূতিতে সুড়সুড়ি লাগে। 

কাশ্মীরের মাটিতে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার ৩০ বছরে প্রায় ১০০,০০০ মানুষ খুন হয়েছেন, যাদের সিংহভাগ’ই কিন্তু সাধারণ মানুষ। অনেক ভুয়ো এনকাউন্টার, কাস্টডিয়াল ডেথ, গুম খুন করে লাশ গোপন স্থানে কবর দিয়ে দেওয়া, নারীদের সামরিক বাহিনীর দ্বারা গণধর্ষণ করানো, ইত্যাদি, অকথ্য অত্যাচার দীর্ঘদিন ধরে বিরামহীন ভাবে চলছে। তবুও এই রাষ্ট্রীয় হিংসা, রক্তপাত ও নারীর উপর অত্যাচার হিন্দুত্ববাদের গরল পান করা তথাকথিত দেশপ্রেমিকদের উদ্বেলিত করে না। 

তারা প্রশ্ন করেননা ভারতের জনতার রক্ত ঘামের টাকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে আদায় করে নিজের রাজত্ব চালানো সরকার কে — যে কেন কাশ্মীরে এত রক্তপাত? কেন গণতান্ত্রিক ভাবে, আলোচনা করে এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান না খুঁজে শুধুই বন্দুকের নলের থেকে সমাধান বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার? কেন সরকার কাশ্মীরি মানুষদের মানুষ না ভেবে শুধুই বন্দুকের টিপ প্র্যাকটিস করার উপকরণ হিসেবে গণ্য করছে? 

তারা উদ্বেলিত হয় না কারণ তাদের দেশপ্রেম তাদের মতনই ঠুনকো। তাদের দেশপ্রেম অমর শহীদ ভগত সিং, রাজগুরু, সুখদেব, মাস্টারদা সূর্য সেন, বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম, ইত্যাদির দেশপ্রেমের মতন সাচ্চা না, বরং হেগড়েওয়ার, গোলওয়ালকার, সাভারকার বা শ্যামা মুখুজ্জ্যে’র মতন নকল দেশপ্রেম, সাম্রাজ্যবাদের জুতো চাটার বহিঃ আবেশ, যাতে তাদের আসল ঘৃণ্য চেহারাটা প্রকাশিত না হয়। 

এরা দেশ বলতে বোঝে এক টুকরো মাটিকে, পাথরকে, পাহাড় আর নদীকে, এরা দেশ বলতে বোঝে দেশের জমি ও সম্পদ কে। দেশের ব্যাখ্যায় এদের অভিধানে মানুষের কোন স্থান নেই। তাই মানুষ কে মেরে ফেলা চলবে তবে জমি এদের চাইই চাই। যখন বিদেশী কর্পোরেশনগুলি ভারতের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে যায়, ভারতের মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিরা যখন জনগণের করের টাকা চুরি করে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করে, দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন বিদেশী পুঁজির গোলামী করে, তখন এদের দেশপ্রেম ঘুমিয়ে থাকে লেপ মুড়ি দিয়ে। 

যখন কোন বেহায়া হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রাক্তন মহারানী ভিক্টোরিয়া’র জন্মদিন পালন করে তাঁকে দেশের রক্ষাকারী বলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন কে স্বাগত জানায়, তখন এরাই নির্লজ্জের মতন তাঁকে সাবাস বলে পিঠ চাপড়ায়। অনাহারক্লিষ্ট আদিবাসীরা যখন না খেতে পেয়ে মরে যায় তখন এরা ফাস্টফুড খেতে ব্যস্ত থাকে, যখন রাইফেলের জোরে, রকেট লঞ্চারের জোরে ছত্তিশগড় বা ঝাড়খণ্ডের আদিবাসীদের সরকার তাঁদের গ্রাম, জঙ্গল বা জমির থেকে উচ্ছেদ করতে চায়, তখন “উন্নয়নের” ডঙ্কা বাজিয়ে এই অকাল কুষ্মান্ডের দল তা সমর্থন করে। এর ফলেই নির্লজ্জ ভাবে বুক বাজিয়ে কাশ্মীরের জনগণের ওপর চলমান অত্যাচার ও শোষণ কে এরা দুই হাত তুলে সমর্থন করতে পারে আর জনগণের পাল্টা প্রতিরোধ কে, তাদের পাল্টা সংগ্রাম কে ভীষণ ভাবে ঘৃণা করতে পারে, কারণ মানুষ এদের শত্রু আর বৃহৎ পুঁজির ছুড়ে দেওয়া হাড় এদের খাদ্য।

তাই আধা সেনা হত্যার বিরোধিতা করার নাম করে যারা আরো বেশি বেশি করে হিংসা চালাতে চাইছে, যারা সরকার কে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন না করে ঝুটা দেশপ্রেমের জিগির তুলে সরকার বিরোধীদের, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী বিরোধীদের উপর একেবারে পরিকল্পনা করে হামলা করতে শুরু করেছে, তারা কিন্তু আজ দেশের জনগণের, খেটে খাওয়া মানুষের বড় শত্রুতে পরিণত হয়েছে। 

সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদির মাধ্যমে আরএসএস’র পুষ্যি বাহিনী বিরোধীদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করছে, সিআরপিএফের মৃত জওয়ানদের রেফারেন্স টেনে এনে বাম ও গণতান্ত্রিক বিরোধীদের হিটলারের কায়দায় হত্যা করার ষড়যন্ত্র কে উন্মোচন করছে। তার কারণ হলো এই বিরোধীরা মোদী সরকারের অপদার্থতা কে তুলে ধরে কঠিন প্রশ্ন তুলছেন, খেটে খাওয়া মানুষের খাদ্য-রোজগার-স্বাস্থ্য-শিক্ষা-সামাজিক সুরক্ষার দাবি তুলে সরকারকে তুলোধুনো করছেন, শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি মানুষের কথা তুলে উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচারের ঝড় কে রুখে দিচ্ছেন। তাই বিরোধীদের দমন করা আজ বিজেপি-আরএসএস ও তাদের পেয়াদাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সামনে কঠিন সময়। উগ্র জাতীয়তাবাদ, যুদ্ধের জিগির আর সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে বিজেপি আগামী নির্বাচনে বিজয় অর্জন করতে চাইবে। তারা চাইবে সমস্ত বিরোধীদের নিস্তব্ধ করে দিয়ে দেশের জনগণের শ্রম, দেশের খনিজ সম্পদ, মাটি, জঙ্গল ও জল বৃহৎ বিদেশী একচেটিয়া পুঁজি ও তাদের দালাল দেশী মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিতে। মোদী চাইবে সাম্প্রদায়িক ভাবে বিভক্ত দেশের জনগণের উপর ছড়ি ঘুরিয়ে নিজের সিন্দুকে ধনের পাহাড় জড়ো করতে। দেশের মানুষ খেতে চাইলে, রোজগার চাইলেই তাদের পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ দেখানো হবে, দেশপ্রেমের নাম করে রাষ্ট্র প্রেম শেখানো হবে। আর এই সোজা হিসাবটা যদি কেউ জনগণের সামনে তুলে ধরতে চান তাহলেই তাকে “দেশদ্রোহী” তকমা পেয়ে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে হবে। 

কাশ্মীরি জনগণের উপর চলতে থাকা আক্রমণ কে রুখতে, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল মানুষের উপর হতে থাকা আক্রমণ কে রুখতে, দেশের নানা প্রান্তে যুদ্ধ উন্মাদনা  সৃষ্টি করার বিরুদ্ধে লড়াকু শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের উপর চলমান রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও হিন্দুত্ববাদী আক্রমণ কে রুখতে আজ পথ নিতে হবে সক্রিয় প্রতিরোধের আর তা করতে গেলে প্রথমেই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে রাজনৈতিক ভাবে জাগ্রত করে তাদের নেতৃত্বে উত্তীর্ণ করতে হবে এই প্রতিরোধ সংগ্রামের। 

খাদ্যের দাবি, কর্ম সংস্থানের দাবি, কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্যের দাবি, শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন ₹১৮,০০০ করার দাবি, শিক্ষা খাতে জিডিপি’র ১০% বরাদ্দ করার দাবি, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা কে ঢেলে সাজিয়ে জনগণ কে বিনামূল্যে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা দেওয়ার দাবি, দলিত-আদিবাসী-মুসলিম-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষদের সমান অধিকার ও বৈষম্যহীন সুযোগের দাবি তুলে আজ জনগণ কে তাদের শত্রু মোদী ও তাঁর নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টেনে আনতেই হবে। একমাত্র শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি জনতার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই পারবে মানুষের জীবন কে যুদ্ধের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে ও ভারতবর্ষের মাটিতে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ কে কবর দিতে। তাই বিলম্ব না করেই বাস্তবের মাটিতে এই লড়াইয়ে মানুষের শত্রু কে পরাস্ত করতে এগিয়ে আসুন, জনতার সাথে একাত্ম হোন আর প্রতিরোধের  রাজনীতি দিয়ে তাদের সৃজনীশক্তি’র বিকাশ ঘটান। 


পুরুলিয়ায় বিজেপি কর্মীদের হত্যা কি সংঘ পরিবারের স্বার্থে?



সম্প্রতি, পুরুলিয়া জেলায় দুই বিজেপি কর্মীর দেহ কিছুদিনের ব্যবধানে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে এবং তারপর থেকেই রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা অবনতির ও তৃণমূলের হিংসাত্মক রাজনীতির প্রসঙ্গ তুলে বিজেপি ও সংঘ পরিবার বাজার গরম করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও পুরুলিয়া পুলিশের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুসারে দ্বিতীয় মৃত ব্যক্তি, দুলাল কুমার (৩০), আত্মহত্যা করেছেন, তবুও রাজ্য সরকার এই মৃত্যুর তদন্তের ভাঁড় সিআইডি’র হাতে তুলে দিয়েছে। বিজেপির নিশানার তীর তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে আর তৃণমূলের নিশানার তীর বিজেপি থেকে মাওবাদী, প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই।  পুরুলিয়া জেলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস গো হারা হারায় মমতা বন্দোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দোপাধ্যায় জেলাকে বিরোধী শূন্য করতে চান বলে বিজেপির অভিযোগ। 

কয়েকদিনের ব্যবধানে সংগঠিত এই জোড়া মৃত্যু বাংলার জনমানসে বিজেপির পক্ষে কতটা সহানুভূতির জোয়ার এনে দেবে তা বিতর্কের বিষয়, কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য যে এত সরল ভাবে সমাধান হবে তা কিন্তু যে কোন সমালোচক সাংবাদিকের পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টকর। বিজেপির অভিযোগ নিঃশর্ত ভাবে মেনে নেওয়া অনেকটা হয়ে যাবে রাষ্ট্রের হাতে খুন হওয়া মানুষেরা এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ারে মরেছে সেটা স্বীকার করে নেওয়ার মতন। 

বিজেপি এই রাজ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিদ্বন্ধি হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস কে আজ টেক্কা দিতে পারছে তার কৃতিত্ব যেমন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দ্বারা ১৯৯৮ সালে বিজেপি কে খাল কেটে বাংলায় ঢুকতে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে দেওয়ার ঘটনায় নিহিত, ঠিক তেমনি, অধঃপতিত সংশোধনবাদী সংসদীয় বামপন্থী দলগুলির, যাদের পান্ডা হলো সিপিএম, তাদেরও চরম দেউলিয়াপনা ও অক্ষমতায় নিহিত। 

রাজনৈতিক হিংসার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখা ও বিরোধীদের নিকেশ করে দেওয়ার রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস পার্টি ১৯৫০ এর দশকে আমদানি করেছিল কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে, শ্রমিক ও কৃষকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্যে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতা দখল করতে পারে কারণ ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর পদলেহী শ্বাপদ সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের সরকার যে নৃশংস তান্ডব লীলা পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭২ থেকে চালিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে নকশালপন্থীদের প্রতিরোধ সংগ্রাম ও বন্দিমুক্তি সংগ্রামের লাভটা জ্যোতি বোস ও সিপিএম সেদিন নেপোয় মারে দই করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পেরেছিল বলে। ঠিক তেমনি, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ সালে বামফ্রন্টের সামাজিক-ফ্যাসিবাদী শাসন কে উচ্ছেদ করে এক প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিবাদী সরকার গঠন করতে পেরেছিল কারণ মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ও মাওবাদীদের সাহায্যে তৃণমূল কংগ্রেস সিপিএমের হার্মাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম থেকে লালগড়ের নানা প্রান্তে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিল এবং তার ফলে একটি চরম দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল দল হওয়া সত্বেও তৃণমূল মানুষের কাছে নিজেদের একটি প্রতিবাদী ও প্রতিরোধী ভাবমূর্তি গড়ে সমর্থন কুড়োতে পেরেছিল। আজ বিজেপি ঠিক সেই পথেই চলে, সিপিএমের খালি করে যাওয়া ময়দানে সিপিএমের প্রাক্তন কর্মী ও সমর্থকদের সমর্থনে বলীয়ান হয়ে তৃণমূলের নৃশংস সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারছে। 

এখানে বিজেপি যে শুধু হিন্দুদের সমর্থন আদায় করছে তাই নয়, ২০১৪ সালে সমগ্র বীরভূমের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে বিজেপি নিজের সংগঠন কে শক্ত করে গড়ে তোলে এবং সেই সংগঠনের উপর ভর করে দুধ কুমার মন্ডলের মতন জোতদার অনুব্রত’র (কেষ্ট) মতন সাংঘাতিক সন্ত্রাসবাদীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে জমি দখলের। এই রাজায় রাজায় যুদ্ধে যে অসংখ্য উলুখাগড়ার প্রাণ যায় তাঁদের অধিকাংশই কিন্তু সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নয়তো আদিবাসী বা নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের গরিব মানুষ। ঠিক কেশপুরের মতন আজ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের ক্ষমতা ধরে রাখার ও বিজেপির ক্ষমতা দখল করার হিংসাত্মক সংঘর্ষ চলছে। এরই মধ্যে, পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে তীব্র হিংসা কে উপেক্ষা করেও বিজেপি যে পুরুলিয়া দখল করতে পেরেছে তার শ্রেয় কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে দিন দিন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বেড়ে চলা ক্ষোভ কে দিতে হয়। 

বীরভূম, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জুড়ে আজ বিজেপি গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে যাচ্ছে আরএসএস এর সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ক কে ব্যবহার করে এবং এই কাজে তৃণমূলের একটা বড় অংশই কিন্তু বিজেপি কে সাহায্য করছে রাতের আঁধারে। এই ধরুন বাঁকুড়ার তালডাংরার কথা, বিজেপি এখানে প্রবেশ করে ১৯৯৮ সালে তৃণমূলের কোলে চেপে আর আজ আরএসএস এর অসংখ্য সন্ত্রাসী শিবিরের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসবাদী ফৌজ খাড়া করেছে এবং তোলা আদায়, নারী পাচার থেকে বিভিন্ন বেআইনি কারবারে নিজের একচেটিয়া অধিকার কায়েম করে ফেলেছে । তৃণমূল এখানে বিজেপির সাথে রফা করে ফেলেছে আর কোথাও কোথাও অস্তিত্বের সঙ্কটে ধুঁকতে থাকা সিপিএম বিজেপির সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে লুটের বখরার উপর অধিকার কায়েম করতে। 

সিপিএম আজ কংগ্রেসের লেজুড় হয়ে যেটুকু অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছিল তাও আজ বিশ বাওঁ জলে এবং এর ফলে সিপিএমের কর্মীরা দলে দলে বিজেপিতে যোগ দিচ্ছে প্রাণ ও জমি বাঁচাতে। বর্তমানে যদি আবার বিধানসভা নির্বাচন হয় তাহলে সিপিএম পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রের থেকে ধুয়ে মুছে যাবে এবং বিজেপি তৃণমূলের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলার ঔদ্ধত্ব দেখাবে, এই কথা বলার জন্যে কোন বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দরকার পড়বে না, কারণ একথা আজ গ্রামের শিশুরা পর্যন্ত বলতে পারবে।  

এর মধ্যে যদি তৃণমূল কে নিজের ঘাঁটি ও ক্ষমতা বাঁচাতে হিংসায় জড়াতে হয়, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস কে রাতের অন্ধকার অবধি অপেক্ষা করতে হবে না, বরং দিনের আলোয়, ভাঙড়ের মতনই, যে কোন জায়গায় যে কোন ব্যক্তি কে হত্যা করার ক্ষমতা আজ মমতা বন্দোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের আছে। তৃণমূলের হিংসার সাথে সমগ্র রাজ্য পঞ্চায়েত নির্বাচনে পরিচিত হয়েছিল ভালো ভাবেই আর তাই বিজেপির দুই চুনো পুঁটি কে দিনের আলোয় নিকেশ করতে তৃণমূলের কোন বিশেষ সমস্যা হতো না। পুরুলিয়ার মতন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাউকে পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঠিক পরেই রাতের অন্ধকারে বাইকে করে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে খুন করে গাছে টাঙিয়ে মৃতের জামায় হুমকি লিখে আসার মতন বেদনাদায়ক পরিশ্রম তৃণমূলের হার্মাদ বাহিনী এই মুহূর্তে করবে এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হবে। 

বিগত দিনে, বামফ্রন্ট আমলে, পুরুলিয়ার ওই সকল অঞ্চলে মাওবাদীদের হাতে বেশ কিছু সিপিএম নেতা ও কর্মীর প্রাণ যায়, যার সাথে কিন্তু বর্তমানের বিজেপি কর্মীদের হত্যার কোন সাদৃশ্যতা খোঁজা শিশুসুলভ আচরণ হবে। মাওবাদীরা যাঁদের আজ অবধি খুন করেছে তাঁদের মৃতদেহের পাশে তাঁরা পোস্টার লিখে নিজেদের দ্বায়িত্ব স্বীকার করেছে এবং সেই পোস্টারগুলির নিচে মাওবাদীদের সাংগঠনিক পরিচয় থাকতো। নিজেদের নামে কাউকে হত্যা করতে মাওবাদীরা কুন্ঠিত বোধ করে না কারণ তাঁদের দল অনেক দিন ধরেই নিষিদ্ধ এবং নির্বাচনের কোন বালাই মাওবাদীদের নেই। যদিও মাওবাদীরা বর্তমানে পুরুলিয়ায় ফের নিজেদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তবুও এই দুই মৃত্যুর দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপানো যায়না, কারণ তাঁরা যদি এদের মেরেই থাকতো তাহলে সেই মৃত্যুর দায় নিয়ে প্রশাসনের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা আতঙ্কের স্রোত বইয়ে দিতে পারতো মাওবাদীরা।  

যদি তৃণমূল এবং মাওবাদীরা এই দুই জন কে না মেরে থাকে তাহলে কে এদের মারতে পারে? সিপিএম আর কংগ্রেসের এখন সাইনবোর্ডটুকুও পুরুলিয়া জেলায় নেই। তৃণমূলের সন্ত্রাসে এই দলগুলির অস্তিত্ব অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। তবে যে দলের শক্তি এই মুহূর্তে পুরুলিয়ায় বেড়েছে তা হলো বিজেপির এবং এর সাথে সাথে আরএসএস এর। নিজ দলের লোক কে কোরবানির পাঁঠা বানানো বিজেপির কাছে নতুন কিছু না। হরেন পান্ড্যা থেকে গোপীনাথ মুন্ডে, দীনদয়াল উপাধ্যায় থেকে প্রমোদ মহাজন, যখন যাকে খরচের খাতায় ফেলার দরকার বিজেপি বা আরএসএস এর হয়েছে তখন সেই মরেছে কোন না কোন আততায়ীর হাতে, দোষটা অবশ্যই অন্য কারুর উপরে চাপানো হয়েছে। এত বড় বড় মহীরুহ যাঁরা কেটে ফেলতে পারে অবলীলায়, তাঁরা যে দুটি নটে গাছ মাড়িয়ে দেবে না সে কথা শিশুও বিশ্বাস করবে না। 

সম্প্রতি, পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে, নিজের পক্ষে সমর্থনের জোয়ার আনতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের দরকার হয়ে পড়ে বিজেপির এবং তাই পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য এলাকার মতন পুরুলিয়াতেও রাম নবমীর মতন অবাঙালি, উত্তর ভারতীয় উৎসব কে ঘিরে দাঙ্গার আগুন লাগায় সংঘ পরিবার। এই কাজে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে বজরং দলের জেলা নেতা ও বিজেপির যুব নেতা গৌরাব সিংহ, যে আবার প্রাক্তন এসএফআই কর্মী। তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে মানুষে মানুষে ঘৃণা ছড়াতে ওস্তাদ গৌরাব সিংহ, পুরুলিয়ার রাম নবমীর দিনে সশস্ত্র মিছিলের মাধ্যমে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গার আগুন জ্বালায় এবং এই হিংসায় এক মুসলিম যুবকের মৃত্যু হয় বজরং দলের কর্মীদের আক্রমণে। হিন্দি-ভাষী উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় আরএসএস নেতাদের ভাড়াটে গুন্ডা হিসেবে গৌরাব সিংহ ইতিমধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছে জমির দালালি থেকে নানা অপরাধে সামিল হয়ে। এহেন গৌরাব সিংহ গ্রেপ্তার হওয়ায় তাঁর স্বরূপ যাতে জনগণের সামনে না আসে, পুরুলিয়ার থেকে বিজেপির নারী পাচার থেকে মাদক পাচারের মতন অপরাধের হিসেব যাতে জনগণ বা দেশের মানুষ না জানতে পারেন, তাই হয়তো হঠাৎ দুটি মৃতদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেল। 

বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কিন্তু এই ঝুলন্ত দেহ পাওয়ার পর থেকেই নিজেদের প্রচার কে তুঙ্গে নিয়ে গেছে এবং তৃণমূলের সাথে সাথে শ্রমজীবি মানুষের স্বার্থে আন্দোলন করা, দলিত ও আদিবাসী জনগণের স্বার্থে কথা বলা শক্তিগুলি কে নিজেদের আক্রমণের নিশানা বানিয়েছে। আসানসোলে মার্চ মাসে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাবার হোতা, সুপ্রিয় বড়াল ওরফে বাবুল সুপ্রিয় কিন্তু সোজা আক্রমণ সেঁধেছে বামপন্থীদের উপর এই বলে যে বিজেপির দলিত ও আদিবাসী কর্মী হত্যার বিরুদ্ধে তাঁরা কেন প্রতিবাদ করছেন না। বিজেপি বলছে যে তাঁদের কর্মীদের উপর আক্রমণ আসলে ফ্যাসিবাদ এবং এর প্রতিবাদ সকল বাম ও গণতান্ত্রিক মানুষদের করা উচিত। 

হয়তো বাবুল সুপ্রিয়ের মনে নেই যে বিজেপি বা আরএসএস এর নেতৃত্বাধীন কোন সংগঠনে যোগ দেওয়ার সাথে সাথে দলিত ও আদিবাসী সমাজের কিছু দলছুট মানুষ সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর পদাতিক বাহিনীর সদস্য হয়ে ওঠে। তাঁরা যে শুধু মুসলিম বা খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক আক্রমণ চালায় তাই নয়, বরং অন্যান্য দলিত ও আদিবাসীদের বিরুদ্ধেও তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, যেমন টাটা ও বেদান্তের পয়সায় পরিচালিত হওয়া ছত্তিশগড়ের সালোয়া জুডুম এর খুনি সন্ত্রাসীরা সকলেই কিন্তু আদিবাসী সমাজ থেকে আগত আরএসএস এর সস্তা পদাতিক ছিল। তাই যে আদিবাসী বা দলিত আরএসএস সন্ত্রাসী হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের ঝান্ডা উত্তোলন করার জন্যে প্রাণ দেয়, তাঁদের সাথে শোষিত, নিপীড়িত ও অত্যাচারিত দলিত ও আদিবাসীদের কোন সম্পর্ক থাকে না। ফলে সেই গেরুয়া বাহিনীর কাছে বিকিয়ে যাওয়া আদিবাসী বা দলিতের স্বার্থের সাথে সমগ্র আদিবাসী ও দলিতদের স্বার্থের কোন সম্পর্ক থাকে না এবং তাই কোন গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল শক্তি এহেন মৃতদের পক্ষে আন্দোলন করে না। 

বিজেপির পক্ষে খরচের যোগ্য যে কোন আদিবাসী বা দলিত কর্মী কে আরএসএস এর দক্ষ সন্ত্রাসবাদীদের দিয়ে খুন করিয়ে গাছে টাঙিয়ে, ভাঙা ভাঙা বাংলা বক্তব্য লিখে একটা সেনসেশন ছড়ানো সংঘ পরিবারের পক্ষে কোন বড় ব্যাপার নয়। পুরুলিয়ার সাথে, পুরুলিয়ার আদিবাসী সমাজের সাথে বিজেপির কোন প্রত্যক্ষ বা আবেগের সম্পর্ক নেই। পুরুলিয়ার দরিদ্র মানুষ কি ভাবে দিন কাটান, কি ভাবে আদিবাসী জনগণ সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিন মাত্র ভাত খেয়ে বাস করেন, তা নিয়ে বিজেপির কোন মাথা ব্যাথা নেই। বিজেপির কাছে পুরুলিয়ার প্রয়োজনীয়তা হলো নকশালপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার জন্যে, সমস্ত জোতদার ও জমিদারদের নিজের নেতৃত্বে নিয়ে আসার জন্যে এবং অসংখ্য আদিবাসী যুবকদের টাকা, মদ ও মহিলার প্রলোভন দেখিয়ে আরএসএস এর সন্ত্রাসী বানিয়ে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে পদাতিক বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে। 

বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গের থেকে বামপন্থার রেশটুকু, শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের রেশটুকু শেষ করে দিয়ে শুধু মাত্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে নিজের পালে জোর হাওয়া টেনে প্রধান বিরোধী দল হতে চায়। মমতা বন্দোপাধ্যায় এবং কংগ্রেস পার্টিও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ভারতের যে কোন রাজ্যের মতন শুধু দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ময়দান হওয়ার পক্ষপাতী। অন্যদিকে অস্তিত্বের সঙ্কটে হতাশ সামাজিক-ফ্যাসিবাদী সিপিএম ও অন্যান্য সংসদীয় বাম দলগুলির সুবিধাবাদের পাঁকে ডুবে শেষ হয়ে যাওয়া দেখে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের মধ্যেই বামপন্থা নিয়ে এক বিরূপ মনোভাবের জন্ম হয়েছে। এই সঙ্কট কালে কোন বিপ্লবী বামপন্থী শক্তির শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি জনতার মধ্যে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত প্রচার আন্দোলনের অভাবে, লেগে পড়ে থেকে তৃণমূলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনগণ কে, বিশেষ করে দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের, আদিবাসী জনগণকে ও নমঃশূদ্র মানুষদের জাগিয়ে না তোলার ফলে আজ হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী শক্তি ও ইসলামিক মৌলবাদী শক্তি গ্রামাঞ্চলে প্রশ্রয় পেয়ে নিজেদের দুর্গ গড়ে তুলছে। 

আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়ার জন্যে বিজেপি ও আরএসএস অনেক রক্ত বইয়ে দিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দি-ভাষী অঞ্চলগুলোয় কি ভাবে উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খন্ড এবং বিহার থেকে গুন্ডা বাহিনী এনে দাঙ্গা লাগিয়ে মেরুকরণ চালাচ্ছে বিজেপি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ আসানসোল ও রানিগঞ্জের রাম নবমীর উপলক্ষ্যে লাগানো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আজ এই ঘৃণার বীজ কে আরএসএস বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে আদিবাসী অঞ্চলে রোপন করছে এবং এখনই এদের কে প্রতিরোধ করে পরাস্ত না করতে পারলে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে এমন বিষবৃক্ষ ফলে উঠবে যা আমাদের ভবিষ্যৎ কে বিষ বাতাসে ভরিয়ে দেবে এবং হিংসা ও মৃত্যুর ঘৃণ্য তান্ডব এই বাংলার পরিচয় উঠবে। হয় আমাদের আজ বাংলার ভবিষ্যতের জন্যে রুখে দাঁড়াতে হবে আর না হয় হিন্দি-ভাষী হিন্দুত্বের ধ্বজ্জাধারীদের পদদলিত হয়ে চিরকাল বাস করতে হবে।   


মোদী রাজত্বে ক্রোনি কর্পোরেট শাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ হোক বিকল্প গণমাধ্যম

নরেন্দ্র মোদী ও গৌতম আদানি ক্রোনি পুঁজিবাদ


বেশ কিছুদিন ধরে  ভারতের হিন্দি ও ইংরাজী ভাষার টিভি চ্যানেলগুলো ও পত্রপত্রিকাগুলো বেশ ঘটা করে গুরমিত রাম রহিম ইনসান নামক ভন্ড বাবাজির তথাকথিত পালিতা কন্যা এবং আদতে গুপ্ত গার্লফ্রেন্ড হানিপ্রীত ইনসান কে নিয়ে ভীষণ ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে আর আমাদের পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী সংবাদ মাধ্যম হয় শারদোৎসব আর না হয় মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ প্রচারে ব্যস্ত। কেউ নরেন্দ্র মোদী কে মেপে মেপে সমালোচনা করছে তো কেউ বলছে নরেন্দ্র মোদীর উচিত আরও জোরে তাঁর তথাকথিত সংস্কারের রথ চালানো।
এরই মধ্যে  একটা ভীষণ চাঞ্চল্যজনক ঘটনা ঘটে গেল, যার নৈপথ্যে কিন্তু আবার একটি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় পুঁজির মালিকানাধীন সংবাদ মাধ্যম। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি মালিকানাধীন সংবাদ মাধ্যম এবিসি’র ফোর্থ কর্নার অনুষ্ঠানে সম্প্রতি প্রসারিত হলো একটি অনবদ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দ্বারা উত্তোলিত তথ্যে পরিপূর্ণ তথ্যচিত্র, যাঁর মূল বিষয় ছিল ভারতের বৃহৎ মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি গৌতম আদানি’র দুর্নীতিপূর্ণ ব্যবসা এবং আদানি গোষ্ঠীর দ্বারা দেশে বিদেশে কালো টাকার চোরাকারবার। উল্লেখনীয় ব্যাপার হলো যে নরেন্দ্র মোদী, তাঁর পার্টি বিজেপি ও তার ভাবাদর্শের উৎস, আরএসএস, কিন্তু আদানি গোষ্ঠীর নিমক খেয়ে তার সেবা করে এবং সমস্ত রকম প্রচলিত আইনের হাত থেকে আদানি গোষ্ঠী’র স্বার্থ কে রক্ষা করে। এহেন মোদী-শাসিত ভারতবর্ষের বুকে আদানি গোষ্ঠীর সমালোচনা করা বা নিন্দা করা বেসরকারি ভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। হঠাৎ সমালোচক কে দিনের আলোয় আততায়ীর হাতে গুলি খেতে হতে পারে বা হঠাৎ আদানির উকিল কোটি কোটি টাকার মানহানির মামলা করার ভয় দেখিয়ে চিঠি পাঠাতে পারে সমালোচনাকারী সংবাদ মাধ্যমের দফতরে। ঠিক যেমন প্রখ্যাত পত্রিকা ইকোনমিক এন্ড পলিটিকাল উইকলি কে ধমকানো হয়, যার ফলে চাকরি হারান আদানি গোষ্ঠীর নানা দুর্নীতির তদন্তকারী ও কট্টর সমালোচক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা। এবিসি ভারতে অবস্থিত নয় এবং ভারতের থেকে তাঁদের আয় প্রায় নগন্য ফলে তাঁদের পক্ষে যে ভাবে সাহসিকতার সাথে গৌতম আদানি ও তাঁর আপাদমস্তক দুর্নীতি ও কালো কারবারে ডুবে থাকা আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তদন্ত করে একটি দুর্দান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা সম্ভব হলো, আদানির বিজ্ঞাপনের থেকে টাকা আয় করা এবং গৌতম আদানির জুতো চাটা দেশি দালাল সংবাদ মাধ্যমগুলোর সেই সাধ্য হতো না।

আদানি গোষ্ঠীর উৎপত্তি গৌতম আদানি ও তাঁর সিঙ্গাপুর স্থিত ভাইয়ের হাত ধরে। আম্বানি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা ধীরুভাই আম্বানির মতনই গৌতম আদানি নিরামিষাশী এক গুজরাটি বেনিয়া, যাঁর উত্থান শুরু হয় গুজরাটে বিজেপি শাসন শুরুর সাথে সাথে। কলেজ-ছুট এক বেনিয়া গুজরাটি তাঁর শেষ সম্বল দিয়ে ফাটকা খেলা শুরু করে হিরের ব্যবসায় ও পরবর্তী কালে নয়া-উদার অর্থনৈতিক হাওয়ায় ভেসে প্রবেশ করে গুজরাটের ক্রোনি পুঁজিবাদের শিবিরে। ক্রোনি পুঁজিবাদ আসলে মুৎসুদ্দি ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের দেশ ভারতের একটি বহুল প্রচলিত ব্যবস্থা যার মূল হলো শাসক রাজনৈতিক দলগুলি ও প্রশাসন বা আমলাতন্ত্র কে পকেটস্থ করে নিজের ব্যবসা কে প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি লাভজনক অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করা। গৌতম আদানির বন্দর, তাপ বিদ্যুৎ, খনিজ সম্পদ উত্তোলন, বা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের ব্যবসাগুলো বিগত দুই দশকে তীব্র গতিতে বেড়ে দেশের প্রথম সারিতে চলে আসে দুইটি প্রধান কারণে। প্রথমতঃ গৌতম আদানি ঘুষ দিতে কার্পণ্য করেনি আর দ্বিতীয়তঃ নরেন্দ্র মোদী’র মতন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর অকৃত্রিম অনুচর ও তল্পিবাহক হয়ে ওঠে। মোদীর শাসনকালে, গৌতম আদানির ব্যবসা যেমন ফুলে ফেঁপে ওঠে, তেমনি সমস্ত রকমের আইন কে জুতোয় পিষে সমগ্র গুজরাটে বিশাল আয়তনের জমি দখল করা আদানির পক্ষে জলভাত হয়ে যায়। আদানি গোষ্ঠী যত না তাঁদের বাণিজ্যের দ্বারা অর্থ আয় করেছে তার চেয়ে কয়েকশো গুণ বেশি করেছে দেশের কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশে টাকা পাচার করে। দেশের যে দালাল সংবাদ মাধ্যমগুলো নরেন্দ্র মোদীর দ্বারা ৫০০ ও ১,০০০ টাকার নোট বাতিলের স্বিদ্ধান্তে “কালো টাকা ধ্বংস হলো” বলে বিশ্রী রবে শিয়াল-চিৎকার জুড়েছিল তাদের কেউই কিন্তু আদানির দ্বারা কর ফাঁকি দিয়ে কেইম্যান আইল্যান্ড বা ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড এর মতন কর-হীন দেশে নিজেদের জাল কোম্পানির একাউন্টে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা নিয়ে কিন্তু টু শব্দটি করেনি।

ভারতের মতন দেশে গৌতম আদানির আদানি গোষ্ঠী বা ধীরুভাই আম্বানির রিলায়েন্স গোষ্ঠী (এখন দুই ভাগে বিভক্ত) ইত্যাদির পক্ষে বৃহৎ পুঁজির কারবারি হয়ে ওঠার পিছনে লুকিয়ে থাকে চূড়ান্ত দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর (সকল রঙের) চরম কর্পোরেট দালালি। শুধু মোটা অঙ্কের ঘুষ রাজনৈতিক পার্টিগুলিকে ও আমলাতন্ত্র কে দিয়ে এই ক্রোনি পুঁজিবাদীরা শুধু যে নিজেদের জন্যে সমস্ত আইন শিথিল করিয়ে ব্যবসায় শ্রীবৃদ্ধি এনেছে তাই নয়, এদের বিরামহীন ব্যবসায়িক অভিযানে, বড় তাপ বিদ্যুৎ, পেট্রো-কেমিকেল বা বন্দরের ব্যবসায় দেশের পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ও জনগণের, গরিব খেটে খাওয়া জনগণের ব্যাপক আর্থ-সামাজিক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ঘুষে কুকুর কেও বাপ বলায়। তাই হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়েও আদানি গোষ্ঠী ভারতে কলার তুলে ব্যবসা করতে পারে কারণ আরএসএস ও সমগ্র হিন্দুত্ব শিবির এই নিরামিষাশী গুজরাটি মুৎসুদ্দি বেনিয়ার স্বার্থ কে রক্ষা করার পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে। আজ যে গুজরাটের ভুঁয়ো উন্নয়নের ছেলে ভোলানো গল্প শুনিয়ে নরেন্দ্র মোদী কে হিরো সাজানোর চেষ্টা চালায় ভারতের কর্পোরেট টাকায় চলা মূলধারার সংবাদ মাধ্যম, সেই গুজরাটের সিংহভাগ বন্দর ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কিন্তু আদানির, আর আদানি টাকা তুলেছে শেয়ার মার্কেট থেকে, সেই শেয়ার মার্কেটে টাকা এসেছে বিদেশী একচেটিয়া পুঁজির পুতুল লগ্নিকারী বা এফআইআই’র মাধ্যমে এবং এই সকল প্রকল্পগুলো গড়ে উঠেছে পরিবেশ কে ধ্বংস করে এবং গরিব জনগণের জীবন ও জীবিকা কে লাথি মেরে। এক একটা জায়গায় আদানি গোষ্ঠী ব্যবসা করার ফলে সৃষ্ট হয়েছে অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক এবং আর্থ-সামাজিক সঙ্কট। এবিসির অনুসন্ধানী রিপোর্টে দেখা গেল যে কি ভাবে বিজেপি’র সমর্থনে বলীয়ান হয়ে সমস্ত রকমের পরিবেশ সম্পর্কিত আইন কে কাঁচকলা দেখিয়ে এবং বিভিন্ন ধরণের সামাজিক প্রতিরক্ষার আইন উল্লঙ্ঘন করে গৌতম আদানি তাঁর সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। দেখা গেল গোয়ার ভাস্কো দা গামায় কয়লা উত্তোলনের নামে কি ভাবে পরিবেশ ও জনসাধারণের ক্ষতি করেছে আদানি গোষ্ঠী, দেখা গেলো কর্ণাটকে কি ভাবে লাভের টাকা চুষে নিয়ে একটি এলাকার পরিবেশ ও অর্থনীতি কে বিশ বাঁও পানিতে ফেলে উধাও হয়ে গেল আদানি গোষ্ঠী, দেখানো হলো কি ভাবে গৌতম আদানির পাহারাদার সেজে ক্রাইম ব্রাঞ্চের পুলিশ অফিসাররা নেড়ির মতন তেড়ে এলো অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিকদের গুজরাট থেকে তাড়িয়ে দিতে, রীতিমত খুনের হুমকি দিয়ে। যে রাজ্যের প্রাক্তন গৃহমন্ত্রী দলীয় কোন্দলে খুন হয়ে যান আর অন্য এক প্রাক্তন গৃহমন্ত্রী একের পর এক ভুঁয়ো এনকাউন্টারে মুসলমানদের নিজ স্বার্থে ও বিজেপিকে ভোটে জেতানোর স্বার্থে খুন করিয়েও আইন কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বহাল তবিয়তে দেশের শাসক দলের প্রধান হয়ে জনগণের করের টাকায় সরকারি নিরাপত্তার ঘেরাটোপে বাস করে, সেই রাজ্যে স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের লোকেদের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যে আদানি কে বাঁচাতে হিংস্র হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে তা বলার জন্যে বিশেষ কোন গবেষণা করার দরকার পরে না। সাহেবের রাজ্যে আদানি’র সাম্রাজ্য অক্ষত রাখতে সদা প্রস্তুত হিন্দুত্ববাদী শিবির ও তার রাষ্ট্র যন্ত্র।

অস্ট্রেলিয়া থেকে এবিসি হঠাৎ এমনি এমনি আদানি গোষ্ঠীর কালো ইতিহাস কে খুঁড়ে বের করতে আসেনি, বরং অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী ও সমস্ত বড় রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় পুঁজিপতিদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে গৌতম আদানি যে বৃহৎ এলাকা জুড়ে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় কয়লা খনি গড়ে কয়লা উত্তোলন করতে চায় এবং সমস্ত অঞ্চলের ভূ গর্ভস্থ পানি চুষে এলাকাটি কে মানুষ, পশু পাখির বাসের অযোগ্য মরুভূমিতে পরিণত করতে চায় তার বিরুদ্ধে সমগ্র অস্ট্রেলিয়া জুড়ে গড়ে উঠেছে তীব্র গণআন্দোলন এবং সেই আন্দোলনের চাপে পড়ে (মনে রাখতে হবে অস্ট্রেলিয়া সাদা চামড়ার মানুষের দেশ, কালো চামড়ার মানুষের নয়) বড় বড় ব্যাঙ্কগুলি আদানির প্রকল্পে অর্থ লগ্নি করার থেকে পিছু হঠে এবং এর ফলে অস্ট্রেলিয়া’র আদানি দালাল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ভীষণ মুশকিলে পড়ে। কারণ তাঁরা এর মধ্যেই কোটি কোটি ডলার উপঢৌকন পেয়েছে গৌতম আদানির থেকে, সেই জন্যে তাঁরা খনন কার্য শুরু হলে প্রচুর কর্মসংস্থান হবে বলে জনগণের করের টাকা দিয়ে আদানির জন্যে পরিকাঠামো বানাতে উঠে পড়ে লেগেছে, এটা জেনেও যে তাঁদের এই কর্মকান্ডে অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ ও জনগণের জীবন ও জীবিকার অভূতপূর্ব ও অপূরণীয় ক্ষতি হবে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ওয়ানগান ও জাগলিংও জনগণ এই খনির বিরুদ্ধে তাঁদের মত দিয়েছেন এবং জমি দিতে অস্বীকার করেছেন, তবে আদানির থেকে কোটি কোটি ডলার ঘুষ খাওয়া রাজনৈতিক নেতারা সেই জমি কেড়ে নিতে আজ বদ্ধপরিকর। #Stop Adani নামক এই সংগ্রামের সাথী হয়ে জনগণের শত্রু আদানি গোষ্ঠীর স্বরূপ অস্ট্রেলিয়ার ব্যাপক মানুষের সামনে তুলে ধরতে এবিসি কর্পোরেশনের মতন রাষ্ট্রীয় পুঁজিতে চলা সংবাদ সংস্থা আদানির বিরুদ্ধে কোমর কষে নেমেছে এবং এক তথ্যসম্পূর্ণ রিপোর্ট জনসমক্ষে তুলে ধরেছে। রাষ্ট্রীয় পুঁজিতে চলা এই সংবাদ মাধ্যমের এই সমালোচনামূলক রিপোর্টিং সম্ভব হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার শাসক শ্রেণীর মধ্যে অন্তর্দ্বন্ধের কারণেই। এক মিনিটের জন্যে ভাবুন পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ ধ্বংসকারী ভাঙ্গর প্রকল্প, কৃষি-বিরোধী ন্যানো কারখানা বা নন্দীগ্রামের অদূরে সালেম গোষ্ঠীর প্রকল্পের বিরুদ্ধে কি আনন্দবাজার গোষ্ঠী (যারা একদিকে মোদী বিরোধিতার সুর চড়ায় আনন্দবাজার পত্রিকা বা দি টেলিগ্রাফে আর অন্যদিকে কাঞ্চন গুপ্ত বা জয়ন্ত ঘোষালের মতন হিন্দুত্বের ধ্বজ্জাধারী ইজরায়েলি দালালদের চাকরিতে রাখে) কোনদিন মুখ খুলতে পারতো? আরে আনন্দবাজার বা অন্য বাজারি কাগজ তো দূরের কথা আমাদের সিপিএমের মুখপত্র গণশক্তির ২০০৭-০৮ এর সংখ্যাগুলো যদি পড়েন তাহলে দেখবেন মনে হবে টাটা বা সালেমের মুখপত্র পড়ছেন। শুধু বিজেপির বিরুদ্ধে কামান দেগে তেমন লাভ হবে না, কারণ বিজেপি বর্তমানে যা করছে তার পিছনে যদি সিপিএম বা কংগ্রেসের মতন দলগুলোর সুপ্ত সমর্থন না থাকতো তাহলে ভারতবর্ষ কর্পোরেট লুঠের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হতে পারতো না। ভারতের রাজনীতি ও সংবাদ মাধ্যমের দুনিয়ার তাবড় সব খেলোয়াড় বর্তমানে আদানি আর আম্বানিদের হয়ে খেপ খেলছে এবং তাই আপনি এদের আক্রমণের নিশানায় কখনো কর্পোরেট পুঁজি কে পড়তে দেখবেন না, বরং এদের কাছে শুনবেন আদানি বা আম্বানিদের স্তুতি, তাঁদের কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি  (সিএসআর) প্রকল্পগুলি কি ভাবে সমাজের উন্নয়ন (বা সমাজের উন্নয়নের নামে কর ফাঁকি দেওয়ার ভাঁওতাবাজি) করছে, তার ফিরিস্তি। স্বাধীন দেশের বুর্জোয়া সংবাদ মাধ্যম ও নয়া ঔপনিবেশিক দেশের বুর্জোয়া সংবাদ মাধ্যমের মধ্যে এই হলো ফারাক।

ভারতের সমস্যার দুটো বড় দিক হলো, এক, এই দেশে কখনো পুঁজিবাদী বিপ্লব সামন্তবাদ ও ঔপনিবেশিক শাসন কে উৎখাত করেনি, এবং দুই, এই দেশের বৃহৎ পুঁজির মালিকদের কেউই জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি নন, বরং মুৎসুদ্দি বেনিয়া সম্প্রদায়ের লোক যাঁরা বিদেশী পুঁজির কাছে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা রেখেছে নিজেদের, কখনো পুঁজির জন্যে তো কখনো প্রযুক্তির জন্যে। বিদেশী পুঁজি কে পরাস্ত করে নিজের শক্তিতে একটি শক্তিশালী বৃহৎ পুঁজিবাদী শক্তি হয়ে ওঠার কোন প্রবণতা ভারতের পুঁজিপতিরা দেখায়নি, বরং উদার অর্থনীতির সাহায্যে, বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ও বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক লগ্নিকারীদের অর্থে বলীয়ান হয়ে নিজেদের কর্পোরেট সংস্থাগুলোর বিদেশে সম্প্রসারণ ঘটানো শুরু করে টাটা-আম্বানি-আদানি জাতীয় সকল মুৎসুদ্দি পুঁজির মালিকেরা। এরা চরম ভাবে বিদেশী পুঁজির দালাল এবং এরা কোন ভাবেই বিশ্বের কোথাও নিজেদের অস্তিত্ব বৃহৎ বিদেশী একচেটিয়া ও লগ্নি পুঁজির সাহায্য বাদে টিকিয়ে রাখতে পারবে না, এবং মূলত বেনিয়া পুঁজির মালিক এই সংস্থাগুলো ভারতকে শিল্পে স্বনির্ভর করে তুলতে চিরকালই অপারগ থাকবে। ভারতের এই বৃহৎ মুৎসুদ্দি পুঁজির মালিকদের ঢাল করে বৃহৎ বিদেশী একচেটিয়া ও লগ্নি পুঁজির মালিকেরা প্রায় দেশের সকল ক্ষেত্রে বিপুল পরিমানের অর্থ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লগ্নি করেছে এবং কোটি কোটি ডলার প্রতিদিন দেশের মাটির থেকে শুষে নিংড়ে নিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে। আদানি আর আম্বানির মতন দালাল পুঁজির মালিকেরা নিজেদের কমিশন কামিয়ে অট্টালিকা বানিয়ে নিজেদের ধন বৃদ্ধি জাহির করছে এবং রাষ্ট্র যন্ত্রের একটি সামান্য আলপিন থেকে সিংহাসনে আসীন মহারাজ কে কিনে পকেটে ভরে রেখেছে। যেহেতু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাল থেকে ভারতের সংবাদ মাধ্যমের উপর একচেটিয়া মালিকানা কায়েম করেছে এই মুৎসুদ্দি বেনিয়া পুঁজিপতিরা এবং যেহেতু এদের পুঁজি ও রাষ্ট্রের সাথে দহরম মহরমের ফলে এরা ছোট এবং মাঝারি সংবাদ মাধ্যমগুলো কে গ্রাস করে ফেলে, তাই এই দেশে মূলধারার সংবাদ মাধ্যমে স্বাধীন সাংবাদিকতার লেশমাত্র উপস্থিত, এই কল্পনা করাও ঘোর অন্যায় হবে। বিদেশী একচেটিয়া ও লগ্নি পুঁজি আজ আম্বানি বা আদানিদের সাথে গাঁটছাড়া বেঁধে ভারতের শ্রম, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ লুঠ করছে এবং তার সাথে সাথে এই দেশের মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের একটা বড় অংশ কে কিনে নিয়ে নিজেদের কর্মকান্ড কে সাধুবাদ দিয়ে জনগণ কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই আম্বানি-আদানিরা আবার বিশাল টাকা দিয়ে, ব্যক্তিগত বিমান দিয়ে, জমি আর শেয়ার দিয়ে নরেন্দ্র মোদী ও আরএসএস এর মতন ঘৃণ্য হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের নিজেদের দারোয়ান হিসেবে পুষছে, তাদের দিয়ে দেশের কোনায় কোনায় জনগণের ঐক্য ভাঙতে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার আগুন জ্বালাচ্ছে।  এই চরম ঘৃণ্য ব্যবস্থার স্বরূপটি জনগণের চোখের সামনে তুলে ধরতে আমাদের দেশের তথাকথিত স্বাধীন মিডিয়া অপারগ, কারণ বিজ্ঞাপনের বড় বালাই। তাই তারা মেতে আছে হানিপ্রীত সিংহে ও যৌবন ধরে রাখার টিপস দেওয়ায়।  

এখন আর খবরের উপর ভিত্তি করে সংবাদপত্র বিক্রি হয় না, বরং কাগজ ছাপার খরচ থেকে লাভের টাকা সবটাই আসে শুধু মাত্র বিজ্ঞাপন থেকে অর্জিত অর্থ থেকে। সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলগুলো এখন শুধু বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে এবং তার সাথে বিজ্ঞাপনদাতার স্বার্থ বিঘ্নিত হয়না এমন নিরীহ কাঁচি চালানো খবর বিনামূল্যে পাঠক বা দর্শকদের কাছে পরিবেশিত করে। তাই এই মূলধারার কর্পোরেট-মালিকানাধীন সংবাদ মাধ্যমগুলি ভারতের মানুষের কোন কল্যাণে আর আসতে পারবে না, ফলে আজ জনগণের কাছে সত্য সংবাদ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ তুলে ধরতে পারে শুধু মাত্র গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বিকল্প সংবাদ মাধ্যমগুলি, যেগুলি জনগণের চাঁদার টাকায় বা ছোট ব্যবসায়ীদের বিজ্ঞাপনের টাকায় নিজেদের প্রকাশনা চালায়। বিকল্প গণমাধ্যমআজ ভারতের দরকার, এই কঠিন পরিস্থিতিতে জনগণের একটি বিশেষ প্রয়োজন। শুধু আদানির মতন দেশের অর্থ বিদেশে পাচারকারী মুৎসুদ্দি বেনিয়াদের বিরুদ্ধেই নয়, বরং সামগ্রিক ভাবে ভারতের সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও সম্পর্কের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদের ঘৃণ্য শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবং বিদেশী একচেটিয়া ও লগ্নি পুঁজির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রামের অংশীদার হিসেবে আজ বিকল্প মিডিয়ার প্রয়োজন প্রচন্ড। সকল ধরণের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল জনগণ কে ঐক্যবদ্ধ করে, বিদেশী পুঁজি ও দেশি মুৎসুদ্দি পুঁজির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক বিরাট দেশপ্রেমী প্রচার মাধ্যম গড়ে তোলার জন্যে আজ সমস্ত ফ্যাসিবিরোধী ও গণতান্ত্রিক সাংবাদিকদের আজ একসাথে আসতে হবে, শুধু পয়সা রোজগারের আকঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং দেশের জনগণের সামনে দেশের আসল শত্রু, আদানি-আম্বানি-টাটা ইত্যাদির, মোদী আর আরএসএস এর মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্যে। আজ সময় হয়েছে আমাদের কলমগুলিকে তলোয়ারের ন্যায় ব্যবহার করার, মূলধারার কর্পোরেট-মালিকানাধীন সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বিকল্প গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার এবং এই সংগ্রামে আমরা যদি পিছিয়ে পড়ি, তাহলে ইতিহাস আমাদের কোনদিন ক্ষমা করবে না।
 


বাংলার মাটিতে দাঙ্গার চক্রান্ত চূর্ণ করতে ঐক্যবদ্ধ হোন



একটা সামান্য ফেসবুক পোস্ট থেকে যে ভয়াবহ ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা সমগ্র বাদুড়িয়ায় শুরু হলো এবং ক্রমেই পৌঁছে গেল বসিরহাট ও সংলগ্ন স্বরূপনগর, হিঙ্গলগঞ্জ, দেগঙ্গা ও হাসনাবাদ অঞ্চলে,  তা দেখে মনে হলো যে এই সাম্প্রদায়িক হিংসার জন্যে জমি প্রস্তুত করা হয়েছে অনেক আগে থেকেই। কারণ বিনা পরিকল্পনায় আর বিনা সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে এই ধরণের সংগঠিত হিংসা ও দাঙ্গা ছড়ানো অসম্ভব হয়ে যায়। সামগ্রিক ভাবে দেখতে গেলে একটা ফেসবুক শেয়ারের কয়েক ঘন্টার মধ্যে যে কাণ্ড গোটা বাদুড়িয়া অঞ্চলে হলো তার পিছনে রয়েছে গূঢ় অভিসন্ধি।

বসিরহাট-বাদুড়িয়া সাম্প্রদায়িক সংঘাতের কারণ কি ? কেন হঠাৎ তেঁতে উঠে এমন তীব্র হিংসায় সামিল হলো এই অঞ্চলের লোকেরা? কেন মমতা বন্দোপাধ্যায়ের প্রশাসন ও দাপুটে তৃণমূলী হার্মাদ বাহিনী আজ ব্যাকফুটে চলে গেল? কি ভাবে তপন ঘোষ - জিষ্ণু বোসের মতন হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা উত্তর চব্বিশ পরগনার মতন কৃষক আন্দোলনের জেলায় নিজেদের আধিপত্য একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সরকার ও তথাকথিত বাম ও প্রগতিশীল শক্তির অগোচরে প্রতিষ্ঠা করতে পারলো? আর হঠাৎ করেই কি, একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এই দাঙ্গা শুরু হলো? এর পিছনে কি কোন পরিকল্পনা বা সমন্বয় ছিল না ? যদি ছিল তাহলে কারা ছিল তার পিছনে? বিভিন্ন ধর্মীয় ও মৌলবাদী সংগঠনের এই দাঙ্গার পিছনে ভূমিকা কি ছিল? কেন পুলিশ নির্বাক দর্শক হয়ে বসিরহাট-বাদুড়িয়া কে জ্বলে যেতে দিল?


আপনি যদি বাংলা বা সর্ব ভারতীয় মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশন দেখেন, হিন্দুত্ববাদী পেটোয়া মিডিয়া কে বাদ দিয়েই, তবে দেখবেন সব জায়গায় দেখানো হচ্ছে যে এই দাঙ্গা একটি স্বতঃস্ফূর্ত দাঙ্গা আর এর না কোন পরিকল্পনা ছিল, না কোন লক্ষ্য ছিল। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত একটি দাঙ্গা এক জায়গার থেকে শুরু হয়েও অন্য জায়গায় এত তাড়াতাড়ি কি করে ছড়িয়ে পড়লো আর কেনই বা পুলিশ বা প্রশাসন আধা সামরিক বাহিনীর সমর্থনে এই দাঙ্গা কে দমন করতে পারলো না? যেমন ওরা দমন করেছিল লালগড়ের জনগণের ন্যায়সঙ্গত লড়াইকে বা ভাঙড়ের কৃষকদের আন্দোলন কে, ঠিক সেই ভাবে প্রশাসন কেন নখ দাঁত বের করে দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে কেন ঝাঁপিয়ে পড়লো না? কেন যে ভাবে লাঠি চার্জ করে কিছুদিন আগেই যেভাবে নবান্ন অভিযানকারী বামফ্রন্টের কর্মীদের ক্ষত বিক্ষত করেছিল মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পুলিশ বাহিনী সেই ভাবে লাঠি চার্জ করে দাঙ্গাবাজদের হাড় ভাঙতে পারলো না ?

আসলে বাদুড়িয়া-বসিরহাটের দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতটা মোটেই কোন স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন নয় বা শৌভিক সরকারের মতন এক কিশোরের ফেসবুক পোস্ট সংক্রান্ত নয়, আসলে এগুলো হলো উপলক্ষ, দাঙ্গার কারণ লুকিয়ে আছে অন্যত্রে, যা এক বৃহৎ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ এবং কিছুটা হলেও স্থানীয় দুর্নীতির সাথে যুক্ত।


বাদুড়িয়া-বসিরহাট দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিত



ইছামতি নদীর পাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে বছরের পর বছর এক সাথে বাস করেছেন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, যাঁদের বেশির ভাগই শ্রমজীবি মানুষ। উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐক্য কে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল কৃষকদের সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও শ্রমিক শ্রেণীর জঙ্গী আন্দোলন। এর ফলে অনেক চেষ্টা করেও গত শতাব্দীর ৬০ ও ৭০ এর দশকে এই অঞ্চলে কল্কে পায়নি সংঘ পরিবার বা অন্যান্য দাঙ্গাবাজ ফ্যাসিস্ট সংগঠনগুলো।

তবে ১৯৯০ এর  দশক থেকেই এই সমস্ত অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক বিভেদের পটভূমি তৈরি করা শুরু হয়, এবং আশ্চর্যজনক ভাবে সেইদিন এই বিভাজন সৃষ্টির হোতা কিন্তু ছিলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেস এর প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে তিনি বিজেপির হাত ধরেন এবং সর্ব ভারতীয় ক্ষেত্রে নিজ প্রভাব বিস্তারের স্বার্থে তিনি ও তাঁর পার্টি - তৃণমূল কংগ্রেস সেদিন কিন্তু আরএসএস ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সংগঠনগুলিকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।

তৃণমূলের সাথে গাঁটছাড়া বাঁধার কারণেই বিজেপির প্রথম বিধায়ক রাজ্য বিধানসভায় ১৯৯৯ সালে অশোকনগর উপনির্বাচন জিতে প্রবেশ করে। সেই সময়েই পশ্চিমবঙ্গের থেকে দুইজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয় বিজেপির আর রাজ্যে আস্ফালন বেড়ে চলে বিজেপির। যদিও বাম আমলে মুসলমানদের অবস্থা রাজ্যে ভীষণ করুন হয়, তবুও তৃণমূলের সাহায্যে সেই সময়ের থেকেই বিজেপি প্রচার করা শুরু  করে যে রাজ্যে মুসলমান তোষণ নাকি বেড়ে গেছে এবং হিন্দুদের থেকে নাকি মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হতে চলেছে। সেই বিষাক্ত প্রচার কে না তো তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার কোনদিন খন্ডন করেছিল আর না তৃণমূল কংগ্রেস বা জাতীয় কংগ্রেস।

২০১৪ সালের মোদী-ঢেউ যখন সারা ভারতে গেরুয়া রঙ লাগানো শুরু করলো, তখন পশ্চিমবঙ্গের থেকে আবার দুইটি আসন অনায়সে জিতে গেল বিজেপি আর সেই বিজয়ের ফলে আরএসএস এর নেতৃত্ব চরম উৎফুল্ল হয়, কারণ পশ্চিমবঙ্গ কে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও বিভাজনের মানচিত্রে না আনতে পারলে ব্রাক্ষণত্ববাদী একনায়কতান্ত্রিক কর্পোরেট-সামন্তবাদী ফ্যাসিবাদ কে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, কারণ পশ্চিমবঙ্গ, তামিল নাড়ু, কেরল, প্রভৃতি রাজ্য থেকেই ব্রাক্ষণত্ববাদী শাসক শ্রেণী পায় সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিজীবি পদাতিক বাহিনী কে।

বিজেপি ও আরএসএস এর পুনরুত্থানের পিছনে বসিরহাট এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছিল। ২০১৫ সালের বিধানসভা উপনির্বাচনে এই বসিরহাট থেকেই ভোটে জিতে বিধানসভায় প্রবেশ করেন শমীক ভট্টাচার্য। এই বসিরহাটের মাটিতে এসেই মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সরকার কে ফেলে বিজেপির সরকার গড়ার ডাক দিয়েছিলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে শেষ রক্ষা হয়নি, ২০১৬  সালের বিধানসভা নির্বাচনে গো-হারা হারতে হয় বিজেপি কে এই কেন্দ্রে।

তবে হিন্দুত্ববাদীদের ঘৃণ্য প্রচার পিছিয়ে থাকে না। বিশেষ করে প্রতিবেশী জেলায় জমি আন্দোলন শুরু হতেই কৃষক জনগণ কে জমি বা সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রাম থেকে দূরে রাখতে এবং বন্ধ কলকারখানার শ্রমিকদের কারখানা খোলার আন্দোলন বা চালু কারখানার শ্রমিকদের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে দূরে ঠেলে দিতে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসরাইল ও মার্কিন গুপ্তচর সংস্থার টাকায় চলা হিন্দু সংহতি, আরএসএস ও বজরং দল।

এই অঞ্চলে একই সময়ে গজিয়ে উঠেছে মার্কিন দালাল সৌদি আরবের টাকায় তৈরি হওয়া সালাফি জঙ্গী ইসলামের পাঠ শেখানোর মাদ্রাসা, এবং সেই মাদ্রাসা চালাতে বাইরের থেকে আসছে সালাফি ইসলামী মৌলানারা, যাঁদের শিরায়-উপশিরায় বইছে মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি জোটের ছড়ানো ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষ। এই মৌলানা ও ইমামদের একটি বড় অংশই শাসক পার্টি তৃণমূলের শিবিরে জুটেছে এবং পার্টির নানা সেলের ছোট বড় নেতা হয়ে উঠেছে।

এলাকায় এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে উঠেছে রাম ও হনুমানের মন্দির, যাঁর সাথে দিন-আনি-দিন-খাই শ্রমজীবি হিন্দুদের কোন কালেই কোন সম্পর্ক ছিল না। ইছামতির পাড়ে এই বাদুড়িয়া-বসিরহাট অঞ্চলের অনেক গ্রামে ধীরে ধীরে তলোয়ার ও লাঠি খেলা শেখানোর টোপ দিয়ে নিরীহ গরিব হিন্দু বাড়ির শিশু ও কিশোরদের নিয়ে আসে আরএসএস ও বজরং দলের কর্মীরা আর তারপর তাঁদের মন কে বিষিয়ে তোলানো হয় মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে।

হাজারো হাজারো ঝুটো ভিডিও, ছবি ও বিকৃত তথ্য পরিবেশন করে হোয়াটস্যাপ ও ফেসবুকের মাধ্যমে হিন্দু যুব সমাজের একটা বড় অংশকেই মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী বানাতে উঠে পড়ে লেগেছে আরএসএস। কিন্তু বহু বছর ধরে এক সাথে বাস করা মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে দাঙ্গা লাগানো বাংলার মাটিতে যে কঠিন সে কথা বুঝেছে আরএসএস আর তাই বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও পূর্ব উত্তর প্রদেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কর্মী ও সমর্থকদের ভাড়া করে পশ্চিমবঙ্গে আনিয়েছে গেরুয়া বাহিনী। যেই মুহূর্তে যেখানে দাঙ্গার প্রয়োজন, সেই মুহূর্তে সেখানে দলে দলে লোক কে ট্রেনে বা ট্রাকে চাপিয়ে পাঠিয়েছে আরএসএস। বিএসএফ কে ব্যবহার করে রাজনাথ সিংহ আরএসএস এর হিন্দুত্বের বিষ কে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে গভীরে রোপন করার পরিকল্পনায় সহায়তা করার জন্যে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করাচ্ছে জামাতি জঙ্গীদের, যাঁদের একটা বড় অংশ হিঙ্গলগঞ্জ ও দেগঙ্গায় আশ্রয় নিচ্ছে নানা ধরণের সুন্নি সংগঠনগুলোর শেল্টারে।


কিছুদিন আগেই, ঈদের পরের দিন, অর্থাৎ ২৭শে জুন - আরএসএস এর বেসরকারি বাংলা মুখপত্র দৈনিক যুগশঙ্খ প্রথম পৃষ্টায় একটি উস্কানি মূলক খবর ছাপে - ঈদের দিন বাদুড়িয়ার মসজিদে উড়লো পাকিস্তানের পতাকা। ছবিটি পত্রিকার কেউ তোলেনি, কারণ ছবিটি একটি মোবাইল থেকে তোলা হয়েছিল এবং পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করা হয়েছিল। কোন হিন্দুত্ববাদী গ্রূপ থেকে ছবিটি পেয়েই প্রথম পাতায় বড় বড় করে কাল্পনিক তথ্য সহ দৈনিক যুগশঙ্খ এই খবরটি ছাপে, আর ছবিটিতে পাকিস্তানের ঝান্ডা বলে দেখানো হচ্ছে ইসলামিক ঝান্ডা কে, যার ধারে কোন সাদা পাড় নেই। এই রকম ঝুটো, অথচ জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী প্রথম পাতার খবর দেখে সেই সময়েই কিন্তু বাদুড়িয়ার মানুষ ও অন্যান্য জায়গার প্রগতিশীল ও রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ কিন্তু বুঝে গেছিলেন যে ধুলাগড় ও হাজীনগরের মতন এবার বাদুড়িয়া নিয়েও কোন চক্রান্ত আরএসএস ও বিজেপি ফেঁদেছে।


শৌভিক সরকার ও বাদুড়িয়ার দাঙ্গা 

শৌভিক সরকার কে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ 

বাদুড়িয়ার রুদ্রপুরের মাগুরখালী গ্রামের ছেলে শৌভিক সরকার। ১৭ বছরের স্কুল ছাত্রটি তাঁর সম্পর্কের জেঠু বাবলু সরকারের বাড়িতে মা মারা যাওয়ার পর থেকেই মানুষ। মাগুরখালীতে হিন্দু ও মুসলিমরা নির্বিরোধে বছরের পর বছর বাস করেছেন এবং একে অপরের ধর্ম কে শ্রদ্ধা করেছেন, একে অপরের সুখ দুঃখের সাথী হয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত সোমবার  ৩ জুলাই ২০১৭ তে। বেশ কিছুদিন ধরেই শৌভিক ফেসবুক ও হোয়াটস্যাপের দ্বারা পরিচালিত আরএসএস এর বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক প্রচারের শিকার হয় এবং মুসলমানদের ধর্মীয় স্থলের উপর একটি ন্যাক্কারজনক ছবি সহ পোস্ট সে নিজের ফেসবুকে শেয়ার করে, যা দেখে তাঁর মুসলমান সহপাঠীরা ক্ষিপ্ত হয় এবং শৌভিক কে ক্ষমা চেয়ে পোস্টটা ডিলিট করে দিতে অনুরোধ করে। কিন্তু শৌভিক ক্ষমাও চায়নি এবং পোস্টটি ডিলিট করতেও অস্বীকার করে, কারণ তখন আরএসএস এর কিছু লোক শৌভিককে অনুপ্রেরণা দেয় পোস্টটা ডিলিট না করতে।

সন্ধ্যে বেলায় প্রায় ২০০ জন বহিরাগত, যাঁদের অধিকাংশই অবাঙালী (যা উত্তর চব্বিশ পরগনার গ্রামাঞ্চলে দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়) সেখানে হাজির হয় এবং শৌভিকের বাড়ির উপর আক্রমণ করা শুরু করে। স্থানীয় মাগুরখালী মিলন মসজিদের সভাপতি আমিরুল ইসলাম থেকে শুরু করে স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দারা এই বহিরাগত গুন্ডাদের আক্রমণ কে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন তবুও সংখ্যায় বা পেশী শক্তিতে তাঁরা পেরে ওঠেন না আর এই সুযোগে বাবলু সরকারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় দুষ্কৃতীরা, যারা প্রত্যেকেই বহিরাগত ও “নারা-এ-তকবির আল্লাহু-আকবর” স্লোগান দিতে দিতে আসে। তবে সেই বহিরাগত হামলাকারীদের হাত থেকে শৌভিক কে কিন্তু রক্ষা করেন এলাকার মুসলমানেরাই। তথাকথিত মুসলিম ধর্মরক্ষী বাহিনীর লাগানো আগুন নিভিয়ে বাবলু সরকারের বাড়ি কে কিন্তু এলাকার মুসলমানরাই রক্ষা করেন। শৌভিক কে পুলিশ পরে এসে যখন গ্রেফতার করে তখন সে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে লুকিয়ে ছিল একটি পাট ক্ষেতে।

সেই সন্ধেবেলার বহিরাগতদের বাঁধানো ঝামেলার পরে কিন্তু মাগুরখালী গ্রামে আর কোন হিংসার ঘটনা ঘটেনি। তবে যদিও গ্রামের দুই সম্প্রদায়ের মানুষই শৌভিকের অর্বাচীন কাজের সমালোচনা করেছেন, কেউই তাঁর উপর আক্রমণ বা পুলিশি পদক্ষেপ কে সমর্থন করছেন না, কারণ এর ফলে ওই কিশোরের ভবিষ্যতের উপর খারাপ প্রভাব পড়বে বলে সবার বিশ্বাস। সাম্প্রদায়িক উস্কানি সত্বেও হিন্দু ও মুসলমানরা একসাথে বসে শৌভিক সরকারের বাড়িতে হওয়া আক্রমণের বিরোধিতা করেন ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরোধিতা করেন এবং আশা করেন যে গ্রামের ছেলে শীঘ্রই বাড়ি ফিরবে এবং পড়াশুনো ঠিক করে করবে।

যদিও হিন্দুদের একটি অংশ কিন্তু শৌভিকের উপর ক্ষিপ্ত তাঁর অপরিমাণদর্শিতার অভাবের কারণে এবং এই ভাবে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি মনের মধ্যে ঘৃণা পুষে রাখার কারণে। তবে গ্রামের মুসলমানেরা শৌভিকের কীর্তি কে কিন্তু বাচ্চা ছেলের কীর্তি বলে ধার্তব্যের মধ্যেই আনছেন না। আর তাই মাগুরখালীর অশান্তির ফলে তেঁতুলতলা, বাঁশপোতা থেকে শুরু করে ১৬ কিমি দূরের বসিরহাটে দাঙ্গা বাঁধলেও এই গ্রামের মানুষ নিজেদের ঐক্য কে পরস্পরের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জাহির করে আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন, কারণ তাঁরা বুঝেছেন যে এই হানাহানির সময়ে, এই ধরনের প্ররোচনার ও ষড়যন্ত্রের সময়ে, একমাত্র মানুষের ঐক্যই পারে অন্ধকারের শক্তি কে হারিয়ে দিতে।

শৌভিক সরকারের উপর আক্রমণ কারা করলো? গ্রাম বাংলার মাটিতে হঠাৎ করে এত অবাঙালির উৎপত্তি হলো কোথা থেকে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরের সাথে সাথে এ’ও জানা দরকার যে মুসলিম সমাজের একটা অংশ কে বোমা, লাঠি ও তলোয়ার দিয়ে কারা রুদ্রপুর বাজার, জঙ্গলপুর বাজার অবরোধ করতে মদত করে এবং কারা এই অবরোধ কে মুসলিমদের দ্বারা হিন্দুদের ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, হিন্দু মহিলার ধর্ষণ করা, হিন্দু জনগণ কে হত্যা করার মিথ্যা খবর বানিয়ে পরিস্থিতি কে আরও উত্তপ্ত করতে চার দিকে গুজব ছড়িয়েছিল? আর সেই গুজব শুনে পিস্তল, বোমা ও তলোয়ার নিয়ে মাথায় গেরুয়া ফেট্টি ও কপালে লাল সিঁদুরের টিপ পড়ে কারা নানা  জায়গায় মুসলিমদের দোকান ও বাড়িতে আগুন লাগায়, বাস ও ট্রাক জ্বালিয়ে দেয় এবং রেল অবরোধ করে?

শৌভিকের বাড়িতে যাঁরা আগুন লাগাতে গেছিল তাঁদের এলাকার মানুষেরা কোন দিন দেখেননি, এবং তাঁদের বেশিরভাগ লোকই হিন্দি ভাষী ছিল। সেই আক্রমণকারীদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁরা যে সকলেই মুসলমান দুষ্কৃতী ছিল তারও কোন প্রমাণ নেই। মাগুরখালীর জনগণ এই হামলার কথা চাউর করেননি, মাগুরখালী গ্রামের মুসলমান যুবক বরং দমকল ডেকে বাবলু সরকারের বাড়ির আগুন নেভাতে নেমেছিলেন। তাহলে এই হিন্দি ভাষী আক্রমণকারীরা কাদের সমর্থনে বলীয়ান হয়ে এসেছিল শৌভিক সরকারের বাড়িতে আগুন লাগাতে?

যদি আমরা ধরেও নিই যে শৌভিকের মুসলিম সহপাঠীরা দেগঙ্গার বেড়াচাঁপা অঞ্চলে ঘাঁটি গাড়া অল ইন্ডিয়া সুন্নাত আল জামায়েত, অল ইন্ডিয়া মজলিস এ ইত্তেহাদুল মুসলিমীন, বা মাগরিবী বাঙাল আঞ্জুমান এ ওয়াজিন নামক কিছু সৌদি-মার্কিন অর্থে পরিচালিত সালাফি ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী সংগঠন কে ডেকে এনেছিল শৌভিকের বাড়িতে আগুন জ্বালাতে, তাহলেও প্রশ্ন হলো এত তাড়াতাড়ি এত বড় স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত করাতে পারলো মাত্র কয়েকজন স্কুল পড়ুয়া? যে ফেসবুক পোস্টটি কে নিয়ে এত ঝামেলা সেই পোস্টটিতে এমন কি ছিল যে সংখ্যাগুরু  সম্প্রদায়ের পাল্টা আক্রমণ, মাগুরখালী গ্রামের জনগণের প্রতিরোধ, এই সবের চিন্তা না করেই ২০০ জনের উপর অবাঙালী হঠাৎ বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুর সম্প্রীতির নীড় এই গ্রামে আক্রমণ করে?

অস্বীকার করে লাভ নেই যে রাজারহাট এলাকার মৌলবাদী তোষণের স্বার্থে পরিচালিত আলিয়াহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সালাফি ছাত্রদের সমর্থনে অনেক অশিক্ষিত ও অসামাজিক পেশায় লিপ্ত মুসলমানদের- যাঁদের বেশির ভাগই শাসক পার্টি তৃণমূলের ঝান্ডাধারী-সঙ্গে নিয়ে অল ইন্ডিয়া সুন্নাত আল জামায়েত সমগ্র রুদ্রপুর বাজার ও জঙ্গলপুর বাজারে প্রথমে অবরোধ করে এবং পুলিশ অবরোধ ওঠাতে আসলেই তাঁরা দাঙ্গা করা শুরু করে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় কিছু দোকান আর রাস্তায় চলা বাস ও লরিতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এমতাবস্থায় রাস্তায় নেমে মুসলিম জনগণ কে নিরস্ত হওয়ার জন্যে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংখ্যালঘু সেলের নেতারা, কিছু অন্য সুন্নি সংগঠনের নেতৃত্ব ও এলাকার পরিচিত মৌলবীরা।

পুলিশের সাথে দাঁড়িয়ে তাঁরা অনুরোধ করেন মুসলিমদের কোন প্ররোচনার ফাঁদে না পড়তে এবং দাঙ্গাকারী সালাফি গুন্ডাদের বিচ্ছিন্ন করতে। পরিস্থিতি যখন প্রায় নাগালের মধ্যে চলে আসছিল ঠিক তখনই বিজেপির প্রচার মাধ্যমের দ্বারা ঝুটো ভিডিও ও ছবি দেখিয়ে রাজ্যের ও দেশের সর্বত্রে মুসলিম বিদ্বেষ কে বাড়িয়ে তোলা শুরু হলো। মিথ্যা প্রচারের ঢোল তীব্র ভাবে পেটানো শুরু করে সংঘ পরিবারের ভাড়াটে বাহিনীরা। ইন্টারনেটের সাথে সাথে হাতে-হাত মিলিয়ে বিজেপির পা-চাটা দালাল অর্ণব গোস্বামীর রিপাবলিক চ্যানেল, বিজেপি সাংসদ ও দুই নম্বরি কারবারি সুভাষ চন্দ্রের জি নিউজ এবং অন্য অনেক হিন্দুত্ববাদী টিভি চ্যানেল খবরটি কে বিকৃত করে প্রকাশ করা শুরু করে। তাঁরা দেখায় যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় না থাকার কারণে এখানকার হিন্দুরা অসুরক্ষিত এবং তাই বিজেপি কে এই রাজ্যে ক্ষমতায় আনা চাই।

এই প্রচারের সাথে সাথেই কিন্তু শুরু হলো হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডব। এলাকায় এলাকায় বাইকে চড়ে, পিস্তল, বোমা ও তলোয়ার নিয়ে, মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বেঁধে রাম ভক্ত হনুমানের দল কিন্তু শুরু করলো একের পর এক মুসলিম বস্তির উপর হামলা, জ্বালিয়ে দেওয়া হলো পুলিশের জিপ, পাথর বর্ষণ করা হলো পুলিশের বড়কর্তাদের উপর। প্রায় সাতজন মুসলিম কে ভয়ানক ভাবে হামলা করে এই হিন্দুত্ববাদী ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী, জ্বালিয়ে দেয় দোকান-বাজার আর লুটে নেয় গরিব মানুষের বাড়ি। হিন্দুত্ববাদীদের এই আক্রমণ কে হিন্দি ও ইংরাজী মিডিয়া কিন্তু সম্পূর্ণ রূপে অগোচরে নিয়ে যায় এবং সামনে রাখে শুধু -মুসলিম মৌলবাদের উথ্বানে বাংলা বিপন্ন - এই স্লোগান।

হিন্দুত্ববাদী অবাঙালী গুন্ডাদের বিরুদ্ধে কিন্তু দিকে দিকে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন খেটে খাওয়া হিন্দু ও মুসলিম জনগণ। দাঙ্গার সবচেয়ে ঘৃণ্য সময়ে তাঁরা কিন্তু বাংলা’র এক অদ্বিতীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজির গড়লেন, তাঁরা কিন্তু দেখালেন যে হিন্দুত্ববাদীদের প্ররোচনা সত্বেও তাঁরা, গ্রাম বাংলার মানুষেরা, কিন্তু নিজেদের ঐক্য কে ভাঙতে দেবেন না। তাই হিন্দুত্ববাদী ভাড়াটে অবাঙালী দাঙ্গাবাজদের বাজার খারাপ হলো এবং তাঁদের বিক্ষিপ্ত হিংসা ও প্রচুর পরিমাণে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে নিজেদের কে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হলো।

আরএসএস বিভিন্ন প্রদেশ থেকে যে অবাঙালী লোকেদের নিয়ে এসেছে টাকা দিয়ে ভাড়া করে, তার থেকে প্রায় ২০০০-৩০০০ লোককে তাঁরা দেগঙ্গা,স্বরূপনগর, হিঙ্গলগঞ্জ, বাদুড়িয়া ও বসিরহাট অঞ্চলে পাঠায় দাঙ্গা লাগাতে। আর এদের চোখের সামনে দেখেও মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সেই বীর পুঙ্গব পুলিশ বাহিনী কিন্তু ভাঙড়ের মতন তাঁদের উপর নখ দাঁত খুলে ঝাঁপিয়ে পড়েনি, বরং মদত করেছে কাজ সেরে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে। ধরা পড়ে  শুধু শৌভিক সরকারের মতন নাবালক চুনোপুঁটিরা আর দিলীপ ঘোষ-তপন ঘোষের মতন ব্রাক্ষণত্ববাদী-ফ্যাসিবাদী লোকেরা থেকে যায় পুলিশের থেকে সহস্র যোজন দূরে। হালকা মেজাজে দলের রাজ্য দপ্তরে দিলীপ ঘোষ সংবাদ মাধ্যম কে নির্লজ্জের মতন নিজেদের ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা সব জাল ভিডিও দেখিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে সমগ্র বাদুড়িয়ায় ও বসিরহাটে হিন্দুদের নাকি ভীষণ খারাপ অবস্থা।

মিলন মন্ডল, অভিরূপ মজুমদারের মতন কট্টর আরএসএস এর ভাড়াটে কর্মীরা ইন্টারনেটে কখনো বাংলাদেশের থেকে নেওয়া ছবি তো কখনো গুজরাট দাঙ্গার ছবি কে নির্লজ্জের মতন বাদুড়িয়া আর বসিরহাটের দাঙ্গা বলে চালাবার চেষ্টা করে। বজরং দলের লোকেরা সাদা কাগজের উপর শৌভিক সরকারের ফাঁসি চাই দাবিতে পোস্টার ছাপিয়ে নানা জায়গায় লাগিয়ে দেয় মুসলমানদের উপর দোষ চাপাতে আর খুঁজে খুঁজে মুসলমান গরুর মালিকদের হত্যা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দাঙ্গার আড়ালে। তবে যেহেতু রাজ্যটা হলো পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট বা উত্তর প্রদেশ নয়, তাই এই সকল চক্রান্তের সফল হওয়ার জায়গায় নানা ভাবে ধাক্কা খেতে হলো বিজেপি ও আরএসএস কে।

বসিরহাট - দুর্নীতিবাজ-দাঙ্গাবাজ বিজেপির গলার কাঁটা


রাজ্য বিজেপির পক্ষে বসিরহাট হয়ে উঠেছে গলার কাঁটা। অনেক দিন ধরে জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক প্রচার চালিয়ে, জোতদার-জমিদারদের ভাড়াটে গুন্ডাদের একটা বড় অংশ কে নিজেদের দিকে টেনে এনে, সাবর্ণ লুম্পেন হিন্দুদের একটা বড় অংশ কে এবং নিচু জাতের হিন্দুদের মধ্যে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া জনগণ কে হিন্দুত্ববাদের শিবিরে এনে ২০১৫ সালে কোন ভাবে বসিরহাটের থেকে নিজেদের মোদী যুগের প্রথম বিজেপি বিধায়ক জিতিয়ে এনেছিল রাজ্য নেতৃত্ব।  তবে ২০১৬ সালে সেই বেলুন চুপসে যায়, যার ফলে বিজেপি পরে বৃহৎ সঙ্কটে।

বিজেপির বসিরহাটের নেতা বিকাশ সিংহ, নিজের সহচর সুজিত বিশ্বাস ও হিঙ্গলগঞ্জের নেতা জয়দেব বর্মন সহ অনেকের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করে বসিরহাট-হিঙ্গলগঞ্জ সহ নানা জায়গার গরিব মানুষের থেকে টাকা নেন প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় বাড়ি বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। দাঙ্গা লাগার আগে, আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৩ই জুন ২০১৭ তে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বিকাশ সিংহ-সুজিত বিশ্বাসেরা প্রায় ১২০০ গরিব পরিবার থেকে ঝুটো প্রতিশ্রুতি দিয়ে ₹৪ লক্ষ করে তুলেছিলেন এবং সেই টাকা বেমালুম হাপিস করে দেন। ফলে যে গরিব মানুষগুলো চাষের জমি বন্দক দিয়ে বা চড়া সুদে নানা মহাজনের থেকে ঋণ  নিয়ে এত এত টাকা এই বিজেপি নেতাদের দিয়েছিলেন তাঁরা পড়েন অথৈ জলে।

সমগ্র বসিরহাট জুড়েই বিজেপির বিরুদ্ধে এক গণ বিক্ষোভ জাগ্রত হতে থাকে এবং এর ফলে কার্যত বাড়ি ছাড়া হয়ে থাকতে হয় বসিরহাটের বিজেপি নেতৃত্ব কে। বিজেপির মধ্যেই যারা এই টাকায় ভাগ পায়নি তাঁরা রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের কাছে নালিশ করলেও কট্টর হিন্দুত্ববাদী দাঙ্গাবাজটাও কিন্তু বিকাশ সিংহ ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের পাশেই দাঁড়ায়। রাজ্য সরকার এই দুর্নীতির তদন্তের ভার রাজ্য সিআইডি’র হাতে তুলে দিয়েছে আর তার পরে এলাকায় বিজেপির উপর আরও চাপ বাড়ে এবং যে বসিরহাটের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলে বেশ কয়েক বছর আগে দাপুটে দল হয়ে উঠেছিল বিজেপি, সেই বিজেপির অফিসে ধুপ ধুনো দেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া ভার হয়ে ওঠে।

নরেন্দ্র মোদী নিজে এসে বসিরহাটে প্রচার করে যাওয়া সত্বেও শমীক ভট্টাচার্যের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থীর কাছে বেমালুম পরাজয় দেখিয়ে দিয়েছে যে বিজেপি এই অঞ্চলে ব্যাপক ভাবেই জন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এই পার্টির পক্ষে রাজনৈতিক ভাবে এলাকায় নিজের প্রতিপত্তি পুনঃস্থাপন করার জন্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানো ছাড়া আর কোন রাস্তা ছিল না।

বসিরহাট-হিঙ্গলগঞ্জ সহ নানা জায়গায় এমন বহু লোকের উপর আক্রমণ করা হয়েছে যাঁরা বিজেপির বিরুদ্ধে ২০১৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন বা বিকাশ সিংহ, সুজিত বিশ্বাস বা জয়ন্ত বর্মনের মতন দুর্নীতিবাজ হিন্দুত্ববাদী ঠগদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আড়ালে বিজেপি ক্রমাগত ভাবে তৃণমূল কে পিছনে ঠেলে সমগ্র বসিরহাটে নিজের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে আর এই কাজে দিলীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ দুর্নীতিবাজ বিকাশ সিংহ এক মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

মূলতঃ নিজেদের প্রতিপত্তিকে পুনঃস্থাপন করার জন্যে এবং বসিরহাটের ভাঙা সংগঠন কে জোড়া লাগাতেই আরএসএস এর নেতৃত্বে বিজেপি এই দাঙ্গার প্রস্তুতি করেছিল বিভিন্ন মাধ্যম কে ব্যবহার করে। সমগ্র অঞ্চলের চোরাচালানকারী, নারী পাচারকারী, শিশু পাচারকারীদের একত্রিত করে এক বিশাল বাহিনী আরএসএস তৈরি করেছে এবং তার সাথে জুড়েছে দুষ্কৃতীদের বাহিনী বজরং দল আর দাঙ্গাবাজ গোপাল পাঁঠার অনুগামী তপন ঘোষের হিন্দু সংহতি।
বাদুড়িয়া - বসিরহাটের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও মুসলিম সংগঠনগুলির ভূমিকা

বাদুড়িয়া - বসিরহাটের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও মুসলিম সংগঠনগুলির ভূমিকা



যদিও শৌভিক সরকারের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে সামগ্রিক ভাবে সুন্নি মুসলমান সমাজের মধ্যে একটি উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল, তবে যে ভাবে কট্টর মৌলবাদী সংগঠনগুলির একটা বড় অংশ দাঙ্গা ও হাঙ্গামার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তা কিন্তু অভাবনীয় ছিল। বিশেষ করে অনেকগুলো সুন্নি মুসলমান সংগঠনের নেতারা যে ভাবে পুলিশের সাথে নেমে বিক্ষুব্ধ জনগণ কে শান্ত করার চেষ্টা করেন, তার থেকে অনেক তথাকথিত হিন্দু সংগঠনেরও অনেক শেখার আছে।

শৌভিকের ফাঁসির দাবিতে আর স্রেফ দাঙ্গা করে নিজেদের প্রতিপত্তি জাহির করতে চাওয়া সংগঠনগুলির কিন্তু লোকবল যেমন কম ছিল তেমনি এদের বেশির ভাগই ছিল বাইরের দল, যারা এলাকার সমাজবিরোধীদের পথে নামায়। হায়দ্রাবাদের নিজামের কুখ্যাত রাজাকার বাহিনীর স্রষ্টা যে দল, সেই অল ইন্ডিয়া মজলিশ এ ইত্তিহাদে মুসলিমীন বা এআইএমআইএম দলের কিন্তু এই দাঙ্গার পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলে এলাকার মুসলমানরা মনে করছেন। ওয়াইসি নেতৃত্বকারী এই দলের সাথে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বহু মুসলমান সম্প্রদায় থেকে আসা চোরাচালানকারী যেমন যুক্ত ঠিক তেমনি যুক্ত কিছু মাছের ভেঁড়ির মালিক, ভিন রাজ্য থেকে আসা মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার মৌলবীরা, যাঁরা চরম ভাবে বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতি কে ঘৃণা করেন।

এআইএএমআইএম এর নেতৃত্বকারী ওয়াইসি ভ্রাতৃকূল এর আগেও সালাফীবাদের প্রচারের মাধ্যমে দেশের মুসলমানদের মধ্যে বিষাক্ত চেতনার বীজ রোপনের চেষ্টা করেছে এবং বহু অশিক্ষিত এবং পিছিয়ে থাকা মুসলমানদের মধ্যে নিজেদের প্রতিপত্তি বিস্তার করে ওয়াইসি ভ্রাতৃকূল কিন্তু নানা রাজ্যে মুসলমান ভোট কে ভাগ করে বিজেপি ও আরএসএস কে সাহায্য করে দিয়েছে। বিহার এর নির্বাচনে ওয়াইসির ঝাঁপিয়ে পড়া কে অনেকে স্রেফ মনে করে দেখতে পারেন।

তবে একক ভাবে শুধু এআইএএমআইএম কে দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ রাজ্যের তৃণমূল সরকারের প্রচ্ছন্ন মদত ও আশ্বাস না পেলে কিন্তু মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলি কোনদিনই ঘুরে দাঁড়াতে পারতো না পশ্চিমবঙ্গের জমিতে। অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদীদের চরম হারে মেরুকরণের অভিযান দেখিয়েও কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ভাবে মেরুকরণ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে আর তলে তলে মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলির সাথে তালমিল ঠিক রেখেই দাঙ্গার ছক কষছে আরএসএস-বজরং দল ও হিন্দু সংহতি।

বাদুড়িয়া-বসিরহাট দাঙ্গার শিক্ষা কি ? এই পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির কি করণীয়?


বাদুড়িয়া ও বসিরহাটের দাঙ্গার পরে রাজ্যে হিন্দু সংহতি ও এআইএএমআইএম এর সভা সমিতির উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সরকার। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আরও তাড়াতাড়ি নেগেটিভ পপুলারিটি বা নেতিবাচক জনপ্রিয়তা পেয়ে যাবে এই দুই ফ্যাসিবাদী সংগঠন। আজ এই দলগুলির সভা সমিতির উপর নিষেধাজ্ঞা না চাপিয়ে দরকার ছিল এই দলগুলোর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভাবে মোকাবিলা করা আর সেই ক্ষেত্রে কিন্তু মমতা বন্দোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার হাত গুটিয়ে বসে আছে।

২০১১ সালে মমতা বন্দোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার সময়ে তাঁর পিছনে বলিষ্ঠ সমর্থন দিতে দাঁড়ায় হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলি। মমতা বন্দোপাধ্যায়ের গত ছয় বছরের সরকারের মেয়াদে সবচেয়ে বেশি অক্সিজেন পেয়ে একেবারে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলি। তপন ঘোষের মতন দাঙ্গাবাজরা পুলিশি সুরক্ষায় রাজ্য জুড়ে হিন্দুদের, বিশেষ করে গরিব ও পিছিয়ে থাকা হিন্দুদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে বারবার। শহর ও মফৎস্বল থেকে দূরে এবার গ্রামাঞ্চলের মাটিতে এরা আরএসএস ও বিজেপির স্বার্থে বিভাজনটি আরও চরম করতে চায়।

গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে আজ খুঁজে দেখতে হবে নিজেদের দুর্বলতাগুলো এবং সেগুলো কে আজ কাটাতে হবে যথার্থ ভাবে। তাঁদের আজ মানুষের কাছে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পৌঁছাতে হবে কারণ আজ বিদ্যুৎ গতিতে কিন্তু আরএসএস বা সুন্নি সংগঠনগুলির ঘৃণা ভরা প্রচার তাঁদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই কিন্তু লোকে এই সমস্ত প্রচারে বিশ্বাস করে ফেলছেন এবং সেই তথ্যগুলো কে পুনরায় নতুন লোকেদের মধ্যে প্রচার করছেন।

সমস্ত প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে আজ বাদুড়িয়া-বসিরহাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার থেকে শিক্ষা নিয়ে একটা জনপ্রিয় এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রচার মাধ্যম গড়ে তুলতে হবে, যাতে সমগ্র জনগণের কাছে যে কোন ঘটনার  একটি বিশদ, তথ্যপূর্ণ এবং সমালোচনা-মূলক প্রতিবেদন পেশ করা যায় এবং তার মাধ্যমে সমাজের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বৈরিতা সৃষ্টি কে রোখা যায়। আর এই কাজ করতে গেলে চাই সংগঠন ও মানুষের মধ্যে পৌঁছে যাবার প্রচেষ্টা।

আমাদের বুঝতে হবে যে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে কোন ধরনের সাম্প্রদায়িকতা বা মৌলবাদ বেশি সর্বনাশী। দেখতে গেলে তো সব মৌলবাদী শক্তিই খারাপ তাহলে ভারতে প্রধান শত্রু হবে কে ? এর জন্যে দেখতে হবে যে ভারতে বা পশ্চিমবঙ্গে কোন সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। তাহলে আমাদের সামনে আসবে হিন্দু সম্প্রদায় এবং এর মৌলবাদী অংশ যা হিন্দুত্ববাদ নামে পরিচিত। কেন হিন্দুত্ববাদ কে সবচেয়ে ভয়ানক বলে মানছি? কারণ যে কোন দেশের সাম্প্রদায়িক সংঘাতে বা মৌলবাদের বৃদ্ধিতে সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের যোগদান বেশি হয়। হিন্দুত্ববাদ কে যেমন আমরা পাকিস্তান বা বাংলাদেশে প্রধান শত্রু মানতে পারবো না তেমনিই আবার আমরা ভ্যাটিকান সিটিতে শিখ মৌলবাদের বিরোধিতা করতে যাব না।

হিন্দুত্ববাদের দাঙ্গা লাগাবার মূল পরিকল্পনা হলো যে এরা হিন্দুদের, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে একটি বিপন্ন ও দুর্বল সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করে জনগণ কে মুসলমানদের বিরুদ্ধে, খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহ দিতে থাকে।  তাই প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিটি প্রতিনিধির আজ দরকার হলো তথ্য ও জ্ঞান এবং তাই দিয়ে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষদের বোঝাতে হবে যে কেন তাঁরা নন, বরং দেশে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, দলিত ও আদিবাসীরা। আর এই কাজ তর্ক বিতর্ক করে সম্ভব নয়, সম্ভব শুধু মাত্র ভীষণ ধৈর্য সহকারে জনগণ কে বোঝানো মারফত। ট্রেনে-বাসে-অফিসে আর কারখানায় মানুষের সাথে কথা বলা দরকার, তাঁদের ভুল ধারণা ভাঙ্গা দরকার এবং যে মিথগুলো দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে শাসক শ্রেণী তা আজ ভাঙা দরকার।

প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি এই কাজগুলো করতে পারে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করা যেতে পারে এবং ক্রমাগত প্রচার চালাবার জন্যে কর্মী পাওয়া যায়। আর এই প্রস্তুতি গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে আজ থেকেই করে যেতে হবে না হলে সামনে আরও অনেক বাদুড়িয়া -বসিরহাটের মতন ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা ও অশান্তি। আগামী বাংলা কে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার থেকে মুক্ত করতে, বাংলার সামগ্রিক খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে ঐক্য কে দৃঢ় ভাবে স্থাপন করতে, অবাঙালী-বহিরাগত রক্তচোষা মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি, ফোঁড়ে, দালাল, সুদের কারবারীদের থেকে বাংলা কে রক্ষা করতে, আজ জনগণের গভীরে পৌঁছাতে হবে, তাঁদের সম্পূর্ণ সত্য বলতে হবে এবং সমস্ত ভোটপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির স্বরূপ এদের সামনে আনতে হবে। তবেই জনগণ কে একটি গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পতাকাতলে সমবেত করে আরএসএস - বিজেপির মতন ঘৃণ্য দাঙ্গাবাজ মার্কিন দালাল শক্তি কে বাংলার মাটিতে পরাস্ত করা সম্ভব।  
    


এই ব্লগের সত্বাধিকার সম্বন্ধে