বিজেপি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিজেপি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

লোক হাসিয়ে লুঠের থেকে নজর ঘোরাবার বিজেপি'র কৌশলে যেন আমরা জব্দ না হই


বেশ কিছুদিন আগে বর্ধমান জেলায় অনুষ্ঠিত ঘোষ এন্ড গাভী কল্যাণ সমিতির সভায় ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি মাননীয় দিলীপ ঘোষ তাঁর ভাঙা ভাঙা বাংলায় দেশীয় প্রজাতির গরুর দুধে সোনা থাকে বলে এবং বিদেশিনী জার্সি গাই কে গৌ মাতা (গরু মাতা — হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের তত্ত্ব অনুসারে পূজিত গরু) নয় বরং "আন্টি" বলে সম্বোধন করা নিয়ে, তাঁর নারী বিদ্বেষী বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক ও খিল্লির যে ঝড় বয়ে গেল তা অতুলনীয়। শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত, সাবর্ণ হিন্দু বাঙালিদের যে অংশটা বিজেপি-বিরোধী, তাঁরা বেশ রসিয়ে উপভোগ করলেন এই খিল্লি, কিন্তু প্রশ্ন করলেন না যে এই রকম লোক-হাসানো কথা কেন বিজেপি নেতারা প্রায়শই বলে থাকেন? কেন তাঁরা খিল্লির পাত্র হন? কেন বাজারি সংবাদ মাধ্যম এইসব কথাগুলোকে চাউর করে?

বর্তমানে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক সঙ্কট এক চরম রূপ ধারণ করেছে। ২০১৬ সালের নোটবন্দি ও পরবর্তীকালে পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) প্রয়োগ করায় ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো, বিভিন্ন অসংগঠিত ব্যবসা ও বাণিজ্য যার ফলে অথৈ জলে পড়েন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিরা। শহরে কর্মহীন হন লক্ষ লক্ষ মানুষ। শুধু তাই নয়, আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পেপার অনুসারে ভারতে ২০১১-১২ আর্থিক বছর থেকে ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরের মধ্যে ৯০ লক্ষ কাজ কমে যায়, অর্থাৎ ৯০ লক্ষ কর্ম সংস্থানের সুযোগ শেষ হয়ে যায়। 

এই সময়েই ভারতে প্রথমবার কৃষিতে ব্যাপক কর্ম অবলুপ্তি হয় যা কিন্তু চিরাচরিত প্রথা মেনে শিল্পে, পরিষেবায় বা অন্য কোন ক্ষেত্রে যোগ হয়নি; অর্থাৎ যাঁরা কৃষি ক্ষেত্রে কর্মহীন হলেন তাঁরা কিন্তু অন্য কোথাও কাজ খুঁজে পেলেন না বরং কর্মহীন হয়ে থাকলেন। ওই পেপারের তথ্য অনুসারে, ২০১৭-১৮ সালে ৪৯.৫১ কোটি কর্মঠ মানুষ কাজের বাজারে কর্মসংস্থানের জন্যে হাজির হলেও শুধু ৪৬.৫১ কোটি মানুষের কাছেই কাজ ছিল। এর পরেই, ২০১৯-২০ সালের তথ্য অনুসারে ভারতে কর্মহীনতার মাত্রা ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছিল ৮.১% তে, যা বর্তমানে ভারতের অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের অনুসারে ৭.৭% এ নেমেছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।

ভারতের অর্থনীতির এই দুর্দিনে, এই ব্যাপক কর্মহীনতার ফলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা ব্যাপক ভাবে হ্রাস পেয়েছে। এমনকি যাঁদের কর্মসংস্থান আছে তাঁরাও অর্থ খরচ করতে ভীষণ রক্ষণশীল হয়ে উঠেছেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে। এর ফলে বাজারে পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা চরম ভাবে হ্রাস পায় আর তার ফলে আর্থিক মন্দার, চরম আর্থিক সঙ্কটের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় বাজারের নিয়মেই সমস্ত সঙ্কটগ্রস্ত শিল্প সংস্থাগুলো, বিশেষ করে গাড়ি ও উপভোক্তা পণ্যের সংস্থাগুলো উৎপাদন কমিয়ে ফেলে ও তার ফলে আরও অনেক শ্রমিক ও কর্মচারীদের কর্মহীন হতে হয়। 

চক্রাকারে এই সঙ্কট ঘনীভূত হয়েই চলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বা বিজেপির এই সঙ্কট নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই। কারণ কর্মহীনতা ও আর্থিক সঙ্কটের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে এই সরকার ও শাসক পার্টি। যে কোন ধরণের অর্থনীতি সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে এই সরকার তুলে ধরে পাকিস্তান, কাশ্মীর, রাম মন্দির ও হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের কথা যাতে অর্থনীতির করুণ দশা ও ঘনীভূত হওয়া সঙ্কট নিয়ে দেশের গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ চিন্তা না করতে পারেন।

এই চরম কর্মহীনতার স্রোত কে না রুখে বরং তাতে আরও বেগের সঞ্চার করতে মোদী সরকার রেল, ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড (বিএসএনএল), এয়ার ইন্ডিয়া, ভারত পেট্রোলিয়াম (বিপিসিএল), প্রভৃতি সরকারি মালিকানাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর বেসরকারিকরণ করে ব্যাপক লোক ছাঁটাই করার পরিকল্পনা করছে। ইতিমধ্যে রেল থেকে লোকসান কমানোর নামে হাজার হাজার কর্মচারী ছাঁটাই করার প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে। বিএসএনএল এর ৫০ বছরের বেশি বয়স্ক কর্মীদের জোর করে অবসর গ্রহণ করানো হচ্ছে।মার্চ ২০২০ এর মধ্যে বিক্রি করে দেওয়া হবে বিপিসিএল।

এগুলোর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে প্রভাব পড়বে কারণ একজন চাকুরিজীবী বা শ্রমিকের উপর শুধু তাঁদের পরিবারের লোকেরাই নির্ভর করেন না এমন কী স্থানীয় অর্থনীতির চালকেরা, সে মুদির দোকানি হোক বা জামাকাপড়ের দোকানদার, দুধ বিক্রেতা, তরকারি বিক্রেতা হোক বা অন্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এরা সবাই নির্ভর করেন। কর্মহীনতা এবং ব্যাপক ছাঁটাইয়ের ফলে যে অর্থ সঙ্কট দেখা দেয় তার তরঙ্গের মতন প্রভাব এই সমস্ত শ্রেণীর মানুষের উপরেও পড়ে এবং আর্থিক সঙ্কট আরও গাঢ় রূপ ধারণ করে।

এই অবস্থায় মানুষের নজর কে অর্থনৈতিক সঙ্কটের থেকে দূরে ঘোরাতে, মানুষ কে এটা ভুলিয়ে দিতে যে তাঁদের জীবন চরম ভাবে এক অসুরক্ষিত অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, বিজেপি ও মোদী সরকার নানা ধরণের কার্যকলাপ করছে। সে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় গায়ের জোরে মন্দির প্রতিষ্ঠা হোক বা দিলীপ ঘোষ, বিপ্লব দেব প্রভৃতি লোকেদের সঙ সাজিয়ে তাঁদের দিয়ে কিছু অদ্ভুত কথা বলানোই হোক, যতক্ষণ সংবাদ মাধ্যম জনগণ কে মূল সমস্যার দিকে তাকাতে না দেওয়ার রসদ পাচ্ছে ততক্ষণ বিজেপির জন্যে মঙ্গল।

বর্তমানে যাঁরা গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও ফ্যাসিবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছেন এবং মোদী সরকারের ভয়াবহ সব নীতির বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তোলার প্রচেষ্টা করছেন তৃণমূল স্তর থেকে, তাঁদের অবশ্যই এই সব অপচেষ্টা কে রুখে দিতে হবে। খিল্লির স্রোতে গা না ভাসিয়ে, বা ঘটনাক্রমে আতঙ্কিত না হয়ে তাঁদের জনগণ কে বোঝানো উচিত যে কী ভাবে মুষ্টিমেয় কিছু বৃহৎ মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিদের জুতো চাটার স্বার্থে, কী ভাবে বৃহৎ বিদেশী একচেটিয়া-লগ্নি পুঁজির অবাধ লুঠ ও শোষণের স্বার্থে মোদী সরকার নির্লজ্জের মতন দেশ বিক্রি করে চলেছে ও গরিব মানুষের জন্যে আর্থিক সঙ্কট কে তীব্র করে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প দিয়ে তাঁদের বুঁদ করে রাখার চেষ্টা করছে।

এই মুহূর্তে যদি আপামর জনগণ কে, শ্রমজীবী মানুষ কে ও সঙ্কটগ্রস্ত কৃষকের কাছে এই সত্য প্রকাশ করা না হয়, তাহলে কিন্তু আগামী দিনে ভয়ানক হয়ে উঠবে আর্থিক সঙ্কট ও তার সাথে সাথে বেড়ে যাবে সাম্প্রদায়িক হিংসা ও রক্তপাত। অবিলম্বে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিগুলোর সংগ্রামী জোট গড়ে এলাকা ভিত্তিক প্রচারের মাধ্যমে এই ভয়ানক আর্থিক সঙ্কটের কথা মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবেই। আজ যদি এই কাজে অবহেলা হয় তাহলে আগামী দিনে তার ফল কিন্তু ফ্যাসিবিরোধী শক্তিগুলোকেই ভুগতে হবে। অতএব, সাবধান, সামনে কঠিন পথ। দিলীপ ঘোষের খিল্লিতে যেন মূল সমস্যা ভুলে না যাই আমরা।

যুদ্ধ ও উগ্র দেশপ্রেমের জিগির তুলে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের ভোটের বাজার দখলের লড়াই কে পরাস্ত করুন


ভাঙচুর চলছে, দেশপ্রেমের ভাঙচুর। সেই পুরানো চাল ভাতে বাড়ছে শাসকশ্রেণী আর গোগ্রাসে তা চেটেপুটে খাচ্ছে আমাদের দেশপ্রেমের নেশায় আচ্ছন্ন সাবর্ণ শহুরে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত লোকেরা। যুদ্ধ চাই, ভীষণ যুদ্ধ চাই তাদের, আর যুদ্ধের তর সইছে না, অবিলম্বে যুদ্ধ চাই। পাকিস্তানের লাশ দেখে তবেই এবার নাস্তা পানি খাবেন কর্তারা, তাই ফেসবুক, টুইটার সহ নানা সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। 

পুলওয়ামা হামলা হওয়ার পর থেকেই যুদ্ধের জিগির একদম ছাদ ভেদ করে আকাশে পৌঁছে যেতে চায়। তাই চিৎকার — যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ চাই। যুদ্ধ না হলে তো আর হিসেব নিকেশ হবে না, নিরামিষাশী মোদী ভক্তদের রাতের পনীর মশালা হজম হবে না, সকালে পরিষ্কার মলত্যাগ হবে না। তাই যুদ্ধ চাই, রক্তে স্নাত মাটি দেখেই আজ চোখ জুড়াবে ভক্তকুলের। 

তাই সেই ভারত যখন চীন আক্রমণ করে ১৯৬২ সালে তখন যেমন চিনা বাদাম ওয়ালা কে গড়ের মাঠে ফেলে পেটাতো কংগ্রেস দলের গুন্ডারা বা মহিলাদের লাল ব্লাউজের উপর ব্লেড চালাতো, বা কমিউনিস্টদের বন্দী করে জেলে রেখে অত্যাচার করতো, তেমনি আজ কাশ্মীরি মানুষ, যাদের জমি কে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে দাবি করে দেশপ্রেমিকদের দল, তাদের দেখতে পেয়েই রে রে করে তেড়ে মারতে যাচ্ছে গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা দেশপ্রেমিক বাছুরের দল, স্লোগান তাদের “জ্যায় সিরি রাম” আর হাতে তাদের ধারালো অস্ত্র। 

খুঁজে খুঁজে আক্রমণ করা হচ্ছে কাশ্মীরি ছাত্র-ছাত্রীদের, ব্যবসায়ীদের, এমনকি প্রসিদ্ধ ডাক্তারদের। হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ধরে পেটানো হচ্ছে, দেরাদুন, জম্মু প্রভৃতি জায়গায় কাশ্মীরি মানুষদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আর লাগানো হচ্ছে দেশদ্রোহীর তকমা। এই আক্রান্ত মানুষদের, যারা ওই মৃত জওয়ানদের মতন যুদ্ধ করতে গিয়ে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হননি, বরং নিজের জীবনযাপনের তাগিদে, লেখাপড়া শেখার তাগিদে, চাকরী করার তাগিদে নিজ ভিটে মাটি ছেড়ে ভারতের নানা কোনায় পড়ে আছেন হৃদয়ের এক কোণে একটুকরো কাশ্মীর কে লালন করে, তাদের রক্ষা করতে যে বা যারা এগিয়ে এসেছেন তারাও আক্রান্ত হয়েছেন বিবেচনাহীন, ফ্যাসিবাদের গরল পান করা উগ্র দেশপ্রেমিক নামক সংঘ পরিবারের সন্ত্রাসীদের  হাতে। 

যে বা যারা করেছে যুদ্ধের বিরোধিতা তারা আজ দেশদ্রোহী, যে বা যারা ভারত রাষ্ট্রের কাশ্মীরের উপর সামরিক দখলদারি’র বিরোধিতা করছে তারা দেশদ্রোহী, যারা আজ সাধারণ মানুষের উপর দেশপ্রেমের লেবেল আঁটা হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের বিরোধিতা করছে তারা আজ দেশদ্রোহী হিসেবে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের পোষ্য বাহিনীর কাছে চিহ্নিত হচ্ছে। আর এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ যে ভাল আছে তা কিন্তু মোটেই নয়। 

যুদ্ধের বিরুদ্ধে, সেনা নিয়ে নির্লজ্জের মতন রাজনীতি করার বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিরুদ্ধে মুখ খোলায় পশ্চিমবঙ্গেও হাজারে হাজারে গেরুয়া বাহিনীর জওয়ান’রা আক্রমণ করছে মুক্ত চিন্তার মানুষদের, বামপন্থীদের এবং অন্যান্য সকলকেই যারা রক্ত চাই, রক্ত চাই বলে চিৎকার করছে না। আক্রান্তদের বাঁচাতে গড়ে উঠছে না কোন বিপ্লবী ফ্যাসিবিরোধী ব্যারিকেড, আর তাই এই একের পর এক হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট আক্রমণে জর্জরিত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল চেতনার মানুষ।

বনগাঁ থেকে হাওড়া, কলকাতা থেকে সুদূর রানীগঞ্জ সর্বত্রই হিন্দুত্ববাদী শক্তি নিজের পেশীর জোর দেখিয়ে ভোটের আগে বাজার গরম করতে নেমেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদিও বা আশ্বাস দিয়েছেন যে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করবে তাঁর সরকার কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা যে ফাঁকা বুলি সবাই জানে। তৃণমূলের পৃষ্টপোষকতা ছাড়া বিজেপি ও আরএসএসের এই রাজ্যের বুকে এই ভাবে বুক বাজিয়ে মানুষের বাড়িতে শয়ে শয়ে গুন্ডা নিয়ে গিয়ে আক্রমণ করা সম্ভব হতো না। 

সামনে লোকসভা নির্বাচন আর এই সময়ে এই রকম ভাবে উগ্র দেশপ্রেমের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অন্যায়গুলো কে চাপা দিয়ে দেওয়ার সুযোগ কি আর কেউ খোয়াতে চাইবে, যখন সেই অন্যায় নীতির ফলে দেশের অর্থনীতি গত পাঁচ বছরে এমন গড্ডালিকায় গিয়ে ঢুকেছে যে তার বেরিয়ে আসা দুস্কর? 

তাই ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলিম নিধন যজ্ঞ শুরু করার আগে নরেন্দ্র মোদী যে ভাবে লক্ষ লক্ষ ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের সাহায্যে গোধারা রেল স্টেশনে আগুনে পুড়ে মৃত ৫৬ জন আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মীদের মৃতদেহ দাহ না করতে দিয়ে আহমেদাবাদে নিয়ে এসে সারা শহর প্রদীক্ষণ করিয়ে সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক অভীষ্ট অর্জন করেছিলেন, ঠিক সেই ভাবেই  ছকটা আবার তৈরী করা হচ্ছে। 

প্রতিটি মৃত জওয়ানের পরিবারের সম্মতি ছাড়াই বিজেপি তাঁদের মৃতদেহ নিয়ে বিশাল বিশাল মিছিলের আয়োজন করেছে। না, তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতে নয়, বরং এই সুযোগে মুসলিম-বিরোধী বিদ্বেষের বীজ কে চারায় রূপান্তরিত করতে, কাশ্মীরের মাটিতে ভারতের শাসকশ্রেণীর দ্বারা নিষ্ঠুর ভাবে জনগণ কে অত্যাচার ও শোষণ করার কাজে সমর্থন আদায়ের স্বার্থে, আগামী নির্বাচনে মোদী ও বিজেপি কে আতঙ্কের থেকে ভোট দেওয়ানোর স্বার্থে এই মিছিলগুলি’র আয়োজন করা হয়েছে। এই মিছিলগুলি সিআরপিএফের নিহতদের শেষ যাত্রার মিছিলের জায়গায় গণতন্ত্রের অবশিষ্টের অন্তর্জলি যাত্রা হিসেবে বেশি কুখ্যাতি অর্জন করেছে। 

যত বেশি করে লাশ নিয়ে মিছিল বিজেপি ও আরএসএস করছে, তত বেশি করে দেশের প্রান্তে প্রান্তে কাশ্মীরি মানুষদের উপর বেছে বেছে হামলা করা হচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মীরে মুসলিম মানুষদের বেছে বেছে হামলার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তেরঙা ঝাণ্ডা নিয়ে মিছিল করে, পাকিস্তান কে গাল পেড়ে আসলে দেশজুড়ে মুসলিম বিদ্বেষের আগুনে হাওয়া দিয়ে নির্বাচনের আগে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করতে চাইছে বিজেপি ও মোদী সরকার। সারা দেশের সংখ্যাগুরু হিন্দু সমাজের মধ্যে তীব্র ভাবে কাশ্মীরি মানুষদের ব্যাপারে ও মুসলিম জনতার ব্যাপারে যে ভীতি গেড়ে বসে আছে তার আঁচে হাওয়া দিয়ে নিজের নির্বাচনী স্বার্থসিদ্ধি করে নেওয়াই এখন রাফ্যাল থেকে নীরব মোদী কাণ্ডে জর্জরিত বিজেপি’র অভিলাষ। এই অভিলাষ চরিতার্থ করতে বিজেপি ও আরএসএস কিন্তু যে কোন সীমা ছাড়িয়ে নোংরামো করতে পারে আর তা বুঝতে হলে আপনাকে রাজনীতি নিয়ে পিএইচডি করতে হবে না। 

প্যাটার্নটা কিন্তু সেই একই। জায়গায় জায়গায় কাশ্মীরি মানুষদের উপর আক্রমণের প্যাটার্নটা এক, আক্রমণের সমর্থনে সিআরপিএফের জওয়ানদের মৃত্যুর যুক্তি ব্যবহার করে অপরাধটাকে ঢাকার চেষ্টা চলছে। সেই ২০০২ সালে যেমন মোদী নিউটনের তৃতীয় নিয়ম উল্লেখ করে বলেছিলেন যে গুজরাটে মুসলিম নিধন যজ্ঞ আসলে গোধারা কাণ্ডের “রিয়্যাকশন” মাত্র, তেমনি আজ সাম্প্রদায়িক হিংসা কে, গণতন্ত্র-বিরোধী হিংসা কে জনগণের রোষ বলে চালানোর চেষ্টা করছে বিজেপি ও আরএসএস। 

দেশের সব বড়-ছোট সংবাদ মাধ্যমের মুখে কাপড় গুঁজে তাদের কোন ধরণের সরকারের সমালোচনা করতে দেওয়া হচ্ছে না। মোদী’র পদলেহী সব সংবাদ মাধ্যম যুদ্ধং দেহি মনোভাব নিয়ে এমন এক আলোচনা চালাচ্ছে যার সব দিকেই যুদ্ধ কে, হিংসা কে কাশ্মীরের মতন একটি জটিল সমস্যার সমাধান হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। এ এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। সংখ্যালঘু মানুষরা, বিজেপি বিরোধীরা আর হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ-বিরোধীরা যে কেউ এই আক্রমণের শিকার হতে পারেন।

আর এই হট্টগোলে কেউ একবারও জিজ্ঞাসা করার সাহস পাচ্ছে না যে পুলওয়ামায় সিআরপিএফের জওয়ানদের উপর আক্রমণ কাদের ব্যর্থতায় হলো? কে এর দ্বায়িত্ব স্বীকার করছেন? কে পদত্যাগ করলেন? কেন মোদী সরকারের কাশ্মীর নীতি কাশ্মীর কে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিল?   

দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে কাশ্মীরের সমস্যা কে নিজ রণনৈতিক কারণে জিইয়ে রেখেছে ভারতের শাসকশ্রেণী। স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরের মানুষের সাথে গণভোট নিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে প্রতারণা করার পরেই কিন্তু বিদেশী শক্তির অনুপ্রেরণায় ১৯৮৯ সাল থেকে জঙ্গী আন্দোলন গড়ে ওঠে কাশ্মীর উপত্যকায় যার জের আজ পর্যন্ত চলছে। 

চরম সামরিক আগ্রাসন ও দৈনিক অকথ্য অত্যাচার, গুমখুন, ধর্ষণ ও ব্যাপক হারে ভারত রাষ্ট্রের দ্বারা নিরীহ স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরিদের নরসংহার হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার দাবির থেকে, নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির থেকে এক চুলও নড়েননি। প্রতি গ্রীষ্মে বরফ গললে তারা কিন্তু পথে নেমে বিশ্বের চতুর্থ শক্তিশালী সেনা বাহিনীর সাথে হাতে পাথর নিয়ে যুদ্ধ করেন, গুলি বা ছররা খেয়েও তারা গলা ফাটিয়ে ভারতের থেকে স্বাধীনতা চান।

হায়না যেমন লাশের ঘ্রাণ পেয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে ওঠে, আমাদের পেট ভরে খেতে পাওয়া, মোটা অর্থ আয় করা, সাবর্ণ উচ্চবিত্ত ও শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তথাকথিত দেশপ্রেমের ধ্বজ্জাধারীরা ঠিক তেমনি কাশ্মীরের মাটিতে সেনা বা আধা বা সিকি সেনার গুলিতে প্রাণ হারানো কাশ্মীরি মানুষের লাশ দেখে সেই রকমই উল্লাস প্রকাশ করে। কাশ্মীরের শিশুর চোখ লক্ষ্য করে ভারত রাষ্ট্র ছররা ছুড়লে তারা হুইস্কির গ্লাসে তুফান তুলে সেই ঘটনা কে স্বাগত জানায়। তারা ক্ষেপে যায় শুধু কাশ্মীরের মানুষ কে পাল্টা প্রতিরোধ করতে দেখলে। তারা রেগে যায় জনগণ কে পাথর ছুড়তে দেখলে। কারণ তখন তাদের জাতীয়তাবাদী অনুভূতিতে সুড়সুড়ি লাগে। 

কাশ্মীরের মাটিতে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার ৩০ বছরে প্রায় ১০০,০০০ মানুষ খুন হয়েছেন, যাদের সিংহভাগ’ই কিন্তু সাধারণ মানুষ। অনেক ভুয়ো এনকাউন্টার, কাস্টডিয়াল ডেথ, গুম খুন করে লাশ গোপন স্থানে কবর দিয়ে দেওয়া, নারীদের সামরিক বাহিনীর দ্বারা গণধর্ষণ করানো, ইত্যাদি, অকথ্য অত্যাচার দীর্ঘদিন ধরে বিরামহীন ভাবে চলছে। তবুও এই রাষ্ট্রীয় হিংসা, রক্তপাত ও নারীর উপর অত্যাচার হিন্দুত্ববাদের গরল পান করা তথাকথিত দেশপ্রেমিকদের উদ্বেলিত করে না। 

তারা প্রশ্ন করেননা ভারতের জনতার রক্ত ঘামের টাকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে আদায় করে নিজের রাজত্ব চালানো সরকার কে — যে কেন কাশ্মীরে এত রক্তপাত? কেন গণতান্ত্রিক ভাবে, আলোচনা করে এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান না খুঁজে শুধুই বন্দুকের নলের থেকে সমাধান বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার? কেন সরকার কাশ্মীরি মানুষদের মানুষ না ভেবে শুধুই বন্দুকের টিপ প্র্যাকটিস করার উপকরণ হিসেবে গণ্য করছে? 

তারা উদ্বেলিত হয় না কারণ তাদের দেশপ্রেম তাদের মতনই ঠুনকো। তাদের দেশপ্রেম অমর শহীদ ভগত সিং, রাজগুরু, সুখদেব, মাস্টারদা সূর্য সেন, বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম, ইত্যাদির দেশপ্রেমের মতন সাচ্চা না, বরং হেগড়েওয়ার, গোলওয়ালকার, সাভারকার বা শ্যামা মুখুজ্জ্যে’র মতন নকল দেশপ্রেম, সাম্রাজ্যবাদের জুতো চাটার বহিঃ আবেশ, যাতে তাদের আসল ঘৃণ্য চেহারাটা প্রকাশিত না হয়। 

এরা দেশ বলতে বোঝে এক টুকরো মাটিকে, পাথরকে, পাহাড় আর নদীকে, এরা দেশ বলতে বোঝে দেশের জমি ও সম্পদ কে। দেশের ব্যাখ্যায় এদের অভিধানে মানুষের কোন স্থান নেই। তাই মানুষ কে মেরে ফেলা চলবে তবে জমি এদের চাইই চাই। যখন বিদেশী কর্পোরেশনগুলি ভারতের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে যায়, ভারতের মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিরা যখন জনগণের করের টাকা চুরি করে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করে, দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন বিদেশী পুঁজির গোলামী করে, তখন এদের দেশপ্রেম ঘুমিয়ে থাকে লেপ মুড়ি দিয়ে। 

যখন কোন বেহায়া হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রাক্তন মহারানী ভিক্টোরিয়া’র জন্মদিন পালন করে তাঁকে দেশের রক্ষাকারী বলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন কে স্বাগত জানায়, তখন এরাই নির্লজ্জের মতন তাঁকে সাবাস বলে পিঠ চাপড়ায়। অনাহারক্লিষ্ট আদিবাসীরা যখন না খেতে পেয়ে মরে যায় তখন এরা ফাস্টফুড খেতে ব্যস্ত থাকে, যখন রাইফেলের জোরে, রকেট লঞ্চারের জোরে ছত্তিশগড় বা ঝাড়খণ্ডের আদিবাসীদের সরকার তাঁদের গ্রাম, জঙ্গল বা জমির থেকে উচ্ছেদ করতে চায়, তখন “উন্নয়নের” ডঙ্কা বাজিয়ে এই অকাল কুষ্মান্ডের দল তা সমর্থন করে। এর ফলেই নির্লজ্জ ভাবে বুক বাজিয়ে কাশ্মীরের জনগণের ওপর চলমান অত্যাচার ও শোষণ কে এরা দুই হাত তুলে সমর্থন করতে পারে আর জনগণের পাল্টা প্রতিরোধ কে, তাদের পাল্টা সংগ্রাম কে ভীষণ ভাবে ঘৃণা করতে পারে, কারণ মানুষ এদের শত্রু আর বৃহৎ পুঁজির ছুড়ে দেওয়া হাড় এদের খাদ্য।

তাই আধা সেনা হত্যার বিরোধিতা করার নাম করে যারা আরো বেশি বেশি করে হিংসা চালাতে চাইছে, যারা সরকার কে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন না করে ঝুটা দেশপ্রেমের জিগির তুলে সরকার বিরোধীদের, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী বিরোধীদের উপর একেবারে পরিকল্পনা করে হামলা করতে শুরু করেছে, তারা কিন্তু আজ দেশের জনগণের, খেটে খাওয়া মানুষের বড় শত্রুতে পরিণত হয়েছে। 

সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদির মাধ্যমে আরএসএস’র পুষ্যি বাহিনী বিরোধীদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করছে, সিআরপিএফের মৃত জওয়ানদের রেফারেন্স টেনে এনে বাম ও গণতান্ত্রিক বিরোধীদের হিটলারের কায়দায় হত্যা করার ষড়যন্ত্র কে উন্মোচন করছে। তার কারণ হলো এই বিরোধীরা মোদী সরকারের অপদার্থতা কে তুলে ধরে কঠিন প্রশ্ন তুলছেন, খেটে খাওয়া মানুষের খাদ্য-রোজগার-স্বাস্থ্য-শিক্ষা-সামাজিক সুরক্ষার দাবি তুলে সরকারকে তুলোধুনো করছেন, শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি মানুষের কথা তুলে উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচারের ঝড় কে রুখে দিচ্ছেন। তাই বিরোধীদের দমন করা আজ বিজেপি-আরএসএস ও তাদের পেয়াদাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সামনে কঠিন সময়। উগ্র জাতীয়তাবাদ, যুদ্ধের জিগির আর সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে বিজেপি আগামী নির্বাচনে বিজয় অর্জন করতে চাইবে। তারা চাইবে সমস্ত বিরোধীদের নিস্তব্ধ করে দিয়ে দেশের জনগণের শ্রম, দেশের খনিজ সম্পদ, মাটি, জঙ্গল ও জল বৃহৎ বিদেশী একচেটিয়া পুঁজি ও তাদের দালাল দেশী মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিতে। মোদী চাইবে সাম্প্রদায়িক ভাবে বিভক্ত দেশের জনগণের উপর ছড়ি ঘুরিয়ে নিজের সিন্দুকে ধনের পাহাড় জড়ো করতে। দেশের মানুষ খেতে চাইলে, রোজগার চাইলেই তাদের পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ দেখানো হবে, দেশপ্রেমের নাম করে রাষ্ট্র প্রেম শেখানো হবে। আর এই সোজা হিসাবটা যদি কেউ জনগণের সামনে তুলে ধরতে চান তাহলেই তাকে “দেশদ্রোহী” তকমা পেয়ে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে হবে। 

কাশ্মীরি জনগণের উপর চলতে থাকা আক্রমণ কে রুখতে, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল মানুষের উপর হতে থাকা আক্রমণ কে রুখতে, দেশের নানা প্রান্তে যুদ্ধ উন্মাদনা  সৃষ্টি করার বিরুদ্ধে লড়াকু শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের উপর চলমান রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও হিন্দুত্ববাদী আক্রমণ কে রুখতে আজ পথ নিতে হবে সক্রিয় প্রতিরোধের আর তা করতে গেলে প্রথমেই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে রাজনৈতিক ভাবে জাগ্রত করে তাদের নেতৃত্বে উত্তীর্ণ করতে হবে এই প্রতিরোধ সংগ্রামের। 

খাদ্যের দাবি, কর্ম সংস্থানের দাবি, কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্যের দাবি, শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন ₹১৮,০০০ করার দাবি, শিক্ষা খাতে জিডিপি’র ১০% বরাদ্দ করার দাবি, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা কে ঢেলে সাজিয়ে জনগণ কে বিনামূল্যে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা দেওয়ার দাবি, দলিত-আদিবাসী-মুসলিম-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষদের সমান অধিকার ও বৈষম্যহীন সুযোগের দাবি তুলে আজ জনগণ কে তাদের শত্রু মোদী ও তাঁর নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টেনে আনতেই হবে। একমাত্র শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি জনতার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই পারবে মানুষের জীবন কে যুদ্ধের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে ও ভারতবর্ষের মাটিতে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ কে কবর দিতে। তাই বিলম্ব না করেই বাস্তবের মাটিতে এই লড়াইয়ে মানুষের শত্রু কে পরাস্ত করতে এগিয়ে আসুন, জনতার সাথে একাত্ম হোন আর প্রতিরোধের  রাজনীতি দিয়ে তাদের সৃজনীশক্তি’র বিকাশ ঘটান। 


অমিত শাহ ও বিজেপির এনআরসি আর নাগরিকত্ব বিল নিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাটাছেঁড়া

মোদী ও অমিত শাহের বঙ্গ ভঙ্গ রাজনীতি

কিছুদিন আগে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ মালদায় এসে দলীয় সভা করে বাংলা দখল করার স্বপ্নের দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালেন। ১৯শে ফেব্রুয়ারি চার লক্ষ মানুষের জমায়েত করিয়ে ব্রিগেড সমাবেশে মমতা বন্দোপাধ্যায় যে ভাবে ২২-২৩টি ছোট-মাঝারি-বড় বিজেপি-বিরোধী দল কে একত্রিত করে মোদী সরকারের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নিজের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অভিলাষা কে সুপ্ত ভাবে প্রকাশিত করলেন, তাতে বিজেপি'র অনেক হিসেবেই ভণ্ডুল হতে পারে। এই ব্রিগেড সমাবেশের পর থেকেই বিরোধী ঐক্য কে কটাক্ষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপির তাবড় নেতারা একের পর এক ভাষণ দিয়ে জনতা কে বোঝাবার চেষ্টা করছেন যে মোদীর কোন বিকল্প হয় না। এরই মাঝে অমিত শাহের বাংলায় আগমন কয়েকটা কারণে ভীষণ চর্চিত হয়ে ওঠে এবং তাই এই সফরের পিছনের রাজনীতিকে গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে।

ডিসেম্বর মাসে বিজেপি'র বহু চর্চিত তিনটি রথ যাত্রা কে জনতার চাপে আদালত কে নিষিদ্ধ করতে হয় এবং এর ফলে অমিত শাহের রাজ্যে এসে ঘটা করে মন্দিরের ঘণ্টা বাজিয়ে বিজেপি'র ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের প্রচার শুরু করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফেব্রুয়ারি মাসে জল মাপতে নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গে সভা করতে আসতে চেয়েছিলেন। বিজেপি'র পরিকল্পনা হলো হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগিয়ে, সাম্প্রদায়িক হানাহানি লাগিয়ে যে করেই হোক পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসনের ২২টি জিতে সর্ব বৃহৎ দল হওয়া। অথচ মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দ্বারা যে ভাবে সরকারি শক্তি ব্যবহার করে চার লক্ষ মানুষের ভিড় জোগাড় করা সম্ভব সেই ভাবে নরেন্দ্র মোদী’র দ্বারা বা বিজেপি'র দ্বারা তৃণমূল শাসিত পশ্চিমবঙ্গে বাস, ট্রেন ও ট্রাক বোঝাই করে লোক আনা সম্ভব নয়। তাই রাজ্য বিজেপি কায়দা করে নরেন্দ্র মোদী'র সভা পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর ফাঁকে এসে অমিত শাহ সংখ্যালঘু মুসলিম জনবহুল মালদা জেলায় সমাবেশ করে হিন্দুত্ববাদী জিগির তুলে গেলেন আর তরুপের তাসের মতন ব্যবহার করলেন এনআরসি ও নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬’র মতন জনবিরোধী অস্ত্রগুলি।

অমিত শাহ বললেন যে আসামে এনআরসি প্রক্রিয়ায় নাম বাদ চলে যাওয়ায় কোন বাঙালি হিন্দু কে আতঙ্কিত হতে হবে না, মোদী সরকার নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬ ব্যবহার করে তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়াবে। এই ভাষণে তিনি বলেন যে “হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ কারুরই এনআরসি নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।” এই কথা তিনি ঠিক এমন সময়ে বললেন যখন শুধু আসাম নয় বরং সমগ্র উত্তর পূর্ব ভারত জুড়ে চলছে নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬ বিরোধী এক সুতীব্র আন্দোলন। বিজেপি'র সঙ্গ ত্যাগ করে অগপ’র মতন তীব্র অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলি কিন্তু আজ বিরোধী শিবিরে যোগদান করেছে। মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, প্রভৃতি রাজ্যে এই বিলের বিরোধিতা করেছে বিজেপি'রই জোট সঙ্গীরা।

এরই মধ্যে আসামে বিজেপি'র অভ্যন্তরে বাঙালি হিন্দু বনাম আসামি বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠায় হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতন সংঘের সবচেয়ে নাম করা নেতাদেরও রাম মাধবের মতন আরএসএস নেতাদের শরণাপন্ন হতে হয়। রাম মাধবের নেতৃত্বে বিজেপির নেতারা আসামে যখন দ্বন্ধ নিরসনে ব্যস্ত ঠিক তখন বিজেপি সভাপতি বাংলা'র মাটিতে দাঁড়িয়ে কেন হঠাৎ করে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করলেন জোর গলায় ঘোষণা করে যে সমস্ত বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা বাঙালি হিন্দুদের সরকার আইন করে নাগরিকত্ব দেবে? বিজেপি’র কি আসাম, ত্রিপুরা সহ অন্যান্য উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতে নিজের শক্তি ধরে রাখার কোন ইচ্ছা নেই? বিজেপি কি বাঙালি ভোট পেতে সমগ্র উত্তরপূর্বে নিজের জমি হারিয়ে দিতে রাজি? এটা কি বিজেপি'র নতুন বাঙালি প্রেম?

আসলে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের এই বাঙালি হিন্দু প্রীতি দেখানো আর মোদী সরকারের নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬, পাশ করানোর প্রচেষ্টার মধ্যে নিহিত আছে এক গূঢ়  অভিসন্ধি। প্রথমতঃ অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদী সহ সমগ্র সংঘ পরিবার জানে যে সংবিধানের ধারা ১৪ অনুসারে ভারত রাষ্ট্র মানুষের মধ্যে (নাগরিক ও অনাগরিক নির্বিশেষে) ধর্ম, জাতি, ইত্যাদির ভিত্তিতে কোন ধরণের প্রভেদ করতে পারবে না। সেই জায়গায় একটি ধর্মের মানুষ কে নাগরিকত্ব থেকে বেছে বেছে বঞ্চিত করার পরিকল্পনা আসলে সংবিধানের ভিত্তিকেই আক্রমণ করে। এই কারণেই দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ে চ্যালেঞ্জ করা হলে এই আইন ধোপেও টিকবে না।

দ্বিতীয়তঃ এনআরসি’র ভিত্তি হলো আসাম চুক্তি ১৯৮৫, আর এই চুক্তি অনুসারে আসামে ২৪শে মার্চ ১৯৭১ এর পর থেকে প্রবেশ করা মানুষদের বিদেশী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাঁদের নাগরিকত্ব খারিজ করা হবে। জনবিরোধী ও তীব্র জাতি-বিদ্বেষী (পড়ুন বাঙালি বিদ্বেষী) এই এনআরসি কে বিজেপি পূর্ণ সমর্থন করে, তবে ধর্মের ভিত্তিতে। এই এনআরসি’র চূড়ান্ত খসড়া তালিকায় নাম ওঠেনি ৩.২ কোটি মানুষের মধ্যে ৪০ লক্ষ মানুষের, যাদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই বাঙালি, হিন্দু ও মুসলিম উভয়ই। এবার বিজেপি'র আনা নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬, অনুসারে মুসলিম বাদে যে সকল উদ্বাস্তু মানুষ বাংলাদেশ থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতে এসেছেন তাঁরাই নাগরিকত্ব লাভ করবেন।

যদি বিজেপি'র আনা সংশোধনী আইন মেনে নাগরিকত্বের শেষ দিন নতুন ভাবে নির্ধারণ করা হয় তাহলে বাঙালি মুসলিমরা কেন ২৪শে মার্চ ১৯৭১ এর হিসেবে ‘বিদেশী’ হিসেবে গণ্য হয়ে নিজেদের অধিকার হারাবেন? কী কারণে মুসলিমদের সাথেই শুধু আসাম চুক্তি, ১৯৮৫, অনুসারে বিমাতৃসুলভ ব্যবহার করা হবে? কেন ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারা কে এই নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬, এর মাধ্যমে লঙ্ঘন করা হবে? এই সমস্ত প্রশ্নগুলো উঠলে বিজেপি বা তার ভাড়াটে বাহিনীর পক্ষে জবাব দেওয়া সম্ভব না, শুধুই ধর্মীয় ঘৃণার জিগির তুলে এক দল লোককে ক্ষেপিয়ে তুলে মেরুকরণ করার চেষ্টা চালানোই বিজেপি ও মোদী সরকারের পক্ষে সম্ভব। আর আজ আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তাই করার চেষ্টা তারা চালাচ্ছে।

এবার ধরুন বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমের প্রশ্নে। ইসলামিক ফ্যাসিবাদের অত্যাচার থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আর তারপরে বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসামে এসেছেন লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দুরা। আসামে বহু বাঙালি মুসলিমরাও এসেছেন একটু রোজগারের আশায়, একটু পেট ভরে দুই বেলা খেতে পাওয়ার আশায়। তবে উদ্বাস্তু মুসলিমদের থেকে আসামে ব্রিটিশ শাসকদের দ্বারা উত্তরবঙ্গের থেকে, বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রাম জেলাগুলি থেকে বহু মুসলিম কৃষক পরিবার কে আসামে নিয়ে আসা হয় ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে যাতে তারা চাষাবাদ করে সরকারের খাজনা বাড়াতে পারে। তাই দক্ষিণ আসামের বা নমনি আসামের বহু জেলায় মুসলিম বাঙালিদের সংখ্যা বেশি। তেমনি শিলচর সহ সমগ্র বরাক উপত্যকায় বাঙালি হিন্দুদের সংখ্যা অনেক বেশি।

বাংলাদেশ থেকে ইসলামিক ফ্যাসিস্ট আক্রমণের কারণে ছিন্নমূল হয়েছেন যে সমস্ত বাঙালি হিন্দুরা, ঐতিহাসিক কারণেই তাদের একটা অংশ এখনো একটা ইসলাম বিদ্বেষে ভোগেন এবং তাই তাদের পক্ষে স্বাভাবিক ভাবে বাঙালি মুসলিমদের সাথে মিলেমিশে থাকা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফলে তাঁরা অচিরেই বিভেদকামী ও বাঙালি-বিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাতের পুতুল হয়ে ওঠা শুরু করেন। অনেক বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুরা বিজেপির প্রচারের বিরুদ্ধে গিয়েও তাদের বাঙালি ঐতিহ্য কে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং বাঙালি মুসলিমদের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছেন হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ কে ও অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের পরাস্ত করতে।  

নিজের জন্মভূমিতে, নিজের মাটিতে মানুষের যদি দুই বেলার আহারের বন্দোবস্ত হয়, তাঁদের মাথার উপর যদি ছাদ থাকে আর তাঁদের প্রাণ যদি নিরাপদে থাকে তাহলে সেই মানুষদের কোন ভাবেই ছিন্নমূল হয়ে ভেসে বেড়াতে হয় না। ১৯৭১ সালের পর থেকেই ভারতের নয়া উপনিবেশ হিসেবে বাংলাদেশ টিকে আছে আর তাই অনেক বাঙালি মুসলিম ও হিন্দুরা কৃত্রিম সীমানা পেরিয়ে নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যে দুই বেলা করে কম্মে খেতে আসামে এসেছেন। এই বাঙালি মুসলিম ও আসামে যুগ যুগ ধরে শোষণ, বঞ্চনা ও অত্যাচার সয়ে বাস করা বাঙালি মুসলিমেরা মিলে একটা বড় ভোট ব্যাঙ্কে পরিণত হয়েছেন এবং এই ভোট ব্যাঙ্কটা থাকলে বিজেপি বা অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের ভোটে সুবিধা করা মুশকিল আর তাই এই ভোট ব্যাঙ্ক ভাঙ্গা এদের দুইজনের পক্ষেই প্রচন্ড দরকারি।

তাই এনআরসি দিয়ে যখন অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালিদের জোর করে আসামের থেকে ভিটেচ্যুত করে আবার একবার উদ্বাস্তু বানাতে চায়, ঠিক তখনই বিজেপি চেষ্টা করে নেপোয় মারে দই’র মতন জোর করে বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব প্রদান করে অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বাঙালি মুসলিমদের করতে চায়। এতে বিজেপি'র এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব হবে।

অহমীয় ও বাঙালি মুসলিম মিলিয়ে দেখলে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা ভোটের ফলাফল নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদের অর্ধেকের বেশি কে যদি ভোটার তালিকা থেকেই বাদ দেওয়া যায় তাহলেও কিন্তু বিজেপি বা অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের অনেক লাভ। আর যদি আসামে কয়েক লক্ষ বাঙালি হিন্দু ভোটার কে নাগরিকত্ব দিয়ে থিতু করানো যায় তাহলে সেই পথ ধরে পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দুদের কাছেও বিজেপি নিজের গ্রহণ যোগ্যতা বাড়িয়ে তুলতে পারবে। আসামের জনসংখ্যায় বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের যদি একটি প্রকান্ড শক্তি হিসেবে স্থাপন করা যায় তাহলেই পশ্চিমবঙ্গে ও ত্রিপুরায় বিজেপির পোয়াবারো হবে।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা আসন সংখ্যা হলো ৪২ আর সমগ্র উত্তরপূর্বের সাত ভগিনী রাজ্যের মিলিত লোকসভা আসন সংখ্যা হলো ২২। ফলে বিজেপি'র পক্ষে বাঙালি আর বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তু ভোট ব্যাঙ্কটিকে স্বযত্নে লালনপালন করা ও সাম্প্রদায়িক গরল ঢেলে এই সম্প্রদায়টিকে বাঙালি মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাঁতিয়ে তোলা অত্যন্ত লাভজনক। এরই সাথে সমগ্র উত্তরপূর্বে আদিবাসী, উপজাতি খ্রিস্টান ও পেগান জনগণের উপর হিন্দুত্ববাদের প্রতিপত্তি কায়েম করার জন্যেও কিন্তু বাঙালি হিন্দুদের ব্যবহার করা যাবে খুবই সহজে।

অনেকে যদি মনে করে থাকে যে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুরা বিজেপির নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬, এর মাধ্যমে লাভবান হবেন তাহলে তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার চেয়ে বেশি একটা ভোট ব্যাঙ্ক বানানো, মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক ধ্বংস করা ও এই বাঙালি হিন্দু বনাম বাঙালি মুসলিম দ্বন্ধের সুযোগ নিয়ে সমস্ত উত্তরপূর্বের থেকে সম্পদ লুঠ করার প্রক্রিয়া কে তীব্র করে তুলবে বিজেপি আর এর লাভ তুলবে হাতেগোনা কিছু হিন্দি-ভাষী বেনিয়া মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিরা ও তাঁদের মালিক - বৃহৎ বিদেশী একচেটিয়া ও লগ্নি পুঁজি।

আজ সঠিক লাইন এনআরসি বিরোধিতা করা ও নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬ সমর্থন করা নয়, আজ সঠিক লাইন নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল, ২০১৬ বিরোধিতা ও এনআরসি সমর্থন করাও নয়। সঠিক লাইন হলো গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে, অর্থনৈতিক সমতা ও জনতার হাতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ক্ষমতার জন্যে বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলা আর এই কাজে আসামে ও পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করা সকল গরিব মানুষের অংশগ্রহণ খুবই জরুরী। এই অংশগ্রহণ করাবার জন্যে প্রথমে খেটে খাওয়া গরিব বাঙালি হিন্দু, বাঙালি মুসলিম, বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ, বিভিন্ন  জনজাতির মানুষ ও অহমীয় হিন্দু ও মুসলিমদের একত্রিত করতে হবে কে আসল মিত্র আর কে আসল শত্রু তা চিনিয়ে দিয়ে।

জনগণ যদি শ্রেণীসংগ্রামের রাজনীতি কে  আঁকড়ে ধরতে পারেন, একটি প্রগতিশীল, বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব যদি জনগণ কে আগুয়ান হয়ে পথ দেখাতে পারে, নিজ সৃজনশীল দক্ষতা কে ব্যবহার করে যদি ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম কে সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল অনুসরন করে পরিচালনা করা যায় তাহলে অমিত শাহের বাঙালি মননে ও চেতনায় বিরাজ করে রাজত্ব করার সাধ ঘুঁচিয়ে দেওয়া সম্ভব।

২২-২৩টি সংসদীয় দলের রামধনু রঙের সুবিধাবাদী জোটের দ্বারা ভোটের মাঠে বিজেপি কে কোথাও কোথাও ল্যাং মারা সম্ভব হলেও, আরএসএস দ্বারা প্রচারিত মুসলিম-বিদ্বেষ ও হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী রাজনীতির রেশ কিন্তু কাটবে না বরং তলে তলে বেড়ে চলবে আর পাঁচ বছর পরে আবার পুনরায় তীব্র শক্তি নিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা চালাবে। তাই হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ কে খতম করার পথ হলো গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি এবং যে সকল উৎপাদন সম্পর্ক এই শত্রুদের সমর্থন করছে ও রসদ যোগাচ্ছে তাদের উৎখাত করা।

অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদী'র বাংলা কে দখল করে নিজেদের ঘাঁটি বানানোর প্রচেষ্টা কে  রুখে দিতে, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ সহ নানা জায়গায় বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা কে আটকাতে আজ এক বৃহৎ ও ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম দরকার, যে সংগ্রাম এই বিজেপি ও আরএসএস এর সরবাহ লাইনকে কাটতে সক্ষম হবে ও বাংলার রাজনৈতিক পুণ্য ভূমিতে সাম্প্রদায়িক হিংসা, বিদ্বেষ ও মানুষে-মানুষে বিভেদের রাজনীতি’কে  চিতা কাঠে তুলতে পারবে। সেই সংগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে আজ সমস্ত গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল ফ্যাসিবিরোধী মানুষ কে একত্রিত করে পথে নামতে হবেই। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর তাই আমাদের লেনিনের মহান উক্তি - “বিলম্ব মানেই মৃত্যু” মনে রেখে নিজেদের গতি ও মনের প্রসারতা, দুটোই বাড়াতে হবে।

ভাঙন নয় জনতার ঐক্যেই আসামে NRC ও হিন্দুত্ববাদ কে উচ্ছেদ করতে পারে

Assam NRC List a conspiracy by the Hindutva camp


আসাম সরকারের জাতীয় নাগরিক রেজিস্টারের (NRC )চূড়ান্ত খসড়া তালিকায় নাম বাদ গেল ৪০ লক্ষ মানুষের, যাঁরা এই মুহূর্তে এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়ে অপেক্ষা করছেন।
এই ৪০ লক্ষ মানুষের, যাঁদের শ্রেণী-জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ পরিচয় ও অনুপাত এখনো জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি, তাঁদের সামনে আছে এক মহা বিপদ, রুজি-রুটি ভিটে ও অনেকেরই ক্ষেত্রে পরিবারের থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বিপদ, সারা জীবন বিনা বিচারে কয়েদ থাকার বিপদ। তাঁদের হয় আবার
নিজেদের বাসস্থানের নিকট NRC কেন্দ্রে গিয়ে পুনরায় নিজেদের নথিপত্র জমা করে প্রমাণ করতে হবে
যে হয় তাঁরা অথবা তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ২৪শে মার্চ ১৯৭১ থেকে আসামে বাস করছেন, অথবা নিজ
ভূমিতে বিদেশী তকমা নিয়ে বন্দি হতে হবে ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে।



চতুর্দিকে এই আসামের NRC গঠন ও তার সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা তর্ক বিতর্ক চলছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করছে এবং লড়াইটা এখন মিডিয়ার দৌলতে শুধু তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে বিজেপির লড়াইতে পরিণত হয়েছে কারণ ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতি গ্রহণ করে সব রাজনৈতিক দলই, বিশেষ করে বিজেপির বিরোধীরা নিজেদের মতামত মিনমিন করে ব্যাখ্যা করে হাত তুলে দিয়েছে। তবে ভোট ব্যাঙ্কের স্বার্থে মমতা বন্দোপাধ্যায় ও বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্ব কিন্তু একে অপরের সাথে বাকযুদ্ধে সামিল হয়েছে। নীতিগত ভাবে “অনুপ্রবেশ” ঠিক কি বেঠিক সেই নিয়েও ভারতের চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় অধিকারী ধনিক শ্রেণী ও সাবর্ণ শহুরে মধ্যবিত্ত কিন্তু ভীষণ তর্ক করে চলেছে, বিশেষ করে “বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের” তাড়ানোর জন্যে। যে ভারতের মানুষেরা ইউরোপ ও মার্কিন দেশে দলে দলে বেআইনি ভাবে অনুপ্রবেশ করে বাস করে নাগরিকত্ব গ্রহণ করে নিজেদের Non Residential Indian  বলে সমাজে পরিচয় দিয়ে ছেলের বিয়েতে মোটা অঙ্কের যৌতুক দাবি করে, তারাই আবার প্রতিবেশী বাংলাদেশের মানুষদের ভারতে দেখতে পেলে গুলি করে মারার পক্ষে ওকালতি করে।

এই ৪০ লক্ষ ভিটেচ্যুত হতে চলা মানুষের অধিকাংশই যে শ্রেণীগত ভাবে গরিব সে কথা আলাদা করে জানান দেওয়ার দরকার নেই কারণ ভারতবর্ষে পকেটে টাকা থাকলে পরিচয়পত্র ও বসবাসের প্রমাণ নিজে চলে আপনার হাতের মুঠোয় আসবে। বলা হচ্ছে যে NRC গঠন হয়েছে “বেআইনি বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী” মানুষদের আসাম থেকে দূর করার জন্যে ১৯৮৫ সালের Assam Accord  অনুসারে। এই Assam Accord আসলে অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলির সাথে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রতিক্রিয়াশীল জনবিরোধী চুক্তি যার মূল ভিত্তি ছিল তীব্র বাঙালি বিদ্বেষ, যে বাঙালি বিদ্বেষ কে তুমুল ভাবে আসামে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কালে ছড়ানো হয়েছিল শাসকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্যে। এই Assam Accord বা আসাম চুক্তি সই হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত ছিল কিন্তু আসামের রক্তাক্ত বাঙালি বিরোধী সন্ত্রাস অভিযান।

আসামের রক্তাক্ত বাঙালি-বিদ্বেষী রাজনীতি ও তার প্রভাব

দেশ ভাগের পরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর, বিশেষ করে হিন্দু বাঙালিদের উপর, পাকিস্তানী শাসক শ্রেণীর অত্যাচার যখন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন পূর্ব বাংলার থেকে প্রাণ হাতে অনেক মানুষ পালিয়ে এসে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে আশ্রয় নেন। তার আগে অবশ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসন কাল থেকেই বাঙালি কৃষকদের সিলেট জেলা থেকে  নিম্ন আসামের গোয়ালপাড়া, করিমগঞ্জ, কোকরাঝাড় সহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হতো চাষাবাদ করিয়ে সরকার বাহাদুরের খাজনা বাড়ানোর জন্যে। রেল লাইন পত্তন ও রেল কোম্পানির কাজের জন্যে বর্তমান বিহার থেকে অনেক শূদ্র হিন্দুদের ও দলিতদের নিয়ে আসে ব্রিটিশ শাসকেরা, ঠিক তেমনিই আবার চা বাগান গড়ে তোলার জন্যে ও চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্যে দলে দলে আদিবাসীদের বর্তমান ভারতের ছত্তিসগড়, ঝাড়খন্ড ও বিহার থেকে নিয়ে আসা হয় আসামে। উত্তর বঙ্গের কোচবিহার সেই সময়ে রাজবংশী কোচদের রাজ্য ছিল এবং দেশভাগের পরে যখন কোচ রাজত্ব ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় তখন অনেক অঞ্চল আসামে আসে আর কিছুটা অংশ পশ্চিমবঙ্গে। পেটের টানে অনেক নেপালি গরিব মানুষ উত্তরবঙ্গ হয়ে আসামে ঢোকেন এবং সেখানে থিতু হন, অনেকে বলেন যে দার্জিলিং জেলার চেয়ে বেশি গোর্খা জনগণ কিন্তু আসামে বাস করেন। এই নানা জাতির নানা ভাষার মানুষের সাথে সমগ্র উত্তর পূর্বের থেকে দলে দলে বিভিন্ন জনজাতির মানুষও এসে আসামে নিজেদের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন, তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন রুজি রোজগারের কোন না কোন উপায়। এই সমস্ত মানুষের আগমনের ফলেই আসাম হয়ে উঠেছিল বিবিধ ও প্রাণবন্ত এক প্রদেশ।  

তবে শ্রেণী বিভক্ত সমাজে, যে সমাজে অধিকাংশ মানুষের শ্রমের থেকে মুনাফা নিংড়ে নিয়ে নিজেদের চর্বি বাড়িয়ে চলে একটি সংখ্যালঘু শ্রেণী, আদর্শ স্থান বা সহনশীলতা ও শান্তির স্থান বলে কিছুই হয় না। ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের পরে যখন ভারতের মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিরা দেশ শাসনের অধিকার পায় ব্রিটিশ শাসকদের থেকে, তখন থেকে আসামের জনমানসে, বিশেষ করে সংখ্যাগুরু অহমীয়া মানুষের মনে বাঙালি-বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ রোপন করা শুরু করে ভারতের শাসক শ্রেণী, যারা জাতিগত ভাবে উত্তর অথবা পশ্চিম ভারতীয় হিন্দি, মারওয়াড়ি বা গুজরাটি ভাষী মুৎসুদ্দি বেনিয়া। ব্রিটিশ শাসনকাল থেকেই যেহেতু আসামে সরকারি হাকিম-আমলা থেকে চা বাগানের ম্যানেজার বা জঙ্গলের রেঞ্জার, সমস্ত উচ্চ পদেই সাবর্ণ ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের বাঙালিদের আধিপত্য ছিল এবং অত্যাচারী শাসক শ্রেণীর সাথে তাঁদের সম্পর্ক বেশ নিবিড় ছিল, তার ফলে সাধারণ অহমীয়া জনগণ ও আদিবাসী মানুষেরা এই সম্প্রদায়ের প্রতি মনে একটা বিদ্বেষ পুষে রেখেছিল। সেই বিদ্বেষ কে কাজে লাগিয়েই আসামের মাটিতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় শাসক শ্রেণী নিজের আধিপত্য বিস্তার করা শুরু করে।

উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় মুৎসুদ্দি বেনিয়ারা ও আমলারা যখন তথাকথিত স্বাধীন ভারত সরকারের বন্দুকের জোরে বলীয়ান হয়ে আসামের সম্পদের উপর নিজেদের মালিকানা কায়েম করা শুরু করলো এবং আসামের উপর আধা ঔপনিবেশিক শাসন কে শক্তিশালী করার জন্যে যখন তাঁদের নিজেদের প্রদেশের লোকেদের আমলা-হাকিম বানিয়ে আসাম সহ সমস্ত উত্তর পূর্বাঞ্চলের উপর চাপানো দরকারি হয়ে উঠলো, ঠিক তখন নিজেদের শোষণ ও অত্যাচারের থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে তাঁরা জাতি বিদ্বেষের বিষ বৃক্ষের বীজ রোপন করা শুরু করে। এই জাতি ঘৃণার জন্যে বাঙালিদের মূলত বেছে নেওয়া হয় কারণ তাঁদের বিরুদ্ধে, কয়েকজন সাবর্ণ উচ্চবিত্তের কারণে, বহুদিন ধরেই আসামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। এর সাথেই মনে রাখতে হবে যে আসামের বিস্তীর্ণ প্রান্ত জুড়ে রেল শ্রমিক, চা বাগান শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন গড়ে তোলা শুরু হয় এবং বামপন্থী রাজনীতির প্রভাবটা চীন বিপ্লবে কমিউনিস্টদের আসন্ন বিজয়ের সাথে সাথেই তীব্র হয়ে উঠতে থাকে। এই কমিউনিস্ট প্রভাব রুখতে এবং জাতি দাঙ্গার মাধ্যমে শ্রেণী সংগ্রামের আগুনে জল ঢালতে শাসক শ্রেণী বাঙালি বিদ্বেষী দাঙ্গার প্রথম আগুন জ্বালায় ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষদের কে লক্ষ করে।

১৯৪৮ এর দাঙ্গার পরে ১৯৫০ সালে আবার সমগ্র আসাম জুড়ে বাঙালি বিরোধী দাঙ্গা শুরু হয়, তারপর ১৯৫৫ সালে ফের দাঙ্গার আগুন লাগে। ১৯৬০ সালে শুরু হয় সবচেয়ে কুখ্যাত “বঙ্গাল খেদা” অভিযান। গোয়ালপাড়া থেকে শুরু করে সমস্ত আসামে হাজার হাজার বাঙালির উপর সংগঠিত আক্রমণ শুরু করে কংগ্রেসের মদতপুষ্ট শাসকশ্রেণীর গুন্ডা অহমীয় উগ্রপন্থীরা। অনেক আদিবাসী মানুষকেও এই জাতি দাঙ্গার অভিযানে প্ররোচনা দিয়ে এবং লোভ দেখিয়ে অংশগ্রহণ করানো হয়। সেই সময়ে ৫০,০০০ বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমদের পালিয়ে এসে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিতে হয়। বাড়িঘর, দোকানপাট সব কিছুই কংগ্রেস সরকারের বদান্যতায় উগ্রপন্থী গুন্ডারা দখল করে এবং আসামের সমাজে নিজেদের প্রতিপত্তি গড়ে তোলে। দক্ষিণ আসামের মাটিতে কমিউনিস্ট আন্দোলন কে নিষ্পেষিত করে অঙ্কুরে বিনাশ করার কাজে অনেক এগিয়ে যায়।  কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য কাউন্সিল অহমীয়া জাতির ভাষার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানালেও বাঙালিদের উপর জাতিগত আক্রমণের তীব্র বিরোধিতা করে। শাসক শ্রেণীর পূর্ণ সমর্থন প্রাপ্ত এই বঙ্গাল খেদা আন্দোলনের লুম্পেনরা শত শত মানুষ কে খুন করে, নারীদের ধর্ষণ করে এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। শহরে শহরে এর বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং অনেক জায়গায় জনগণ ধর্মঘট পালনও করেন।

অল্প কিছু অহমীয় ও আদিবাসী গুন্ডাদের দ্বারা পরিচালিত উগ্রপন্থী বঙ্গাল খেদা অভিযানটিকে গণ প্রতিরোধ হিসেবে চিহ্নিত করতে এবং এই জঘন্য জাতি সন্ত্রাসের পক্ষে বিপুল জন সমর্থন গড়ে তুলতে বারবার করে ভারতের শাসক শ্রেণী অহমীয় ও আদিবাসী মানুষদের “বাঙালি বহিরাগতদের” দ্বারা সামাজিক-অর্থনৈতিক ভাবে আক্রান্ত হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের পেটোয়া বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা এবং এই ভাবে জনমানসে একটি জাতির প্রতি তীব্র বিদ্বেষ সৃষ্টি করার বৌদ্ধিক প্রকল্প চালানো হয়। এক সময়কার তাবড় তাবড় তথাকথিত বামপন্থী বুদ্ধিজীবি মানুষ আসামের জনগণের নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির স্বার্থে পরিচালিত প্রগতিশীল লড়াই কে সমর্থন করতে করতে হঠাৎ করে প্রতিক্রিয়াশীল বাঙালি-বিরোধী হিংস্র কার্যকলাপের সমর্থক হয়ে উঠলেন। তাঁরা একটি জাতির নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষে সংগ্রাম করা ও অন্য জাতির প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে দাঙ্গা করার মধ্যে মোটা দাগের পার্থক্য দেখেও দেখলেন না এবং একটি জাতির আধিপত্যবাদী মানসিকতার থেকে তাঁরাও ক্রমাগত বাঙালি-বিদ্বেষী আন্দোলন কে সমর্থন করে থেকেছেন ও আজও এই পরম্পরা বর্তমান।   

১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি’র থেকে যে কৃষক বিদ্রোহের আগুন দেশের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়ে তার উত্তাপ আসামেও পৌঁছায় এবং তখন কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার ও ভারতের শাসক শ্রেণী প্রমাদ গোনে, কারণ আসামের মাটিতে সশস্ত্র শ্রেণী সংগ্রাম কে ঠেকিয়ে রাখতে তাঁরা যে জাল বিছিয়েছিল তা কিন্তু কৃষক ও শ্রমিকদের বিপ্লবী সংগ্রামে ছিন্ন হয়ে যেত। এহেন পরিস্থিতিতে ১৯৭০ এর দশকে বারবার বাঙালি-বিরোধী হিংসায় ইন্ধন যোগান দেওয়া হয়। কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দমন করতে পুলিশি সন্ত্রাস সৃষ্টি করলেও আসামের সরকার কিন্তু জেনেশুনে বাঙালি-বিরোধী উগ্রপন্থী কার্যকলাপ কে বন্ধ করতে কোন উদ্যোগ নেয়নি।

যখন ১৯৭১ এ পূর্ব বাংলার মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে তখন দেশ ছেড়ে দলে দলে বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমরা পালিয়ে এসে নিম্ন আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় আশ্রয় নিতে শুরু করে। ছিন্নমূল, অভুক্ত, হতদরিদ্র হয়ে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরায় আশ্রয় চাইতে আসা এই মানুষদের নিমেষে জাতীয় শত্রুর তকমা দেয় উগ্র অহমীয় জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই তাঁরা বারবার দাবি করতে থাকে যে এই ছিন্নমূল মানুষেরা আসলে “বিদেশী” এবং আসামের মাটিতে তাঁদের কোন ঠাঁই নেই। নানা জায়গায় এই বিদেশী-বিরোধী আন্দোলন এক নতুন কায়দায় দানা বাঁধা শুরু করে ১৯৮০ এর দশক থেকে। বঙ্গাল খেদা শুধু আর অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী আগ্রাসন হিসেবে আটকে না থেকে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবেশী ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে, যেখানে আদিবাসী ও বিভিন্ন জনজাতির মানুষ কে মিথ্যা প্ররোচনা দিয়ে বাঙালি উদ্বাস্তুদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয় ভারতের শাসক শ্রেণী। সমগ্র ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে দাঙ্গার আগুন জ্বলে ওঠে।

অহমীয় উগ্রজাতীয়তাবাদ কিন্তু স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালিদের নিজেদের শত্রু মনে করে এবং তাঁদের বলপ্রয়োগ করে আসাম থেকে দূর করার পক্ষে ওকালতি করে। ভারতের শাসক শ্রেণীর বদন্যতায় যে অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, ১৯৮০ সালের থেকে তাঁর সাথে গাঁটছড়া বেঁধে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট আরএসএস সমস্ত আসামে নিজেদের সংগঠন গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। এই আরএসএস এর আগমনের সাথে সাথে কিন্তু ধীরে ধীরে বঙ্গাল খেদা থেকে উগ্রপন্থীদের  অভিযানের লক্ষ্য হয়ে ওঠে বাঙালি মুসলিম তাড়ানো। যেহেতু বাঙালি মুসলিমরা জনসংখ্যার সংখ্যালঘু অংশ, যেহেতু বাঙালি হিন্দুরাও বাঙালি মুসলিমদের ধর্মীয় কারণে ঘৃণা করে এবং যেহেতু তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাঁদের কে সহজেই বাংলাদেশী বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, তাই তাঁদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা ও ধর্মীয় জিগির তুলে আক্রমণ চালানো অনেক সোজা হয়ে ওঠে হিন্দি-হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীদের পক্ষে। এই নতুন ধারার সাম্প্রদায়িকতা মেশানো উগ্র অহমীয় জাতীয়তাবাদের ছোবল সমস্ত আসামের আবহাওয়া কে দীর্ঘ চার দশক ধরে বিষাক্ত করে এসেছে।

অটল বিহারী বাজপেয়ী কে বিজেপির মধ্যেকার  “উদারনৈতিক গণতন্ত্রী” হিসেবে সর্বদা শাসক শ্রেণী তুলে ধরতো। সেই অটল বিহারী ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আসামে গিয়ে “বিদেশী বাঙালি” তাড়ানোর জন্যে এবং অহমীয়  ও আদিবাসীদের ক্ষেপিয়ে তোলার জন্যে এক প্ররোচনামূলক ভাষণ দেয়। এই ভাষণে বাজপেয়ী বলে যে যদি আসামের জায়গায় পাঞ্জাবে এত “বিদেশী অনুপ্রবেশকারীরা” থাকতো তাহলে তাঁদের “কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হতো”। এই ভাষণের ঠিক পরেই ১৮ই ফেব্রুয়ারি, আরএসএস ও কংগ্রেসের যোগসাজেশে  সংগঠিত হয় কুখ্যাত নেলি গণহত্যাকান্ড, যাতে পুরুষ-মহিলা-বৃদ্ধ-শিশু নির্বিশেষে ৩,০০০ মানুষ কে তীর ও গুলি মেরে আহত করে তারপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস সরকারের নাকের তলায় সংগঠিত এই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের জন্যে যেমন আরএসএস ও তার দালাল হিন্দুত্ববাদী অহমীয় উগ্রপন্থীরা দায়ী ঠিক তেমনই দায়ী কংগ্রেস।

নগাওঁ এর নেলিতে সংগঠিত গণহত্যার পরেই আসামের উগ্র জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাসবাদ মাথা চাড়া দিয়ে বাঙালি বিরোধী হিংসাত্মক অভিযান শুরু করে। বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমদের উপর তীব্র আক্রমণ শুরু করে অহমীয় জঙ্গী সংগঠনগুলি। কংগ্রেস ও আরএসএস এর মদতপুষ্ট এই সংগঠনগুলি দিল্লির সাথে সম্পর্ক খারাপ না করেও শুধু বাঙালি, কোচ-রাজবংশী ও গরিব হিন্দি-ভাষী ও নেপালি-ভাষী শ্রমিক, ভূমিহীন কৃষক এবং ব্যাপক অ-অহমীয় জাতির খেটে খাওয়া মানুষের উপর আক্রমণ শুরু করে। বামপন্থী শক্তিগুলি কে দুর্বল করে, শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের উপর জাতি-বিদ্বেষী আক্রমণ করে এই সংগঠনগুলি মূলত অহমীয় মানুষের মধ্যে, অহমীয় গরিব মানুষের মধ্যে ব্যাপক হারে জাতি-বিদ্বেষের গরল ঢালা শুরু করে।  

তৎকালীন রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার, যে কংগ্রেসের এক যুব নেত্রী ছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়, সেই সরকার আসাম আন্দোলন নামে কুখ্যাত হওয়া এই গুটিকয়েক লুম্পেন জাতিবিদ্বেষী ফ্যাসিস্টদের সাথে বৈঠক করে আসাম চুক্তি সম্পাদন করে। এই আসাম চুক্তির ভিত্তি হলো আরএসএস এর মদতপুষ্ট নেলি হত্যাকান্ড এবং এই রকম আরও অনেক হত্যাকাণ্ডের হুমকি। সরকার দু হাত তুলে এই খুনি অহমীয় উগ্রপন্থীদের সমর্থন করে ও বাহবা দেয় এবং বাঙালিদের উপহার দেয় NRC  নামক মানবতাবিরোধী একটি চরম ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা।

ট্রাইবুনাল, NRC ও নাগরিক বাছবিচারের প্রহসন

এ যাবৎকাল অবধি NRC তৈরির জন্যে ২৪শে মার্চ ১৯৭১ কে ভিত্তি মেনে এগানো হয়েছে। যদি কোন ব্যক্তি ২৪শে মার্চ ১৯৭১ এর আগে এসে আসামে বসবাস করা শুরু করে থাকেন তাহলে তিনি ভারতের নাগরিক গণ্য হবেন আর তা না হলে হয় তাঁরা Doubtful Voter (সন্দেহজনক ভোটার) বা D-Voter হিসেবে চিহ্নিত হবেন এবং তাঁর ফলে তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যেতে পারে, আর না হয় তাঁরা বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ডিটেনশন সেন্টারে বা সরকারি জেলে স্থান পাবেন। কেউ কেউ যদি পুরো পরিবার সহ জেলে যান তাহলে তাঁদের সকল সদস্য কে আজীবন আলাদা করে রাখা হবে এবং তাঁদের শিশুদের আলাদা করে রাখা হবে। হর্ষ মন্দার নামক এক মানবাধিকার কর্মী সচক্ষে আসামের জেলের ঘৃণ্য ব্যবস্থা দেখে এসেছেন এবং তার বিবরণ লিখেছেন। ইংরাজীতে লেখা এই বিবরণটি পড়লে আপনারা জানবেন যে কি অমানবিক ভাবে ভারত রাষ্ট্র ও তার অহমীয় উচ্চ জাতির দালালেরা গরিব বাঙালিদের উপর নিপীড়ন চালাচ্ছে আসামে।      

এই NRC খসড়া তৈরির আগে থেকেই সমগ্র আসাম জুড়ে অবৈধ অভিবাসী (ট্রাইব্যুনালের দ্বারা নির্ধারিত) আইন ১৯৮৩ দ্বারা গঠিত “অবৈধ অভিবাসীদের (অভিমত) ট্রাইব্যুনাল” দ্বারা কে আসামের তথা ভারতের বাসিন্দা আর কে নয় তা নিয়ে মোকাদ্দমা চলে আসছে। যে কোন ব্যক্তি অন্য কারুর বিরুদ্ধে এই ট্রাইবুনালে বা পুলিশে বেআইনী বসবাসকারী’র অভিযোগ দায়ের করতে পারে এবং সরকার সেই অভিযোগের গোপন তদন্ত করে (অভিযুক্ত কে না জানিয়ে) ট্রাইবুনালে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিত। যদি তদন্তে পাওয়া যেত যে ব্যক্তিটি বিদেশী তাহলে ট্রাইবুনালের থেকে তাঁর নামে সমন পাঠানো হয় এবং তাঁকে এসে নিজের বা নিজের পূর্বপুরুষদের ২৪শে মার্চ ১৯৭১ এর আগের থেকে আসামে থাকার নথি সহ প্রমাণ দিতে হয়। যদিও এই আইনে অভিযুক্ত নিজেই নিজের ওকালতি করতে পারেন, তবুও যাঁদের নামে নালিশ হয় তাঁদের বেশিরভাগ যেহেতু গরিব মানুষ এবং বিশেষ লেখাপড়া জানেন না তাই তাঁরা উকিল করতে বাধ্য হন এবং উকিলের ফিজ সহ নিজের পূর্বপুরুষের সমস্ত নথিপত্র জোগাড় করার জন্যে প্রচুর টাকা খরচ করতে বাধ্য হন। অনেকে এই খরচের কারণে পথে বসেন, অনেকে আবার আত্মহত্যাও করেন।

বিগত ২৫ বছরে ৪৫৮,০০০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে নাগরিকত্বের প্রশ্নে এবং তার মধ্যে আজও ১৮০,০০০ মামলা ঝুলে আছে বিভিন্ন ট্রাইবুনালে। এই মামলাগুলিতে প্রথমে রাষ্ট্র কে প্রমাণ করতে হতো যে যাঁর বিরুদ্ধে নালিশ করা হয়েছে তিনি বিদেশী। যেহেতু প্রমাণ করার দায় রাষ্ট্র যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল ছিল তাই হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের দোসর আসামের জনবিরোধী উগ্রজাতীয়তাবাদী লুম্পেনরা এই ট্রাইবুনালের পদ্ধতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং সর্বানন্দ সোনোয়ালের নেতৃত্বে আরএসএস সুপ্রিম কোর্টে NRC তৈরির কাজ কে ত্বরান্বিত করার আর্জি পেশ করে। সেই আর্জির উপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা সৃষ্ট সুপ্রিম কোর্ট যে আদেশ দেয় তার সারমর্ম হলো যে আসামে বাস করা যে কোন মানুষের বিরুদ্ধে যদি নালিশ করা হয় যে সে বিদেশী, তাহলে সেই ব্যক্তি কে এবার প্রমাণ করতে হবে যে তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ মিথ্যা এবং তার পক্ষে তাঁকে ১৯৭১ এর পূর্বের নথিপত্র জমা দিতে হবে। তিনি যদি ট্রাইবুনালে নথি জমা দিতে অপারগ হন তাহলে তাঁকে বিদেশী অনুপ্রবেশকারী তকমা দিয়ে সহজেই বন্দি শালায় আটকে রাখা যাবে আবার তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করা হবে এবং তাঁদের কে সকলকে  ১৯৭১ এর পূর্বের থেকে আসামের সাথে যোগসূত্র প্রমাণ করতে হবে। এই ট্রাইবুনাল ব্যবস্থা যে কি রকম দুর্নীতি-পরায়ণ এবং চরম ভাবে গরিব-বিরোধী তা জানতে আপনি Raiot ম্যাগাজিনে ইংরাজীতে প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি পড়ে দেখতে পারেন।

আসামে হিন্দুত্ববাদের বিষাক্ত ছোবল

এই NRC নিয়ে সমগ্র আসাম জুড়ে যে ঘৃণ্য উগ্রজাতীয়তাবাদের জোয়ার তোলা হয়েছিল তার লক্ষ্য বস্তু সকল বাঙালি হলেও বিজেপি নিজ ভোট ব্যাঙ্কের দিকে নজর দিয়ে বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ও বাঙালি মুসলিমদের শুধু বিতাড়ন করার লাইন নিয়ে আসে। প্রথমে তরুণ গগৈ এর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের আমলে বিজেপি মুসলিম অনুপ্রবেশকারী তোষণের অভিযোগ তোলে ও নানা স্থানে ২০১২ সাল থেকে মুসলিম বিরোধী গণহত্যা সংগঠিত করায় আরএসএস’র সন্ত্রাসবাদীদের সাহায্যে। সমগ্র দক্ষিণ আসামের বাঙালি অঞ্চলগুলিতে বসবাস করা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নামিয়ে আনা হয় ঘৃণ্য আক্রমণ। ২০১৪ সালের মে মাসে, যখন নরেন্দ্র মোদী নানা ধরণের মিথ্যার বেসাতির সাহায্যে নির্বাচন জিততে ব্যস্ত, ঠিক তখনই পয়লা মে থেকে ৩রা মে অবধি প্রায় ৩২ জন বাঙালি মুসলিম কে হত্যা করে নরেন্দ্র মোদীর দালাল, হিন্দুত্ববাদী বোড়ো জঙ্গীরা। সেই বছরের ডিসেম্বরে, ঠিক বড়দিনের প্রাকাল্লে, নরেন্দ্র মোদীর সরকারের মদতেই বিজেপির জোট সঙ্গী বোড়ো উগ্রপন্থীদের আক্রমণে নিহত হন সাধারণ আদিবাসী খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ। যদিও সরকার শুধুই বোড়ো জঙ্গীদের দোষ দেয়, তবুও এই হামলাগুলোয় ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্রের ও হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসের যোগসাজশ খুবই স্পষ্ট ভাবে সামনে আসে।

উগ্রজাতীয়তাবাদীদের মুসলিম বিদ্বেষী প্রচার দিয়ে প্রলুব্ধ করে আরএসএস বোঝাতে থাকে যে বাঙালি মুসলিমদের সংখ্যা নাকি আসামে এত বেড়ে গেছে যে সেখানকার ভূমিপুত্র হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে গেছে এবং তাই সেই অহমীয় মানুষদের হিন্দু বাঙালি ও অবাঙালিদের সাথে মিলে আসাম থেকে বাঙালি মুসলিমদের তাড়াতে হবে। এই প্রচার ও মুসলিমদের নিয়ে অহেতুক আতঙ্ক ছড়িয়ে গোটা আসামের জনগণ কে পুনরায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ে ভাগ করে ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসামে সরকার গড়ে বিজেপি এবং সাথে সাথেই আসামের তথাকথিত জাতীয়তাবাদীদের মুখে কুলুপ মেরে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতির উপর ভিত্তি করে আসামের ইতিহাসের গৈরিকীকরণ শুরু করে আরএসএস। আসাম থেকে মেয়েদের পাচার করে গুজরাট ও পাঞ্জাবে নিয়ে গিয়ে হিন্দুত্ববাদী জঙ্গী বানাবার কর্মকান্ডও শুরু হয় আরএসএস এর নেতৃত্বে। NRC এর নামে এক নোংরা খেলা চলতে থাকে সমগ্র রাজ্যের বাঙালিদের সাথে, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিম ও নমঃশুদ্র (দলিত) বাঙালিদের সাথে। এর সাথে সাথেই কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর সরকার খুব সুকৌশলে নাগরিক আইনে পরিবর্তন করার খসড়া তৈরি করে সংসদে উপস্থাপন করেছে , যা বলবৎ হলে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে যদি কোন হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসী বা খ্রীস্টান ভারতে আসেন তাহলে তাঁদের নাগরিকতা দেওয়া হবে আর যেহেতু এই তালিকায় মুসলিম ধর্মের নাম লেখা নেই তাই এটা অনিবার্য যে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে গিয়ে আরএসএস ও বিজেপি’র দ্বারা পরিচালিত হিন্দুত্ব ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র মুসলিমদের নাগরিকতা তো দেবেই না বরং যাঁদের নাগরিকতা আছে তাঁদের সেই অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হবে।  

বিজেপির ঘৃণ্য রাজনীতির বিরুদ্ধে, হিন্দু-মুসলিম বিভাজন করার নীতির বিরুদ্ধে এবং নাগরিক আইনে রদবদল আনার বিরুদ্ধে আসামে গণ বিক্ষোভ তো প্রচুর হলো, বহু মানুষ সমস্বরে বিজেপির দ্বারা “বিদেশী অনুপ্রবেশকারীদের” হিন্দু-মুসলিম দ্বৈতে ভাগ করার বিরোধিতা করলেন, অনেক আন্দোলন হলো আর অনেক মিছিলও হলো, নব্য বামপন্থীদের অতিপ্রিয় অখিল গগৈ জেল থেকেও বিবৃতিও পাঠালেন বিজেপি কে তুলোধুনো করে; তবে এই সব বিরোধ, সব আন্দোলন, সব বিক্ষোভের পিছনে বিজেপি বিরোধিতা বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতার চেয়েও বেশি ছিল বাঙালি-বিদ্বেষ; বাঙালি গরিব মানুষ যেন আসামে করে কম্মে খেতে না পারে তার জন্যে জেদ। যখন নব্য বাম থেকে সকল রঙের রাজনীতির ধামাধারীরা আসামে ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে এই উগ্র জাতীয়তাবাদ কে সমর্থন করে চলেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ কে জোর করে তাঁদের ভিটে মাটির থেকে উচ্ছেদ করতে চাইছে, তখন ভোটের বাজারে এটা আশা করা মূর্খতা হবে যে তাদের মধ্যে কেউ আসামে বাঙালিদের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে উগ্র অহমীয় জাতীয়তাবাদ ও আরএসএস এর ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে।

আসামে NRC পরবর্তী কালে কমিউনিস্টদের কর্তব্য কি হওয়া উচিত?

অনেক কমিউনিস্ট বিপ্লবী আসামের NRC নিয়ে সঠিক অবস্থান কি হবে, অহমীয় মানুষের সাথে বাঙালিদের দ্বন্ধে কমিউনিস্টদের অবস্থান কি হওয়া উচিত তাই নিয়ে চিন্তিত। অনেকে নিজ নিজ জাতীয় ও ভাষাগত অবস্থান থেকে সমস্যাটিকে দেখছেন আবার অনেকে এই সমস্যাটিকে একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখছেন। আসাম ও আসামের মাটিতে অহমীয়-আদিবাসী জোটের সাথে বাঙালিদের দ্বন্ধ আসলে ভারতের শাসক শ্রেণীর নিজ লুঠ ও শোষণের স্বার্থে কৃত্রিম ভাবে সৃষ্ট দ্বন্ধ। এই দ্বন্ধের মূল হচ্ছে যে আসামে রোজগার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ ভীষণ কম এবং তার মধ্যে ভারতের শাসকশ্রেণী হিন্দি ও গুজরাটি-ভাষী কর্মচারীদের রাজ্যের উচ্চ পদে বসিয়ে রাজ্যের রাশ নিজের হাতে টেনে রাখতে চায় আর হিন্দি-হিন্দুত্বের স্বার্থে গরিব মানুষের মধ্যে কলহ চিরস্থায়ী করে রাখতে চায়। ইউরোপের মাটিতে উৎপত্তি হওয়া নেশন স্টেট বা জাতি রাষ্ট্রের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ কে ভারতের মাটিতেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠনের তত্ত্বের মাধ্যমে। যতদিন এই কলহ নিয়ে অহমীয় ও বাঙালিদের ব্যস্ত করে রাখা যাবে ঠিক ততদিনই কিন্তু দেশের সম্পদ কি করে নরেন্দ্র মোদী বৃহৎ কর্পোরেটদের বিক্রি করে জনগণ কে দুর্দশার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন তার থেকে মানুষের মুখ ফিরিয়ে রাখা যাবে।

কমিউনিস্টদের অবশ্যই আন্তর্জাতিকতাবাদী হতে হবে এবং সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের চেতনা থেকে মুক্ত হতে হবে। তাঁদের সকল ক্ষেত্রেই শোষিত-বঞ্চিত-অত্যাচারিত গরিব মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে হবে শাসক শ্রেণীর সৃষ্ট সকল ধরনের বৈরিতার ও কৃত্রিম বিভেদের দেওয়াল ভাঙতে হবে। কমিউনিস্টদের সর্ব ক্ষেত্রেই আশু কর্তব্য হলো শ্রেণী সংগ্রাম গড়ে তোলা ক্ষমতা দখলের জন্যে এবং এর জন্যে সকল জাতির গরিব মানুষকেই তাঁদের দরকার। আসামে বস্তুগত ভাবে দেখতে গেলে সকল গরিব মানুষের মধ্যে বাঙালি গরিব, এবং বাঙালি গরিবের মধ্যে বাঙালি মুসলিম গরিব সবচেয়ে শোষিত এবং তাঁরা প্রতিনিয়ত অত্যাচারিত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে জীবনযাপন করেন। ফলে এই গরিব মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে অহমীয়, বোড়ো ও অন্য সকল ধরণের আদিবাসী-জনজাতির গরিব মানুষ কে এটা বোঝানো ভীষণ জরুরী যে বাঙালি গরিব, বা বিশেষ করে বাঙালি গরিব মুসলিমেরা, তাঁদের শত্রু নয় বরং যে বৃহৎ শক্তি আসামের সম্পদ লুঠ করছে, অহমীয় মানুষকে শোষণ করছে, আদিবাসীদের উপর আগ্রাসন চালাচ্ছে, সেই একই শত্রুর দ্বারা বাঙালি গরিবরাও  শোষিত। শ্রেণীর পক্ষে মানুষ কে জাগ্রত করতে পারলে, শ্রেণী ঐক্য গড়তে পারলে, এমনকি একটি ছোট অঞ্চলে হলেও তা কিন্তু সমগ্র আসামের রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে এবং ভারতের শাসক শ্রেণীর ও বিদেশী কর্পোরেটদের দালাল বাম-ডান নির্বিশেষে সকল প্রকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তিকে আসামে পরাস্ত করতে পারবে।

অহমীয় গরিব কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী জনগণ, নানা জনজাতির জনগণ কে এক ছাতার তলায় আনতে পারবে শুধু সামন্তবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবী সংগ্রাম। জমি ও ক্ষমতা দখলের রাজনীতি যদি অহমীয় বা বিভিন্ন জনজাতির দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের মধ্যে ঢুকতে সক্ষম হয় তাহলে কিন্তু তাঁরা চিনে নেবেন তাঁদের শত্রু কে এবং বিপ্লবী সংগ্রাম মারফত নিজেদের প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি তাঁরা প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।  আর এই রাজনৈতিক শক্তির জন্ম হলেই কিন্তু বিগত সাত দশক ধরে চলতে থাকা বাঙালি-বিরোধী ঘৃণার রাজনীতি পাঁকে ডুবে মরবে।

আজ সারা আসাম জুড়ে সাধারণ অহমীয় শ্রমিক-কৃষক, মেহনতি মানুষদের, ছাত্র-যুব, নারী এবং গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল মানুষদের বোঝানো উচিত যে দাবি ওঠানো হোক সমগ্র আসাম জুড়ে কৃষকদের জমি বন্টনের, চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির, দাবি তোলা হোক যে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল বেকার মানুষকে অবিলম্বে কর্মসংস্থান দেওয়া হোক। সকল ছাত্র-ছাত্রীর জন্যে বিনামূল্যে শিক্ষা, সকল মানুষের জন্যে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য আর সবার জন্যে রোজগারের বন্দোবস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার কে অবিলম্বে করতে হবে। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে দেশ ও মানুষকে অহমীয় জাতি বা বাঙালি জাতি ভাগ করেনি, ভাগ করেছিল সাম্রাজ্যবাদী ও মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিরা আর তাঁদের পাপের ফল কিন্তু আজ গরিব মানুষ ভোগ করবে না। যে মানুষের শ্রমের মাধ্যমে আসামের সমাজের বৃদ্ধি ও উন্নয়ন হয়েছে সেই মানুষগুলো কে না তাড়িয়ে আসাম থেকে অবিলম্বে তাড়াতে হবে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে শাসক শ্রেণীর সকল পা-চাটা কুকুরদের।

বর্তমানে যে ৪০ লক্ষ মানুষ আজ বাস্তুচ্যুত হয়ে আবার উদ্বাস্তু হতে বসেছেন, তাঁদের প্রতি এই অন্যায় দেখে যদি আজ বিপ্লবী কমিউনিস্টরা তাঁদের পাশে না দাঁড়ান, যদি ভারতের জনগণের সবচেয়ে বড় শত্রু বিজেপি-আরএসএস এর বিরুদ্ধে বর্শামুখ ঘুরিয়ে ধরে, জনগণ কে জাগ্রত করে, ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের পথে পা না বাড়ান, তাহলে তাঁরা আসলে কমিউনিস্টই নন। অহমীয় উগ্র-জাতীয়তাবাদ ও ভারতের শাসক শ্রেণীর চাঁদায় চলা হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ, এই দুটিই মানুষের শত্রু এমনকি অহমীয় জাতিরও শত্রু। তাই এই অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে, বাঙালি জনগণের প্রতি হতে চলা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমগ্র অহমীয় ও আদিবাসী-জনজাতির মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে হিন্দুত্ববাদী শাসক শ্রেণী কে ও তার পদলেহী আরএসএস-বিজেপি সহ সমস্ত ঘোরতর শ্রমিক-কৃষক বিরোধী অহমীয় উগ্র-জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলি কে পরাস্ত করার সংগ্রাম করাই আজ আসামের বিপ্লবী কমিউনিস্টদের প্রধান কর্তব্য। যে বা যাঁরা জাতি স্বার্থের কথা বলে শ্রমজীবী মানুষ কে উদ্বাস্তু করার পক্ষে কথা বলবেন, সে বা তাঁরা কমিউনিস্ট তো দূরের কথা মানুষ হিসেবে পরিচিত হওয়ার যোগ্য নয়।

আসাম জুড়ে জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রামই একমাত্র পথ NRC খারিজ করার

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার ও ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে এমন একটি চুক্তি কে কখনোই মান্যতা দেওয়া যায় না যার ভিত্তি হলো গণহত্যা ও জাতি বিদ্বেষী দাঙ্গা। যদি আজ গুজরাটের ২০০২ সালের গণহত্যার পরে বজরং দল ও আরএসএস কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে চুক্তি করতো যে শুধুমাত্র সমস্ত মুসলিমদের জোর করে পাকিস্তান পাঠিয়ে দিলে এই গণহত্যা বন্ধ হবে আর যদি সরকার সেই চুক্তি মেনে নিত তাহলে কি কমিউনিস্টরা তা মানতেন? যাঁরা বিপ্লবের কথা বলে শ্রেণী সংগ্রামের জায়গায় জাতীয় সংগ্রাম গড়তে চান, তাঁরা কি সেই চুক্তি মানতেন? তাহলে আজ Assam Accord এর মতন চুক্তি, যা একটি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সাথে আর একটি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ক্ষমতা বাটোয়ারা করার চুক্তি, লুটের বখরার উপর অংশীদারীর চুক্তি, নেলি গণহত্যার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া চুক্তি, সেই চুক্তির ভিত্তিতে গঠিত NRC ও গরিব মানুষ কে জোর করে তাঁর দেশের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা কে তাঁরা সমর্থন করবেন কি ভাবে?

শ্রমজীবী বাঙালি ও অহমীয় জনজাতির মানুষের মধ্যে দ্বন্ধ লাগাবার খেলায় মমতা বন্দোপাধ্যায় থেকে শুরু করে নব্য ফ্যাসিস্ট বাংলা পক্ষ, সবাই এখন মাঠে নেমেছে নিজেদের বাঙালি-প্রীতি দেখাতে। গুজরাটি-মাড়োয়ারী মুৎসুদ্দি বেনিয়াদের হাতের পুতুল রাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া সীমানায় খেলা করে তাঁরা বাঙালির স্বার্থ রক্ষা করতে চান এবং পশ্চিমবঙ্গে তীব্র অহমীয়-বিরোধী একটি জাতি ঘৃণার পরিবেশ তৈরী করতে চান। মুখে বিজেপি বিরোধিতার কথা বললেও আসলে এই ফাঁকে শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য কে ভাঙার প্রচেষ্টাই মুখ্য। যে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সরকার পশ্চিমবঙ্গে তপন ঘোষের হিন্দু সংহতির মতন সাংঘাতিক এক মার্কিন-ইজরায়েল অর্থে পরিচালিত হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী সংগঠন কে বাঙালি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বাঙালি হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে তুলতে মদত দেন, যে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস রাম নবমী থেকে হনুমান পুজোর মতন অবাঙালি উচ্চ জাতের হিন্দুদের  উৎসব কে পশ্চিমবঙ্গে জায়গা করে দিয়ে বিজেপি’র শ্রীবৃদ্ধির রাস্তা করে দিয়েছে, সেই মমতা বন্দোপাধ্যায় যে আসলে আসামের উদ্বাস্তু হতে বসা বাঙালিদের স্বার্থের কথা বলে নিজের সাথে বিজেপির দুই রাজ্যে ভোটার মেরুকরণের গুপ্ত চুক্তি কার্যকর করার পথে এগিয়ে চলেছেন সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আজ NRC তালিকার ফলে আসামে উদ্বাস্তু হতে বসা বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমজীবী মানুষদের পক্ষ নিয়ে প্রকৃত বিপ্লবী কমিউনিস্টদের অবশ্যই পথে নামতে হবে, মানুষকে কে আসল শত্রু আর কে আসল মিত্র তা চেনাতে হবে এবং রাজনীতি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে হবে আসল শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তোলার স্বার্থে। স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক এক সমাজ, যেখানে জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের জন্যে কর্মসংস্থান, মাথার উপর ছাদ, পরনের কাপড়, থালা ভর্তি ভাত, বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বন্দোবস্ত থাকবে, সেই সমাজ গঠনের জন্যে বাঙালি-অহমীয়-বিহারি সকল জাতির শ্রমজীবী মানুষ কে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যতদিন ভারতের প্রতিক্রিয়াশীল উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় সাবর্ণ হিন্দুত্ববাদী শাসক শ্রেণী ও তার পদলেহী স্থানীয় দালালেরা টিকে থাকবে আসাম বা পশ্চিমবঙ্গের জনগণের মুক্তি নেই। তাই আজ নিজেদের আলোময় ভবিষ্যতের জন্যে ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে, লড়াই করে বিজয় অর্জন করতেই হবে। ৪০ লক্ষ উদ্বাস্তু হতে চলা গরিব মানুষের সাথে যদি আসামের দুই কোটি গরিব মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন তাহলে পৃথিবীর কোন শক্তির সাধ্য নেই সেই ঐক্যবদ্ধ শক্তি কে পরাজিত করার।                

পুরুলিয়ায় বিজেপি কর্মীদের হত্যা কি সংঘ পরিবারের স্বার্থে?



সম্প্রতি, পুরুলিয়া জেলায় দুই বিজেপি কর্মীর দেহ কিছুদিনের ব্যবধানে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে এবং তারপর থেকেই রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা অবনতির ও তৃণমূলের হিংসাত্মক রাজনীতির প্রসঙ্গ তুলে বিজেপি ও সংঘ পরিবার বাজার গরম করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও পুরুলিয়া পুলিশের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুসারে দ্বিতীয় মৃত ব্যক্তি, দুলাল কুমার (৩০), আত্মহত্যা করেছেন, তবুও রাজ্য সরকার এই মৃত্যুর তদন্তের ভাঁড় সিআইডি’র হাতে তুলে দিয়েছে। বিজেপির নিশানার তীর তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে আর তৃণমূলের নিশানার তীর বিজেপি থেকে মাওবাদী, প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই।  পুরুলিয়া জেলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস গো হারা হারায় মমতা বন্দোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দোপাধ্যায় জেলাকে বিরোধী শূন্য করতে চান বলে বিজেপির অভিযোগ। 

কয়েকদিনের ব্যবধানে সংগঠিত এই জোড়া মৃত্যু বাংলার জনমানসে বিজেপির পক্ষে কতটা সহানুভূতির জোয়ার এনে দেবে তা বিতর্কের বিষয়, কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য যে এত সরল ভাবে সমাধান হবে তা কিন্তু যে কোন সমালোচক সাংবাদিকের পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টকর। বিজেপির অভিযোগ নিঃশর্ত ভাবে মেনে নেওয়া অনেকটা হয়ে যাবে রাষ্ট্রের হাতে খুন হওয়া মানুষেরা এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ারে মরেছে সেটা স্বীকার করে নেওয়ার মতন। 

বিজেপি এই রাজ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিদ্বন্ধি হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস কে আজ টেক্কা দিতে পারছে তার কৃতিত্ব যেমন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দ্বারা ১৯৯৮ সালে বিজেপি কে খাল কেটে বাংলায় ঢুকতে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে দেওয়ার ঘটনায় নিহিত, ঠিক তেমনি, অধঃপতিত সংশোধনবাদী সংসদীয় বামপন্থী দলগুলির, যাদের পান্ডা হলো সিপিএম, তাদেরও চরম দেউলিয়াপনা ও অক্ষমতায় নিহিত। 

রাজনৈতিক হিংসার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখা ও বিরোধীদের নিকেশ করে দেওয়ার রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস পার্টি ১৯৫০ এর দশকে আমদানি করেছিল কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে, শ্রমিক ও কৃষকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্যে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতা দখল করতে পারে কারণ ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর পদলেহী শ্বাপদ সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের সরকার যে নৃশংস তান্ডব লীলা পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭২ থেকে চালিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে নকশালপন্থীদের প্রতিরোধ সংগ্রাম ও বন্দিমুক্তি সংগ্রামের লাভটা জ্যোতি বোস ও সিপিএম সেদিন নেপোয় মারে দই করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পেরেছিল বলে। ঠিক তেমনি, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ সালে বামফ্রন্টের সামাজিক-ফ্যাসিবাদী শাসন কে উচ্ছেদ করে এক প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিবাদী সরকার গঠন করতে পেরেছিল কারণ মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ও মাওবাদীদের সাহায্যে তৃণমূল কংগ্রেস সিপিএমের হার্মাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম থেকে লালগড়ের নানা প্রান্তে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিল এবং তার ফলে একটি চরম দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল দল হওয়া সত্বেও তৃণমূল মানুষের কাছে নিজেদের একটি প্রতিবাদী ও প্রতিরোধী ভাবমূর্তি গড়ে সমর্থন কুড়োতে পেরেছিল। আজ বিজেপি ঠিক সেই পথেই চলে, সিপিএমের খালি করে যাওয়া ময়দানে সিপিএমের প্রাক্তন কর্মী ও সমর্থকদের সমর্থনে বলীয়ান হয়ে তৃণমূলের নৃশংস সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারছে। 

এখানে বিজেপি যে শুধু হিন্দুদের সমর্থন আদায় করছে তাই নয়, ২০১৪ সালে সমগ্র বীরভূমের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে বিজেপি নিজের সংগঠন কে শক্ত করে গড়ে তোলে এবং সেই সংগঠনের উপর ভর করে দুধ কুমার মন্ডলের মতন জোতদার অনুব্রত’র (কেষ্ট) মতন সাংঘাতিক সন্ত্রাসবাদীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে জমি দখলের। এই রাজায় রাজায় যুদ্ধে যে অসংখ্য উলুখাগড়ার প্রাণ যায় তাঁদের অধিকাংশই কিন্তু সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নয়তো আদিবাসী বা নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের গরিব মানুষ। ঠিক কেশপুরের মতন আজ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের ক্ষমতা ধরে রাখার ও বিজেপির ক্ষমতা দখল করার হিংসাত্মক সংঘর্ষ চলছে। এরই মধ্যে, পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে তীব্র হিংসা কে উপেক্ষা করেও বিজেপি যে পুরুলিয়া দখল করতে পেরেছে তার শ্রেয় কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে দিন দিন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বেড়ে চলা ক্ষোভ কে দিতে হয়। 

বীরভূম, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জুড়ে আজ বিজেপি গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে যাচ্ছে আরএসএস এর সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ক কে ব্যবহার করে এবং এই কাজে তৃণমূলের একটা বড় অংশই কিন্তু বিজেপি কে সাহায্য করছে রাতের আঁধারে। এই ধরুন বাঁকুড়ার তালডাংরার কথা, বিজেপি এখানে প্রবেশ করে ১৯৯৮ সালে তৃণমূলের কোলে চেপে আর আজ আরএসএস এর অসংখ্য সন্ত্রাসী শিবিরের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসবাদী ফৌজ খাড়া করেছে এবং তোলা আদায়, নারী পাচার থেকে বিভিন্ন বেআইনি কারবারে নিজের একচেটিয়া অধিকার কায়েম করে ফেলেছে । তৃণমূল এখানে বিজেপির সাথে রফা করে ফেলেছে আর কোথাও কোথাও অস্তিত্বের সঙ্কটে ধুঁকতে থাকা সিপিএম বিজেপির সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে লুটের বখরার উপর অধিকার কায়েম করতে। 

সিপিএম আজ কংগ্রেসের লেজুড় হয়ে যেটুকু অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছিল তাও আজ বিশ বাওঁ জলে এবং এর ফলে সিপিএমের কর্মীরা দলে দলে বিজেপিতে যোগ দিচ্ছে প্রাণ ও জমি বাঁচাতে। বর্তমানে যদি আবার বিধানসভা নির্বাচন হয় তাহলে সিপিএম পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রের থেকে ধুয়ে মুছে যাবে এবং বিজেপি তৃণমূলের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলার ঔদ্ধত্ব দেখাবে, এই কথা বলার জন্যে কোন বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দরকার পড়বে না, কারণ একথা আজ গ্রামের শিশুরা পর্যন্ত বলতে পারবে।  

এর মধ্যে যদি তৃণমূল কে নিজের ঘাঁটি ও ক্ষমতা বাঁচাতে হিংসায় জড়াতে হয়, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস কে রাতের অন্ধকার অবধি অপেক্ষা করতে হবে না, বরং দিনের আলোয়, ভাঙড়ের মতনই, যে কোন জায়গায় যে কোন ব্যক্তি কে হত্যা করার ক্ষমতা আজ মমতা বন্দোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের আছে। তৃণমূলের হিংসার সাথে সমগ্র রাজ্য পঞ্চায়েত নির্বাচনে পরিচিত হয়েছিল ভালো ভাবেই আর তাই বিজেপির দুই চুনো পুঁটি কে দিনের আলোয় নিকেশ করতে তৃণমূলের কোন বিশেষ সমস্যা হতো না। পুরুলিয়ার মতন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাউকে পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঠিক পরেই রাতের অন্ধকারে বাইকে করে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে খুন করে গাছে টাঙিয়ে মৃতের জামায় হুমকি লিখে আসার মতন বেদনাদায়ক পরিশ্রম তৃণমূলের হার্মাদ বাহিনী এই মুহূর্তে করবে এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হবে। 

বিগত দিনে, বামফ্রন্ট আমলে, পুরুলিয়ার ওই সকল অঞ্চলে মাওবাদীদের হাতে বেশ কিছু সিপিএম নেতা ও কর্মীর প্রাণ যায়, যার সাথে কিন্তু বর্তমানের বিজেপি কর্মীদের হত্যার কোন সাদৃশ্যতা খোঁজা শিশুসুলভ আচরণ হবে। মাওবাদীরা যাঁদের আজ অবধি খুন করেছে তাঁদের মৃতদেহের পাশে তাঁরা পোস্টার লিখে নিজেদের দ্বায়িত্ব স্বীকার করেছে এবং সেই পোস্টারগুলির নিচে মাওবাদীদের সাংগঠনিক পরিচয় থাকতো। নিজেদের নামে কাউকে হত্যা করতে মাওবাদীরা কুন্ঠিত বোধ করে না কারণ তাঁদের দল অনেক দিন ধরেই নিষিদ্ধ এবং নির্বাচনের কোন বালাই মাওবাদীদের নেই। যদিও মাওবাদীরা বর্তমানে পুরুলিয়ায় ফের নিজেদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তবুও এই দুই মৃত্যুর দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপানো যায়না, কারণ তাঁরা যদি এদের মেরেই থাকতো তাহলে সেই মৃত্যুর দায় নিয়ে প্রশাসনের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা আতঙ্কের স্রোত বইয়ে দিতে পারতো মাওবাদীরা।  

যদি তৃণমূল এবং মাওবাদীরা এই দুই জন কে না মেরে থাকে তাহলে কে এদের মারতে পারে? সিপিএম আর কংগ্রেসের এখন সাইনবোর্ডটুকুও পুরুলিয়া জেলায় নেই। তৃণমূলের সন্ত্রাসে এই দলগুলির অস্তিত্ব অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। তবে যে দলের শক্তি এই মুহূর্তে পুরুলিয়ায় বেড়েছে তা হলো বিজেপির এবং এর সাথে সাথে আরএসএস এর। নিজ দলের লোক কে কোরবানির পাঁঠা বানানো বিজেপির কাছে নতুন কিছু না। হরেন পান্ড্যা থেকে গোপীনাথ মুন্ডে, দীনদয়াল উপাধ্যায় থেকে প্রমোদ মহাজন, যখন যাকে খরচের খাতায় ফেলার দরকার বিজেপি বা আরএসএস এর হয়েছে তখন সেই মরেছে কোন না কোন আততায়ীর হাতে, দোষটা অবশ্যই অন্য কারুর উপরে চাপানো হয়েছে। এত বড় বড় মহীরুহ যাঁরা কেটে ফেলতে পারে অবলীলায়, তাঁরা যে দুটি নটে গাছ মাড়িয়ে দেবে না সে কথা শিশুও বিশ্বাস করবে না। 

সম্প্রতি, পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে, নিজের পক্ষে সমর্থনের জোয়ার আনতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের দরকার হয়ে পড়ে বিজেপির এবং তাই পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য এলাকার মতন পুরুলিয়াতেও রাম নবমীর মতন অবাঙালি, উত্তর ভারতীয় উৎসব কে ঘিরে দাঙ্গার আগুন লাগায় সংঘ পরিবার। এই কাজে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে বজরং দলের জেলা নেতা ও বিজেপির যুব নেতা গৌরাব সিংহ, যে আবার প্রাক্তন এসএফআই কর্মী। তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে মানুষে মানুষে ঘৃণা ছড়াতে ওস্তাদ গৌরাব সিংহ, পুরুলিয়ার রাম নবমীর দিনে সশস্ত্র মিছিলের মাধ্যমে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গার আগুন জ্বালায় এবং এই হিংসায় এক মুসলিম যুবকের মৃত্যু হয় বজরং দলের কর্মীদের আক্রমণে। হিন্দি-ভাষী উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় আরএসএস নেতাদের ভাড়াটে গুন্ডা হিসেবে গৌরাব সিংহ ইতিমধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছে জমির দালালি থেকে নানা অপরাধে সামিল হয়ে। এহেন গৌরাব সিংহ গ্রেপ্তার হওয়ায় তাঁর স্বরূপ যাতে জনগণের সামনে না আসে, পুরুলিয়ার থেকে বিজেপির নারী পাচার থেকে মাদক পাচারের মতন অপরাধের হিসেব যাতে জনগণ বা দেশের মানুষ না জানতে পারেন, তাই হয়তো হঠাৎ দুটি মৃতদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেল। 

বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কিন্তু এই ঝুলন্ত দেহ পাওয়ার পর থেকেই নিজেদের প্রচার কে তুঙ্গে নিয়ে গেছে এবং তৃণমূলের সাথে সাথে শ্রমজীবি মানুষের স্বার্থে আন্দোলন করা, দলিত ও আদিবাসী জনগণের স্বার্থে কথা বলা শক্তিগুলি কে নিজেদের আক্রমণের নিশানা বানিয়েছে। আসানসোলে মার্চ মাসে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাবার হোতা, সুপ্রিয় বড়াল ওরফে বাবুল সুপ্রিয় কিন্তু সোজা আক্রমণ সেঁধেছে বামপন্থীদের উপর এই বলে যে বিজেপির দলিত ও আদিবাসী কর্মী হত্যার বিরুদ্ধে তাঁরা কেন প্রতিবাদ করছেন না। বিজেপি বলছে যে তাঁদের কর্মীদের উপর আক্রমণ আসলে ফ্যাসিবাদ এবং এর প্রতিবাদ সকল বাম ও গণতান্ত্রিক মানুষদের করা উচিত। 

হয়তো বাবুল সুপ্রিয়ের মনে নেই যে বিজেপি বা আরএসএস এর নেতৃত্বাধীন কোন সংগঠনে যোগ দেওয়ার সাথে সাথে দলিত ও আদিবাসী সমাজের কিছু দলছুট মানুষ সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর পদাতিক বাহিনীর সদস্য হয়ে ওঠে। তাঁরা যে শুধু মুসলিম বা খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক আক্রমণ চালায় তাই নয়, বরং অন্যান্য দলিত ও আদিবাসীদের বিরুদ্ধেও তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, যেমন টাটা ও বেদান্তের পয়সায় পরিচালিত হওয়া ছত্তিশগড়ের সালোয়া জুডুম এর খুনি সন্ত্রাসীরা সকলেই কিন্তু আদিবাসী সমাজ থেকে আগত আরএসএস এর সস্তা পদাতিক ছিল। তাই যে আদিবাসী বা দলিত আরএসএস সন্ত্রাসী হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের ঝান্ডা উত্তোলন করার জন্যে প্রাণ দেয়, তাঁদের সাথে শোষিত, নিপীড়িত ও অত্যাচারিত দলিত ও আদিবাসীদের কোন সম্পর্ক থাকে না। ফলে সেই গেরুয়া বাহিনীর কাছে বিকিয়ে যাওয়া আদিবাসী বা দলিতের স্বার্থের সাথে সমগ্র আদিবাসী ও দলিতদের স্বার্থের কোন সম্পর্ক থাকে না এবং তাই কোন গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল শক্তি এহেন মৃতদের পক্ষে আন্দোলন করে না। 

বিজেপির পক্ষে খরচের যোগ্য যে কোন আদিবাসী বা দলিত কর্মী কে আরএসএস এর দক্ষ সন্ত্রাসবাদীদের দিয়ে খুন করিয়ে গাছে টাঙিয়ে, ভাঙা ভাঙা বাংলা বক্তব্য লিখে একটা সেনসেশন ছড়ানো সংঘ পরিবারের পক্ষে কোন বড় ব্যাপার নয়। পুরুলিয়ার সাথে, পুরুলিয়ার আদিবাসী সমাজের সাথে বিজেপির কোন প্রত্যক্ষ বা আবেগের সম্পর্ক নেই। পুরুলিয়ার দরিদ্র মানুষ কি ভাবে দিন কাটান, কি ভাবে আদিবাসী জনগণ সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিন মাত্র ভাত খেয়ে বাস করেন, তা নিয়ে বিজেপির কোন মাথা ব্যাথা নেই। বিজেপির কাছে পুরুলিয়ার প্রয়োজনীয়তা হলো নকশালপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার জন্যে, সমস্ত জোতদার ও জমিদারদের নিজের নেতৃত্বে নিয়ে আসার জন্যে এবং অসংখ্য আদিবাসী যুবকদের টাকা, মদ ও মহিলার প্রলোভন দেখিয়ে আরএসএস এর সন্ত্রাসী বানিয়ে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে পদাতিক বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে। 

বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গের থেকে বামপন্থার রেশটুকু, শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের রেশটুকু শেষ করে দিয়ে শুধু মাত্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে নিজের পালে জোর হাওয়া টেনে প্রধান বিরোধী দল হতে চায়। মমতা বন্দোপাধ্যায় এবং কংগ্রেস পার্টিও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ভারতের যে কোন রাজ্যের মতন শুধু দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ময়দান হওয়ার পক্ষপাতী। অন্যদিকে অস্তিত্বের সঙ্কটে হতাশ সামাজিক-ফ্যাসিবাদী সিপিএম ও অন্যান্য সংসদীয় বাম দলগুলির সুবিধাবাদের পাঁকে ডুবে শেষ হয়ে যাওয়া দেখে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের মধ্যেই বামপন্থা নিয়ে এক বিরূপ মনোভাবের জন্ম হয়েছে। এই সঙ্কট কালে কোন বিপ্লবী বামপন্থী শক্তির শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি জনতার মধ্যে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত প্রচার আন্দোলনের অভাবে, লেগে পড়ে থেকে তৃণমূলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনগণ কে, বিশেষ করে দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের, আদিবাসী জনগণকে ও নমঃশূদ্র মানুষদের জাগিয়ে না তোলার ফলে আজ হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী শক্তি ও ইসলামিক মৌলবাদী শক্তি গ্রামাঞ্চলে প্রশ্রয় পেয়ে নিজেদের দুর্গ গড়ে তুলছে। 

আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়ার জন্যে বিজেপি ও আরএসএস অনেক রক্ত বইয়ে দিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দি-ভাষী অঞ্চলগুলোয় কি ভাবে উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খন্ড এবং বিহার থেকে গুন্ডা বাহিনী এনে দাঙ্গা লাগিয়ে মেরুকরণ চালাচ্ছে বিজেপি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ আসানসোল ও রানিগঞ্জের রাম নবমীর উপলক্ষ্যে লাগানো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আজ এই ঘৃণার বীজ কে আরএসএস বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে আদিবাসী অঞ্চলে রোপন করছে এবং এখনই এদের কে প্রতিরোধ করে পরাস্ত না করতে পারলে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে এমন বিষবৃক্ষ ফলে উঠবে যা আমাদের ভবিষ্যৎ কে বিষ বাতাসে ভরিয়ে দেবে এবং হিংসা ও মৃত্যুর ঘৃণ্য তান্ডব এই বাংলার পরিচয় উঠবে। হয় আমাদের আজ বাংলার ভবিষ্যতের জন্যে রুখে দাঁড়াতে হবে আর না হয় হিন্দি-ভাষী হিন্দুত্বের ধ্বজ্জাধারীদের পদদলিত হয়ে চিরকাল বাস করতে হবে।   


এই ব্লগের সত্বাধিকার সম্বন্ধে